কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের (কুবি) বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগমের একমাত্র সন্তান অপ্রতিম। বয়স মাত্র তেরো। আদ্যোপান্ত কিছুই জানি না। সম্ভবত দুপুরের কিছু আগে ফেসবুকে দেখলাম—ছোট্ট অপ্রতিম মায়ের আইফোনটি নিয়ে ছবি তুলতে ঘর থেকে বের হয়েছিল। তারপর থেকেই তার আর কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছিল না।
অপ্রতীমের নিখোঁজ হওয়ার সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছিল সারাদেশে। ‘নিখোঁজ’ শব্দটি দেখলেই কেন জানি বুকের ভেতরটা কেমন ধড়ফড় করে ওঠে। আমি তো অপ্রতিমের কেউ নই। তারপরও অজানা এক ব্যথা অনুভব করছিলাম। সেটার কারণ হয়তো, আমিও একজন বাবা। বাইরে থেকে ফিরে ছেলের মুখটা একটু না দেখলে বুকের ভেতরটা কেমন যেন খালি খালি লাগে। মনে হয়, কতদিন যেন ছেলেটাকে দেখি না!
অপ্রতিমের নিখোঁজ হওয়া তার মা-বাবার জন্য কতটা দুশ্চিন্তা, উৎকণ্ঠা আর অসহায়তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছিল, তা শুধু তারাই জানেন। কী মায়াবী মুখ শিশুটির! বারবার ফেসবুক খুলে দেখছিলাম—অপ্রতীমকে খুঁজে পাওয়া গেল কি না।
শেষ পর্যন্ত অপ্রতিমকে পাওয়া গেল। তবে জীবিত নয়—একটি জঙ্গল থেকে উদ্ধার হলো তার নিথর দেহ। কী ভয়ংকর! কী নির্মম!
কী অপরাধ ছিল ছোট্ট অপ্রতিমের? একটি আইফোনই কি তার জীবনের জন্য কাল হয়ে দাঁড়িয়েছিল? যদি তাই হয়ে থাকে, তাহলে ফোনটি নিয়ে নিলেই তো হতো! একটি নিষ্পাপ শিশুকে হত্যা করতে হলো কেন?
এ কেমন সমাজে আমরা বাস করছি? কেমন মানুষ হয়ে উঠেছি আমরা? সামান্য একটি জিনিসের জন্য একটি ফেরেশতাসম শিশুর জীবন কেড়ে নেওয়ার মতো নির্মমতা কীভাবে মানুষের ভেতর জন্ম নেয়?
অপ্রতিমের মা-বাবা এখন কীভাবে বেঁচে থাকবেন? যে সন্তানকে ঘিরে ছিল তাদের স্বপ্ন, যে সন্তানকে নিয়ে ছিল ভবিষ্যতের কত পরিকল্পনা—সেই সন্তানকে এভাবে হারানোর শূন্যতা কি কোনোদিন পূরণ হওয়ার? কে দেবে এসব প্রশ্নের উত্তর?
আর কত অপ্রতিমকে হারালে আমাদের বোধোদয় হবে? আর কতকাল অপেক্ষা করতে হবে, যাতে অপ্রতীমদের মতো শিশুরা হাতে আইফোন নিয়ে, কিংবা কোনো প্রয়োজনে নিশ্চিন্ত মনে ঘর থেকে বের হয়ে নিরাপদে আবার ঘরে ফিরতে পারে? আর কতকাল পর মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে? আর কত মা-বাবাকে সন্তানের লাশ বুকে নিয়ে প্রশ্ন করতে হবে—আমার সন্তানের অপরাধ কী ছিল? অপ্রতিমকে আর তেরো পেরোতে দিল না হায়েনার দল! এই নির্মমতার বিচার শুধু একটি পরিবারের জন্য নয়—আমাদের সমাজের প্রতিটি সন্তানের নিরাপত্তার জন্য জরুরি।
লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক






