ঢাকা | সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৬ আশ্বিন ১৪৩৩

গোদের ওপর বিষফোঁড়া: সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য পে-স্কেল, সাধারণ মানুষের জন্য কী?

বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় ১৮ কোটির বেশি মানুষের বসবাস। এই বিশাল জনগোষ্ঠীর মধ্যে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে একটি ছোট অংশ। বাকি বৃহৎ জনগোষ্ঠীর মধ্যে রয়েছেন বেসরকারি চাকরিজীবী, ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক, দিনমজুরসহ নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ। এক কথায় যাদের আমরা আমজনতা কিংবা সাধারণ জনগণ বলে থাকি।

২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও গণঅভ্যুত্থানের পর শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটে এবং দেশে অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব গ্রহণ করে। প্রায় ১৫ মাসের বেশি সময় দায়িত্ব পালনের পর সেই সরকারের সময়ে জাতীয় সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। নির্বাচনের পর বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করে।

বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যেন আলাদীনের চেরাগ হাতে নিয়ে হাজির হয়েছে। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর গত ১৯ সেপ্টেম্বর নতুন জাতীয় পে-স্কেলের গেজেট প্রকাশ করা হয়েছে। নতুন কাঠামো ২০২৬ সালের ১ জুলাই থেকে কার্যকর ধরা হয়েছে এবং ধাপে ধাপে বাস্তবায়ন হবে। নতুন পে-স্কেলে গ্রেডভেদে মূল বেতন ১০০ শতাংশ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। সর্বনিম্ন গ্রেডের মূল বেতন ৮,২৫০ টাকা থেকে বেড়ে ২০,০০০ টাকা হয়েছে।

একজন বেসরকারি চাকরিজীবী কিংবা সাধারণ নাগরিক হিসেবে সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানোয় আমার কোনো হিংসা নেই, কষ্টও নেই। বরং প্রত্যেক মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় ও বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সম্মানজনক বেতন পাওয়ার অধিকার রয়েছে—এ কথা অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। আমার কষ্টটা অন্য জায়গায়।
সরকারি চাকরিজীবীদের বাইরে যে বিশাল জনগোষ্ঠী রয়েছে, তারাও তো এ দেশেরই নাগরিক। তারাও দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখেন। কৃষক খাদ্য উৎপাদন করেন, শ্রমিক কলকারখানায় কাজ করেন, ব্যবসায়ী কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেন, বেসরকারি চাকরিজীবীরা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে সেবা দেন। এই সাধারণ মানুষের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কর, শ্রম এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপরই তো রাষ্ট্রের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে।

তাহলে প্রশ্ন হচ্ছে—এই বিশাল জনগোষ্ঠীকে নিয়ে সরকারের ভাবনা কোথায়? যে সাধারণ মানুষের ভোটে একটি সরকার রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পায়, তাদের জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো কিংবা তাদের আয় ও কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানোর জন্যও কি সমানভাবে কিছু করার প্রয়োজন ছিল না?

এর মধ্যেই যেন গোদের ওপর বিষফোঁড়া হয়ে দেখা দিয়েছে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি। ২১ সেপ্টেম্বর থেকে নতুন করে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়েছে। ডিজেলের দাম প্রতি লিটারে ১১৫ টাকা থেকে বেড়ে ১৩৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ থেকে ১৬০ টাকা এবং অকটেন ১৪৫ থেকে ১৬৫ টাকা হয়েছে। অর্থাৎ ডিজেলের ক্ষেত্রেই এক লাফে প্রতি লিটারে ২০ টাকা বেড়েছে। এই মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব শুধু গাড়ির জ্বালানিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না। পরিবহন খরচ বাড়বে, পণ্য পরিবহনের ব্যয় বাড়বে, উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং শেষ পর্যন্ত তার চাপ গিয়ে পড়বে সাধারণ ভোক্তার পকেটেই। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি যে মূল্যস্ফীতি ও উৎপাদন-পরিবহন ব্যয়ের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করতে পারে, অর্থনীতিবিদ ও ব্যবসায়ী মহলেও এমন আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এমনিতেই বেসরকারি চাকরিজীবী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কৃষক, শ্রমিক ও দিনমজুর—জীবন চালাতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছেন। আয় বাড়ছে না, অথচ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার ব্যয় বাড়ছে। এর মধ্যে যদি জ্বালানি, বিদ্যুৎ কিংবা অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবার মূল্যও বারবার বাড়তে থাকে, তাহলে এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে?

সরকারি চাকরিজীবীদের বেতন বাড়ানো হোক—এতে আমার আপত্তি নেই। কিন্তু একই সঙ্গে বেসরকারি চাকরিজীবী, কৃষক, শ্রমিক, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, দিনমজুরসহ সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার কথাও রাষ্ট্রকে ভাবতে হবে। কারণ রাষ্ট্র কেবল সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়ে নয়; রাষ্ট্র মানে সব নাগরিক। সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যদি নতুন পে-স্কেল হতে পারে, তাহলে সাধারণ মানুষের জন্যও মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান বৃদ্ধি, জ্বালানি ও বিদ্যুতের মূল্য সহনীয় রাখা, সামাজিক নিরাপত্তা জোরদার করা এবং বেসরকারি খাতের কর্মীদের আয় ও সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধির বিষয়ে কার্যকর পরিকল্পনা থাকা প্রয়োজন। নইলে একদিকে কারও আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে, আর অন্যদিকে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর ব্যয় যদি ক্রমাগত বাড়তেই থাকে—তাহলে রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ভারসাম্য নিয়ে প্রশ্ন ওঠাই স্বাভাবিক।

সরকারি চাকরিজীবীরা এ দেশের মানুষ, সাধারণ মানুষও এ দেশেরই মানুষ। রাষ্ট্রের কাছে দুজনেরই সমান মর্যাদা ও গুরুত্ব থাকা উচিত। প্রশ্ন শুধু এটুকুই—
সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য যখন এত বড় উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব, তখন দেশের বৃহত্তর সাধারণ মানুষের জন্য সরকার কী ভাবছে?

মোঃ কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক