ঢাকা | রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৫ আশ্বিন ১৪৩৩

অপ্রতিমের ঘাতকরাও কি বয়সের মারপ্যাঁচে একদিন মুক্তি পেয়ে যাবে?

অপ্রতিমের ঘাতকরাও হয়তো একদিন আইনের দৃষ্টিতে বয়সের মারপ্যাঁচে মুক্তি পেয়ে যাবে। খুনি সে যে বয়সেরই হোক, তার তো ফাঁসি হওয়ার কথা—এটাই বিচারপ্রার্থী ও সাধারণ মানুষের চাওয়া। কারণ খুনি যে বয়সেরই হোক না কেন, সে তো খুনিই। কিন্তু আইন বলছে অন্য কথা। চলুন, দেখে নেওয়া যাক—দেশের প্রচলিত বর্তমান আইন এ বিষয়ে কী বলে। বাংলাদেশের প্রচলিত আইনে ১৮ বছর পূর্ণ না হওয়া ব্যক্তিকে “শিশু” (Child) বলা হয়। শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা ৪ অনুযায়ী, অনূর্ধ্ব ১৮ বছর বয়সী প্রত্যেক ব্যক্তিই শিশু। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, অপরাধের ক্ষেত্রে বয়স নির্ধারণ করা হয় অপরাধ সংঘটনের তারিখে তার বয়স কত ছিল, সেটির ভিত্তিতে।

১৮ বছরের আগে হত্যা বা অন্য অপরাধ করলে কী হয়?

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য আছে—১৮ বছরের কম বয়সী হওয়া মানে অপরাধ করলে কোনো দায়ই হবে না—এমন নয়। বরং তার বিচার ও শাস্তির জন্য আলাদা শিশু-বিচার ব্যবস্থা প্রযোজ্য হয়।

১) ১৮ বছরের কম হলে শিশু-আইন প্রযোজ্য

কোনো ব্যক্তি ১৭ বছর ১১ মাস বয়সে হত্যা করলেও, অপরাধ সংঘটনের সময় তার বয়স ১৮ হয়নি বলে তাকে শিশু হিসেবে বিবেচনা করা হবে এবং সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক আসামির মতো বিচার না করে শিশু-আদালতের বিধান প্রযোজ্য হবে।

২) হত্যা করলেও শিশুকে মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া যায় না

শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা ৩৩ অনুযায়ী কোনো শিশুকে মৃত্যুদণ্ড, যাবজ্জীবন কারাদণ্ড বা সাধারণ কারাদণ্ড দেওয়ার ওপর বিধিনিষেধ রয়েছে। তবে গুরুতর অপরাধের ক্ষেত্রে বিশেষ পরিস্থিতিতে আদালত কারাদণ্ডের আদেশ দিতে পারে।

৩) হত্যার মতো গুরুতর অপরাধে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত আটকাদেশ হতে পারে

শিশু আইন, ২০১৩-এর ধারা ৩৪ অনুযায়ী, কোনো শিশু মৃত্যুদণ্ড বা যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে দণ্ডনীয় অপরাধে—যেমন হত্যা—দোষী সাব্যস্ত হলে শিশু-আদালত তাকে ন্যূনতম ৩ বছর থেকে সর্বোচ্চ ১০ বছর পর্যন্ত শিশু উন্নয়ন কেন্দ্রে আটক রাখার আদেশ দিতে পারে।

৪) ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার পরও গুরুতর মামলার প্রভাব থাকতে পারে

হত্যা, ধর্ষণ, ডাকাতি, দস্যুতা, মাদক ব্যবসা ইত্যাদি গুরুতর মামলায় অভিযুক্ত শিশুর বয়স বিচারাধীন অবস্থায় ১৮ বছর পূর্ণ হলে, আইনের নির্দিষ্ট বিধান অনুযায়ী তাকে শিশু উন্নয়ন কেন্দ্র থেকে কারাগারে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তবে ৯ বছরের নিচে এবং ৯–১২ বছরের ক্ষেত্রে বিশেষ নিয়ম আছে

বাংলাদেশের দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর ধারা ৮২ অনুযায়ী ৯ বছরের কম বয়সী শিশুর কোনো কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য হয় না। আর ৯ বছরের বেশি কিন্তু ১২ বছরের কম বয়সী শিশুর ক্ষেত্রে, সে যদি কাজটির প্রকৃতি ও পরিণতি বোঝার মতো যথেষ্ট পরিপক্ব না হয়, তাহলে সেই কাজ অপরাধ হিসেবে গণ্য নাও হতে পারে।

সহজভাবে বয়স অনুযায়ী বিষয়টি

বয়স আইনি অবস্থান
৯ বছরের কম অপরাধের জন্য ফৌজদারি দায় নেই
৯–১২ বছরের কম যথেষ্ট পরিপক্বতা/বোঝার ক্ষমতা ছিল কি না বিবেচ্য
১২–১৮ বছরের কম শিশু হিসেবে বিচার; শিশু-আদালত ও শিশু আইন প্রযোজ্য
১৮ বছর বা বেশি সাধারণ প্রাপ্তবয়স্ক ফৌজদারি আইন প্রযোজ্য

অর্থাৎ, ১৭ বছর ১১ মাস বয়সী কেউ হত্যা করলে তাকে “প্রাপ্তবয়স্ক খুনি” হিসেবে সাধারণ আইনে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া যাবে না; তার ক্ষেত্রে শিশু আইন, ২০১৩ অনুযায়ী শিশু-আদালতের বিশেষ বিধান প্রযোজ্য হবে।

তাই শেষ কথা হলো—

দেশে অপ্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যে নানা কারণে অপরাধপ্রবণতা বাড়ছে। ফলে তারা খুন, রাহাজানি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন ধরনের অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৮ বছর পূর্ণ না হলে কোনো অপরাধের বিচার ও শাস্তি কী হতে পারে—তা জেনে-বুঝেই তারা অপরাধে জড়াচ্ছে।

তাই অপ্রাপ্তবয়স্করা কেন দিন দিন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে, এর কারণ খুঁজে বের করা এখন সময়ের দাবি। একইসঙ্গে এই সমস্যা থেকে উত্তরণের কার্যকর পথও খুঁজে বের করতে হবে।

সর্বোপরি, আইনকে আরও যুগোপযোগী ও কার্যকর করা অত্যন্ত প্রয়োজন, যাতে বয়সের ফাঁক গলিয়ে কোনো ছেলেমেয়ে খুন, রাহাজানি, ছিনতাইসহ গুরুতর অপরাধ করার দুঃসাহস না পায়।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, আইনজীবী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক