ঢাকা | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৫ আশ্বিন ১৪৩৩

বয়সের ফ্রেমে যেন বন্দি না হয় ‘উদ্যোগ’

দেশের বেকারত্ব দূরীকরণ এবং নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক ‘উদ্যোগ (UDYOG)’ ঋণ কর্মসূচি ২০২৬ চালু করেছে। এই সময়োপযোগী কর্মসূচির আওতায় প্রান্তিক পর্যায়ের সম্ভাবনাময় তরুণ উদ্যোক্তাদের সর্বোচ্চ ২০ লাখ টাকা পর্যন্ত সমন্বিত অর্থায়ন দেওয়া হচ্ছে, যার অর্ধেক ঋণ এবং বাকি অর্ধেক অফেরতযোগ্য অনুদান। এটি নিঃসন্দেহে একটি বৈপ্লবিক ও সাধুবাদ পাওয়ার মতো পদক্ষেপ, যা প্রাথমিক ধাপে দেশের ৮টি জেলার ৬৪টি উপজেলায় আবেদন প্রক্রিয়ার মাধ্যমে শুরু হয়েছে।

তরুণদের চাকরিপ্রার্থী থেকে চাকরিদাতায় রূপান্তর করার এই রাষ্ট্রীয় মহৎ উদ্দেশ্যকে সফল করতে হলে এর ভেতরের কিছু বাস্তব প্রায়োগিক দিক নিয়ে নতুন করে ভাবার অবকাশ রয়েছে। বিশেষ করে, এই প্রকল্পের আওতায় আবেদন করার জন্য উদ্যোক্তার সর্বোচ্চ বয়সসীমা ২৮ বছর নির্ধারণ করার বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যেতে পারে। বাস্তবসম্মত অর্থনৈতিক রূপান্তরের স্বার্থে এই বয়সসীমা বাড়িয়ে ১৮ থেকে ৩৫ বছর করা অত্যন্ত জরুরি।

আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে সাধারণত ২৮ থেকে ৩০ বছর বয়স পর্যন্ত তরুণ-তরুণীরা সরকারি ও বেসরকারি চাকরির পেছনে তাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময় ও মেধা ব্যয় করে। দুর্ভাগ্যবশত, অনেকের ক্ষেত্রে দেখা যায় চাকরির নির্দিষ্ট বয়সসীমা পার হয়ে যাওয়ার পর তারা এক চরম সামাজিক ও মানসিক অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে। বয়স পার হয়ে যাওয়ার কারণে তারা যেমন আর নতুন কোনো চাকরিতে প্রবেশ করতে পারছে না, ঠিক তেমনি পুঁজির অভাবে নতুন কোনো ব্যবসাও শুরু করতে পারছে না। এই ‘অধিক বয়সী বেকাররা’ তুলনামূলক কম বয়সী বেকারদের চেয়ে অনেক বেশি সংকটে থাকে, কারণ এই বয়সে তাদের ওপর নানামুখী পারিবারিক ও সামাজিক দায়িত্ব চলে আসে। অথচ বর্তমান নীতিমালার কঠোর বয়সসীমার কারণে চাকরি বঞ্চিত এই বড় ও সম্ভাবনাময় একটি অংশ সম্পূর্ণ অনুদান ও ঋণ সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। তুলনামূলক কম বয়সী বেকারের চেয়ে এই অধিক বয়সী বেকার উদ্যোক্তাদের রাষ্ট্রীয় সাহায্য ও নীতিগত সমর্থন দেওয়া এখন অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি প্রয়োজনীয়।

