দেশের বর্তমান অর্থনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতা অত্যন্ত কঠিন। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, কর্মসংস্থানের সংকট, ব্যবসা-বাণিজ্যে মন্দাভাব, বিনিয়োগের অনিশ্চয়তা এবং সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান আর্থিক চাপ—সব মিলিয়ে দেশের মানুষ এক ধরনের কঠিন সময় পার করছে। এমন একটি সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য নতুন পে-স্কেল ঘোষণা করে যদি তাদের বেতন-ভাতা অস্বাভাবিক হারে বাড়ানো হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন ওঠে—এই সিদ্ধান্ত কতটা সময়োপযোগী, ন্যায়সংগত এবং দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধি প্রয়োজন হতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে বেতন কাঠামো পরিবর্তন না হলে কিংবা দ্রব্যমূল্যের সঙ্গে আয় সামঞ্জস্যপূর্ণ না থাকলে তাদের জীবনযাত্রায় চাপ সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনকারী সরকারি কর্মচারীদের সম্মানজনক ও মর্যাদাপূর্ণ জীবনযাপনের সুযোগ থাকা অবশ্যই প্রয়োজন। কিন্তু রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সম্পদ যখন সীমিত, তখন কোনো একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির মানুষের আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধির আগে দেশের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর আর্থিক অবস্থার কথাও সমানভাবে বিবেচনা করা জরুরি।

ছবি: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি ও লেখক
কারণ সরকারি চাকরিজীবীরা এই দেশের মানুষের বাইরে কোনো আলাদা জনগোষ্ঠী নন। তাদের বেতন আসে মূলত রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে, আর রাষ্ট্রীয় কোষাগারের অর্থের প্রধান উৎস হলো জনগণের দেওয়া কর, ভ্যাট, শুল্ক এবং অন্যান্য রাজস্ব। অর্থাৎ একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক বাস্তবতার একটি সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে বেসরকারি চাকরিজীবী একই দ্রব্যমূল্যের বাজারে সংসার চালাচ্ছেন, তার আয় কতটা বাড়ছে? যে ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ব্যাংকঋণের উচ্চ সুদ, বাজারের অনিশ্চয়তা, বিদ্যুৎ-গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি এবং নানা ধরনের ব্যয় বহন করে ব্যবসা টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করছেন, তার কথা কে ভাবছে? যে দিনমজুর সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত শ্রম দিয়ে পরিবারের খাবার জোগাড় করেন, তার আয় কি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে বাড়ছে? একজন রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক কিংবা ক্ষুদ্র দোকানদার—তাদের জন্য রাষ্ট্রের আর্থিক সহায়তার কাঠামো কোথায়?
একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়লে তার পরিবার উপকৃত হয়। কিন্তু রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের বড় একটি অংশ যখন বেতন-ভাতা বৃদ্ধির পেছনে চলে যায়, তখন সেই অর্থের সুযোগব্যয়ও বিবেচনা করতে হয়। একই অর্থ দিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের সহায়তা, কৃষি সম্প্রসারণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন কিংবা সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর মতো বহু কাজ করা সম্ভব।
এখানেই মূল প্রশ্নটি আসে—রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক সুবিধা বণ্টনের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার নির্ধারণের নীতি কী হওয়া উচিত?
