ঢাকা | শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৩ আশ্বিন ১৪৩৩

মিরপুর-১৪ থেকে কচুক্ষেত: এক কিলোমিটার রাস্তার দেখভালের দায়িত্ব কার?

মিরপুর-১৪ থেকে কচুক্ষেত ডিজিএফআই চেকপোস্ট পর্যন্ত রাস্তার দৈর্ঘ্য বড়জোর এক কিলোমিটার হবে। দীর্ঘ ২৬ বছর ধরে এই এলাকায় চলাচল করছি। কিন্তু আজও বুঝতে পারলাম না—এই এক কিলোমিটার রাস্তার প্রকৃত দেখভালের দায়িত্বটা আসলে কার?

রাস্তাটি যে যথেষ্ট প্রশস্ত, এ নিয়ে কোনো সন্দেহ নেই। অথচ সেই প্রশস্ত রাস্তার বড় একটি অংশ এখন কার্যত হকার, ভাসমান ব্যবসায়ী, ভ্যান, রিকশা ও অটোর দখলে। রাস্তার দুই পাশে এমন কোনো ভাসমান ব্যবসা নেই, যা এখানে খুঁজে পাওয়া যাবে না। শাকসবজি থেকে শুরু করে কাপড়, ফলমূল, খাবার, চা, বিভিন্ন ধরনের নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী—সবকিছুরই যেন এখানে অবাধ উপস্থিতি। শুধু রাস্তার পাশেই নয়, ধীরে ধীরে ভ্যান ও অন্যান্য যানবাহন রাস্তার আরও ভেতরে ঢুকে পড়ছে। কোনো কোনো সময় ভ্যানগুলো প্রায় রাস্তার মাঝামাঝি চলে আসে। ফলে একটি গাড়িকে অত্যন্ত ধীরগতিতে, কখনো কখনো হর্ন বাজিয়ে এবং অনেকটা কসরত করে পথ চলতে হয়।

স্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এক কিলোমিটার রাস্তা অতিক্রম করতে যেখানে সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিট সময় লাগার কথা, সেখানে কখনো কখনো আধা ঘণ্টা, এমনকি তারও বেশি সময় লেগে যায়। ব্যস্ত সময়ে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। যানজট শুধু গাড়ির গতি কমিয়ে দেয় না, বরং পুরো এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকেই ব্যাহত করে।

অভিযান হয়, কিন্তু দখলমুক্ত হয় না

এ কথা অবশ্যই সত্য যে, রাস্তা দখলমুক্ত করার উদ্যোগ একেবারেই নেওয়া হয় না—বিষয়টি এমন নয়। সেনানিবাসের কাছাকাছি হওয়ায় মাঝে মাঝে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সদস্যদের সমন্বয়ে যৌথ অভিযান পরিচালনা করতে দেখা যায়। অভিযানের সময় রাস্তার দুই পাশ অনেকটাই ফাঁকা হয়ে যায়। হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীরা তাদের মালামাল সরিয়ে নেন। পথচারী ও যানবাহনের চলাচলেও স্বস্তি ফিরে আসে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, অভিযান শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পরেই আবার যে অবস্থা, সেই অবস্থা! কিছু সময়ের মধ্যেই হকাররা ফিরে আসেন, ভ্যানগুলো আবার রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে যায়, পসরা সাজানো শুরু হয় এবং ধীরে ধীরে পুরো রাস্তা আবার আগের চেহারায় ফিরে যায়। তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এত শক্তিশালী একটি রাষ্ট্রযন্ত্রের উপস্থিতির পরও এই দখলদারিত্ব কীভাবে বারবার ফিরে আসে? মাঝে মাঝে সত্যিই মনে হয়, এই হকার ও ভাসমান ব্যবসায়ীরা এতটা ক্ষমতাবান হলো কীভাবে যে বারবার উচ্ছেদ করার পরও তারা একই জায়গায় ফিরে আসতে পারে?

দায়িত্বের সমন্বয়হীনতাই কি মূল সমস্যা?