বয়সসীমা বৃদ্ধির পক্ষে আরেকটি বড় যুক্তি হলো বাস্তব অভিজ্ঞতা ও ব্যবসায়িক স্থায়িত্ব। ১৮ থেকে ২৮ বছর বয়সটি মূলত প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অর্জন এবং ক্যারিয়ারের প্রাথমিক ভিত্তি গড়ার সময়। এই বয়সের তরুণদের ব্যবসার আইডিয়া বা উদ্ভাবনী শক্তি চমৎকার হলেও বাজার পরিস্থিতি সামলানো, ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত পরিচালনার বাস্তব অভিজ্ঞতা তাদের কম থাকে। পক্ষান্তরে, যাদের বয়স ২৯ থেকে ৩৫ বছরের মধ্যে, তাদের অনেকেরই কোনো না কোনো খাতে বাস্তব কাজের, চাকরি বা ব্যবসার খণ্ডকালীন অভিজ্ঞতা তৈরি হয়। তারা জানে কীভাবে একটি প্রতিকূল বাজার পরিস্থিতিতে ব্যবসা টিকিয়ে রাখতে হয় এবং বিদ্যমান ছোট ব্যবসাকে সম্প্রসারণ করে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি করা যায়। স্টার্ট-আপ ও ব্যবসা সংক্রান্ত বিভিন্ন বৈশ্বিক গবেষণাতেও দেখা গেছে, একটু পরিপক্ব বয়সের উদ্যোক্তাদের ব্যবসার সফলতার হার ও স্থায়িত্ব তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি হয়।তাই এই চমৎকার প্রকল্পটির শতভাগ সুফল ঘরে তুলতে নীতিমালায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ পরিমার্জন ও সংযোজন আনা দরকার।

প্রথমত, প্রারম্ভিক যোগ্যতার বয়সসীমা ২৮ থেকে বাড়িয়ে ৩৫ বছর করা হলে দেশের একটি বিশাল দক্ষ যুবশক্তি মূল ধারার অর্থনীতিতে অবদান রাখার সুযোগ পাবে। দ্বিতীয়ত, নীতিমালায় শুধু একদম নতুন আইডিয়াকে অগ্রাধিকার দেওয়ার পাশাপাশি যারা ২৮ থেকে ৩৫ বছর বয়সে ছোট পরিসরে ইতিমধ্যে ব্যবসা চালু রেখেছেন, তাদের ব্যবসা বড় বা স্কেল-আপ করার জন্য তহবিলের একটি নির্দিষ্ট অংশ বরাদ্দ রাখা উচিত। একই সাথে, প্রযুক্তিভিত্তিক ও ই-কমার্স উদ্যোগের ক্ষেত্রে শুধু অর্থায়নই যথেষ্ট নয়, বরং নির্বাচিত উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক আইটি সাপোর্ট ও ডিভাইস ব্যাকআপের মতো সুযোগ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাছাড়া, ব্যবসায়িক মন্দা বা প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে কোনো প্রকৃত উদ্যোক্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে, ঋণ পরিশোধের ক্ষেত্রে কিস্তির সময়সীমা কিছুটা শিথিল বা পুনর্বিবেচনার মানবিক সুযোগ নীতিমালায় থাকা উচিত।

পরিশেষে বলা যায়, বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘উদ্যোগ’ প্রকল্প দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন দিগন্তের সূচনা করেছে। তবে এই উদ্যোগের সুফল যেন কোনো বিশেষ বয়সসীমার ফ্রেমে বন্দি হয়ে না পড়ে, সেদিকে লক্ষ্য রাখা দরকার। সরকারি চাকরির বাজারে সুযোগ হারানো এবং বাস্তব অভিজ্ঞতাসম্পন্ন ২৯ থেকে ৩৫ বছর বয়সী যুবকদের এই প্রকল্পের মূল স্রোতে সম্পৃক্ত করা হলে, তা দেশের অর্থনীতির চাকা আরও দ্রুত ও টেকসইভাবে সচল করতে ভূমিকা রাখবে। বর্তমান সরকারের নীতিনির্ধারকরা এই বয়সসীমা পুনর্বিবেচনার বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন, এটাই দেশের তরুণ উদ্যোক্তা সমাজের একান্ত প্রত্যাশা।

ইমতিয়াজ আহমেদ, সভাপতি, বাংলাদেশ ইয়ুথ থিংক ট্যাংক