শুধু সরকারি চাকরি করেন বলেই একজন নাগরিকের আয় বৃদ্ধির সুযোগ থাকবে, আর একই দেশের একজন বেসরকারি চাকরিজীবী বা শ্রমজীবী মানুষ বাজারের ওপর ছেড়ে দেওয়া হবে—এমন বৈষম্য দীর্ঘমেয়াদে সমাজে অসন্তোষ সৃষ্টি করতে পারে। সরকারি চাকরি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু একজন নাগরিকের প্রয়োজন, মর্যাদা এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা কেবল তার পেশার ওপর নির্ভর করা উচিত নয়।
বরং বর্তমান বাস্তবতায় একটি সমন্বিত জাতীয় আয় ও জীবনযাত্রার ব্যয়-সামঞ্জস্য নীতি প্রয়োজন।
সরকারি কর্মচারীদের বেতন বাড়ানো হলে বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্যও ন্যূনতম ও জীবনযাপনযোগ্য মজুরি নিশ্চিত করার বিষয়ে রাষ্ট্রকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। শ্রমিকদের মজুরি নির্ধারণে শুধু শিল্পমালিকের সক্ষমতা নয়, জীবনযাত্রার প্রকৃত ব্যয়ও বিবেচনায় নিতে হবে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ শর্তে ঋণ, কর-সুবিধা এবং ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। কৃষক ও শ্রমজীবী মানুষের উৎপাদন ও আয় সুরক্ষার জন্য কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
অন্যথায় একদিকে সরকারি চাকরিজীবীদের আয় দ্রুত বাড়বে, অন্যদিকে দেশের বৃহৎ জনগোষ্ঠীর আয় স্থবির থাকবে। এর ফলে বাজারে পণ্যের চাহিদা ও মূল্য উভয়ের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। সরকারি বেতন বাড়ানোর পর যদি দ্রব্যমূল্য আরও বাড়ে, তাহলে প্রকৃত অর্থে বেতন বৃদ্ধির সুফলও অনেকাংশে কমে যেতে পারে।
আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—বেতন বৃদ্ধি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মধ্যে একটি যৌক্তিক সম্পর্ক থাকা প্রয়োজন।
রাষ্ট্রের কর্মচারীদের ভালো বেতন দেওয়া অবশ্যই ভালো প্রশাসনের একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত। কিন্তু এর সঙ্গে জবাবদিহিতা, দক্ষতা, সেবার মান এবং কর্মদক্ষতার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্ব পাওয়া উচিত। একজন সরকারি কর্মচারীর বেতন বাড়বে, কিন্তু সাধারণ মানুষ সরকারি সেবা পেতে আগের মতোই হয়রানি, বিলম্ব, দুর্নীতি বা অদক্ষতার মুখোমুখি হবে—এটি কোনোভাবেই কাম্য হতে পারে না।
একটি আধুনিক রাষ্ট্রে সরকারি চাকরি শুধু চাকরি নয়; এটি জনগণের সেবা করার দায়িত্ব। ফলে বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে জনগণও স্বাভাবিকভাবেই উন্নততর সেবা প্রত্যাশা করবে।
এখানে আরেকটি বাস্তবতা মনে রাখা দরকার। দেশের সরকারি চাকরিজীবীর সংখ্যা মোট জনসংখ্যার তুলনায় সীমিত। কিন্তু বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, পরিবহনকর্মী, ক্ষুদ্র উদ্যোক্তা, ফ্রিল্যান্সার এবং অনানুষ্ঠানিক খাতে কর্মরত মানুষের সংখ্যা অনেক বেশি। দেশের অর্থনীতির প্রকৃত চাকা ঘোরে মূলত এই বিশাল জনগোষ্ঠীর শ্রম ও উদ্যোগের ওপর।
একজন ব্যবসায়ী ব্যবসা করে কর দেন, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী আয়কর ও ভ্যাটের মাধ্যমে অর্থনীতিতে অবদান রাখেন, একজন শ্রমিক তার শ্রম দিয়ে উৎপাদন বাড়ান, একজন কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন। এদের প্রত্যেকেই রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক কাঠামোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
তাহলে তাদের জন্য রাষ্ট্রীয় নীতিতে সমান গুরুত্ব থাকবে না কেন?