মিরপুর-১৪ থেকে কচুক্ষেত ডিজিএফআই চেকপোস্ট পর্যন্ত রাস্তার এই অংশটি সম্ভবত পুরোপুরি সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণাধীন নয়। ফলে সেনাবাহিনীর পক্ষ থেকে মাঝে মাঝে অভিযান পরিচালিত হলেও প্রতিদিনের রাস্তা ব্যবস্থাপনা ও দখল নিয়ন্ত্রণে তাদের সরাসরি ভূমিকার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

অন্যদিকে, পুলিশের অবস্থাও বর্তমানে আগের মতো নেই। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিতে পুলিশের ভূমিকা ও সক্ষমতা নিয়ে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। এর সঙ্গে রয়েছে জনবল সংকট ও নানা প্রশাসনিক সীমাবদ্ধতা। ফলে শুধু পুলিশের ওপর নির্ভর করে একটি ব্যস্ত সড়ককে নিয়মিতভাবে দখলমুক্ত রাখা কতটা সম্ভব, সেটিও বিবেচনার বিষয়। তার ওপর যদি কোথাও স্থানীয় প্রভাবশালী মহল, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা কিংবা অন্য কোনো ধরনের প্রভাব কাজ করে থাকে, তাহলে পরিস্থিতি আরও জটিল হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

সবকিছু মিলিয়ে মনে হয়, এই এক কিলোমিটার রাস্তা যেন দায়িত্ব, কর্তৃত্ব ও জবাবদিহির এক অদ্ভুত হযবরল অবস্থার শিকার।

রিকশার জন্য আলাদা লেন—উদ্যোগ ভালো, বাস্তবায়ন কোথায়?

কিছুদিন আগে পুলিশ ও সেনাবাহিনীর সহায়তায় রাস্তার দুই পাশে নির্দিষ্ট দূরত্ব পরপর হাফ ড্রাম বসিয়ে রিকশার জন্য আলাদা লেন তৈরি করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। উদ্যোগটি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয় ছিল। অন্তত মনে হয়েছিল, এবার হয়তো যানবাহনের চলাচল কিছুটা শৃঙ্খলার মধ্যে আসবে।

কিন্তু বাস্তবতা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। ঐ নির্দিষ্ট লেন দিয়ে রিকশা চলাচল করতে দেখা গেল না বললেই চলে। বরং লাভবান হলো রাস্তার পাশের ভাসমান সবজি বিক্রেতা ও অন্যান্য ব্যবসায়ীরা। যে জায়গাটি রিকশার চলাচলের জন্য নির্ধারিত ছিল, সেটিই ধীরে ধীরে তাদের ব্যবসার জায়গায় পরিণত হলো।

এর কিছুদিন পর দেখা গেল, রাস্তার সেই হাফ ড্রামগুলোও আর নেই। কোথায় গেল, কে সরাল, কেন সরানো হলো—তা সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ নেই। এরপর আবার একদিন দেখা গেল, স্থায়ীভাবে ঢালাই দিয়ে রিকশার জন্য আলাদা লেন তৈরি করা হয়েছে। ভাবলাম, এবার হয়তো সমস্যার স্থায়ী সমাধান হলো। কিন্তু সেই আশাও বেশি দিন টিকল না।

আজ পর্যন্ত ঐ লেন দিয়ে নিয়মিত কোনো রিকশা বা অটো চলাচল করতে দেখিনি। বরং মজার বিষয় হলো—রিকশার জন্য তৈরি করা লেনটি এখন ভাসমান ব্যবসায়ীদের কাছে প্রায় স্থায়ী ব্যবসার জায়গায় পরিণত হয়েছে! অর্থাৎ, রিকশার জন্য লেন তৈরি করা হয়েছিল; শেষ পর্যন্ত সেটি হয়ে গেল হকারদের ব্যবসার লেন।

রাস্তা দখলের যেন মহোৎসব

রিকশার জন্য নির্ধারিত লেন বাদ দিলেও রাস্তার বাকি অংশ দখলের মহোৎসব তো রয়েছেই। কেউ রাস্তার ওপর মালামাল রেখেছেন, কেউ ভ্যান দাঁড় করিয়েছেন, কেউ সবজির পসরা সাজিয়েছেন, আবার কেউ রাস্তার একাংশকে নিজের দোকানের সম্প্রসারিত অংশ হিসেবে ব্যবহার করছেন।

এ অবস্থায় পথচারী, রিকশা, অটো, প্রাইভেটকার, বাস—সবাইকে একই জায়গা দিয়ে চলতে হচ্ছে। ফলে সামান্য একটি প্রতিবন্ধকতাও মুহূর্তের মধ্যে বড় যানজটে পরিণত হয়। মাঝে মাঝে মনে হয়—কোন দেশে জন্ম নিলাম আমরা, যেখানে রিকশাওয়ালা, অটোওয়ালা কিংবা হকারদের নিয়ন্ত্রণ করাও যেন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর জন্য অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে?