রাষ্ট্র যদি সত্যিই কল্যাণমূলক রাষ্ট্র হতে চায়, তাহলে তার নীতি হতে হবে শুধু সরকারি কর্মচারীবান্ধব নয়, বরং নাগরিকবান্ধব।
পে-স্কেল ঘোষণার আগে কিংবা পরে সরকারকে অন্তত কয়েকটি বিষয় নিয়ে ভাবা প্রয়োজন।
প্রথমত, সরকারি বেতন বৃদ্ধির পাশাপাশি বেসরকারি খাতের কর্মীদের জন্য বাস্তবসম্মত ন্যূনতম মজুরি ও বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা।
দ্বিতীয়ত, ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের জন্য কর ও ঋণব্যবস্থাকে সহজ করা এবং ব্যবসার খরচ কমানোর উদ্যোগ নেওয়া।
তৃতীয়ত, নিম্নআয়ের মানুষের জন্য কার্যকর সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি সম্প্রসারণ করা।
চতুর্থত, দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণে শুধু বাজার তদারকি নয়, সরবরাহব্যবস্থা ও বাজার কাঠামোর মৌলিক সমস্যাগুলো সমাধান করা।
পঞ্চমত, সরকারি কর্মচারীদের বেতন বৃদ্ধির সঙ্গে তাদের কর্মদক্ষতা, জবাবদিহিতা ও জনসেবার মান উন্নয়নের সুস্পষ্ট ব্যবস্থা করা।
ষষ্ঠত, সরকারি ব্যয়ের ক্ষেত্রে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক সক্ষমতা বিবেচনা করা। কারণ আজ বেতন বাড়ানো সহজ হলেও আগামী দশকগুলোতে সেই বেতন, পেনশন ও অন্যান্য সুবিধার দায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারকে বহন করতে হবে।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয় যখন সেই দেশের মধ্যবিত্ত, নিম্নমধ্যবিত্ত এবং নিম্নআয়ের মানুষের ক্রয়ক্ষমতা বাড়ে। শুধু একটি শ্রেণির মানুষের আয় বাড়িয়ে সামগ্রিক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন করা সম্ভব নয়।
আমরা সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বৃদ্ধির বিরোধিতা করছি না। বরং আমরা বলতে চাই—বেতন বাড়ুক, কিন্তু সেই বৃদ্ধির সঙ্গে দেশের অন্যান্য শ্রেণি-পেশার মানুষের অর্থনৈতিক নিরাপত্তার বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হোক।
সরকারি চাকরিজীবীও একজন নাগরিক, বেসরকারি চাকরিজীবীও একজন নাগরিক, ব্যবসায়ীও একজন নাগরিক, শ্রমিকও একজন নাগরিক। রাষ্ট্রের চোখে প্রত্যেকের মর্যাদা সমান হওয়া উচিত।
একজন সরকারি কর্মকর্তা যখন নতুন পে-স্কেল পেয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলবেন, তখন একজন বেসরকারি চাকরিজীবী যেন বাজারের বাড়তি দামের কথা ভেবে আতঙ্কিত না হন। একজন সরকারি কর্মচারী যখন বেতন বৃদ্ধির আনন্দ করবেন, তখন একজন দিনমজুর যেন সন্তানকে স্কুলে পড়ানোর খরচ নিয়ে অসহায় হয়ে না পড়েন। একজন সরকারি কর্মচারীর জীবনযাত্রা উন্নত হবে, একই সময়ে একজন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী যেন ব্যবসা বন্ধ করে দিতে বাধ্য না হন—এটাই হওয়া উচিত একটি ভারসাম্যপূর্ণ রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক নীতির লক্ষ্য।
আমাদের মনে রাখতে হবে, রাষ্ট্র কোনো একটি শ্রেণির জন্য নয়; রাষ্ট্র তার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য।
তাই বর্তমান দুর্যোগপূর্ণ অর্থনৈতিক সময়ে নতুন পে-স্কেল ঘোষণার বিষয়টি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন কত শতাংশ বাড়ল—এই হিসাবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে এর সামগ্রিক অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা হওয়া প্রয়োজন। রাজস্ব আয়, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বেসরকারি খাতের মজুরি, ব্যবসার সক্ষমতা, সামাজিক নিরাপত্তা এবং সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা—সবকিছু একসঙ্গে বিবেচনা করেই সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।
কারণ শেষ পর্যন্ত দেশের উন্নয়নের সবচেয়ে বড় সূচক হলো—সাধারণ মানুষ কেমন আছে।
সরকারি কর্মচারীরা ভালো থাকবেন—এটি অবশ্যই কাম্য। কিন্তু তাদের ভালো থাকার পাশাপাশি বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুর এবং দেশের কোটি কোটি সাধারণ মানুষও যদি স্বস্তিতে থাকতে না পারেন, তাহলে কেবল একটি শ্রেণির আয় বৃদ্ধি দিয়ে প্রকৃত অর্থে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জন সম্ভব হবে না।
সুতরাং সময় এসেছে নতুন করে ভাবার—আমরা কি শুধু সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেল চাই, নাকি এমন একটি জাতীয় অর্থনৈতিক কাঠামো চাই যেখানে দেশের প্রতিটি কর্মজীবী মানুষ তার শ্রম, দক্ষতা ও অবদানের ন্যায্য মূল্য পাবে?
এই প্রশ্নের উত্তর শুধু সরকারের কাছে নয়; আমাদের সবার কাছেই থাকা উচিত।
মো. কাওছার আলম চৌধুরী: কবি ও লেখক