অথচ মাত্র এক কিলোমিটার পরেই সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ডিজিএফআই চেকপোস্ট থেকে সৈনিক ক্লাব পর্যন্ত দূরত্বও প্রায় এক কিলোমিটারের মতোই। কিন্তু এই এক কিলোমিটার রাস্তার চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। সেখানে রাস্তার ওপর যত্রতত্র দোকান বসানো, ভ্যান দাঁড় করানো কিংবা ইচ্ছেমতো রাস্তা দখল করে ব্যবসা করার সুযোগ নেই। সবাই অনেকটাই নিয়ম মেনে চলেন। কারণ সবাই জানেন—নিয়ম ভাঙলে শাস্তি ও জরিমানার মুখোমুখি হতে হবে। অর্থাৎ, আইন ও নিয়ম যখন বাস্তব অর্থে প্রয়োগ করা হয়, তখন মানুষ নিয়ম মানে। তাহলে মিরপুর-১৪ থেকে কচুক্ষেত ডিজিএফআই চেকপোস্ট পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার রাস্তার ক্ষেত্রে একই শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা যাচ্ছে না কেন? সমস্যাটা কি আইন নেই বলে? নাকি আইন প্রয়োগে ধারাবাহিকতার অভাবে? নাকি দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বয়ের অভাবে? নাকি কোনো অদৃশ্য প্রভাবশালী মহলের কারণে? এই প্রশ্নগুলোর উত্তর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষই ভালো দিতে পারবেন।

প্রয়োজন স্থায়ী সমাধান, লোক দেখানো অভিযান নয়

আমার মনে হয়, মাঝেমধ্যে অভিযান পরিচালনা করে রাস্তা দখলমুক্ত করার চেয়ে এখানে প্রয়োজন একটি সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থাপনা পরিকল্পনা। প্রথমত, এই রাস্তার প্রশাসনিক দায়িত্ব কার—তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন। এরপর সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, পুলিশ, ট্রাফিক বিভাগ এবং প্রয়োজনে সেনাবাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

দ্বিতীয়ত, ভাসমান ব্যবসায়ীদের জন্য বিকল্প নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ করা যেতে পারে। কারণ শুধু উচ্ছেদ করলেই সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না। জীবিকার প্রয়োজনেই তারা আবার ফিরে আসবেন। তাই নির্দিষ্ট জায়গায় ব্যবসার সুযোগ তৈরি করে রাস্তা থেকে তাদের সরিয়ে নেওয়া যেতে পারে।

তৃতীয়ত, রিকশা ও অটোর জন্য যে লেন তৈরি করা হয়েছে, সেটি বাস্তবে ব্যবহারযোগ্য করতে হবে। শুধু ড্রাম বসানো কিংবা কংক্রিটের বিভাজক তৈরি করলেই হবে না; নিয়মিত নজরদারি ও আইন প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো—একবার অভিযান চালিয়ে ছবি তুলে প্রচার করার পরিবর্তে নিয়মিত তদারকি এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে। একটি রাস্তা দখলমুক্ত রাখতে হলে শুধু উচ্ছেদ অভিযান যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ধারাবাহিক ব্যবস্থাপনা।

শেষ কথা

মিরপুর-১৪ থেকে কচুক্ষেত ডিজিএফআই চেকপোস্ট পর্যন্ত মাত্র এক কিলোমিটার রাস্তা হয়তো রাজধানীর সবচেয়ে বড় সমস্যা নয়। কিন্তু এই ছোট্ট এক কিলোমিটার রাস্তার চিত্র আমাদের নগর ব্যবস্থাপনা, আইন প্রয়োগ, সমন্বয় ও জবাবদিহির একটি বড় বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে আসে।

একই শহরে পাশাপাশি দুটি এক কিলোমিটার রাস্তা—একটিতে নিয়ম-শৃঙ্খলা অনেকটাই দৃশ্যমান, অন্যটিতে দখল ও বিশৃঙ্খলার রাজত্ব। তাহলে পার্থক্যটা কোথায়? আইন কি আলাদা? নাকি আইন প্রয়োগের ধরন আলাদা? প্রশ্নটি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে থাকল।

মিরপুর-১৪ থেকে কচুক্ষেত ডিজিএফআই চেকপোস্ট পর্যন্ত এই এক কিলোমিটার রাস্তার বেহাল দশা হয়তো একদিনে তৈরি হয়নি। তাই একদিনের অভিযানেও এর সমাধান হবে না। প্রয়োজন রাজনৈতিক সদিচ্ছা, প্রশাসনিক সমন্বয়, নিয়মিত নজরদারি এবং সর্বোপরি আইনের ধারাবাহিক প্রয়োগ। রাস্তা জনগণের চলাচলের জন্য—কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর স্থায়ী ব্যবসা প্রতিষ্ঠার জন্য নয়।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক