বিশ্ব রাজনীতির জটিল ভূরাজনৈতিক টানাপোড়েন, সরবরাহ শৃঙ্খলের বিশ্বব্যাপী অস্থিরতা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে যখন বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা মারাত্মক হুমকির মুখে, তখন বাংলাদেশের কৃষি ও খাদ্য খাতের সবচেয়ে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য অংশীদার হিসেবে পাশে দাঁড়িয়েছে রাশিয়া। বিশেষ করে গত পাঁচ বছরে বৈশ্বিক সংকট, মহামারি, শস্য আমদানিতে বৈশ্বিক জটিলতা এবং আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞার প্রবল চাপ সত্ত্বেও দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক কৃষি ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে। করোনাকালীন চরম সংকটে কোনো আগাম চুক্তি ছাড়াই খাদ্যশস্য সরবরাহ থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক সময়ে বাজারদরের চেয়ে কম মূল্যে সার প্রস্তাব ও উপহারের পটাশ হস্তান্তর সবমিলিয়ে বাংলাদেশের কৃষি অর্থনীতিকে সুদৃঢ় রাখতে মস্কোর ভূমিকা অত্যন্ত স্পষ্ট।
সম্প্রতি বাংলাদেশ ও রাশিয়ার গম বাণিজ্য নিয়ে কিছু অসত্য ও বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচার পায়। এর জবাবে স্পষ্টীকরণ দিয়েছে ঢাকায় নিযুক্ত রুশ দূতাবাস। গত ১৯ আগস্ট রুশ পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও ঢাকাস্থ দূতাবাসের অফিশিয়াল পেজে বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, রাশিয়ার সাথে বাংলাদেশের গম বাণিজ্য সম্পূর্ণ স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় ও আন্তর্জাতিক ফাইটোসানটারি মানদণ্ড অনুসরণ করে পরিচালিত হয়। সরকারি পর্যায়ে সরাসরি তদারকির মাধ্যমে চুক্তির সব শর্ত পূরণ করা হয় এবং এতে তৃতীয় কোনো পক্ষের হস্তক্ষেপের সুযোগ নেই। চট্টগ্রাম বন্দরে পৌঁছানোর পর গুণগত পরীক্ষা সম্পন্ন করেই গম গ্রহণ করা হয়। তাই নিম্নমানের গম সরবরাহের দাবি পুরোপুরি ভিত্তিহীন। একই সাথে বিজ্ঞপ্তিতে গণমাধ্যমকে পেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়ে বস্তুনিষ্ঠ ও তথ্যভিত্তিক সংবাদ প্রকাশের আহ্বান জানানো হয়।
বিগত দিনের তথ্য উপাত্ত বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, বিপদের সময়ে রাশিয়া সবসময়ই বাংলাদেশের পাশে থেকেছে। ২০২০-২১ সালে করোনাভাইরাস মহামারির বিশ্বব্যাপী প্রভাবে যখন আন্তর্জাতিক সরবরাহ ব্যবস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েছিল, তখন আপদকালীন প্রয়োজনে কোনো আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছাড়াই বাংলাদেশে গম পাঠিয়েছিল রাশিয়া। পরবর্তীতে দ্বিপাক্ষিক সমঝোতার মাধ্যমে ১২ শতাংশ প্রোটিনের মান নিশ্চিত করে সেই সরবরাহ স্বাভাবিক রাখা হয়। ২০২৪ সাল থেকে রাশিয়ার সামগ্রিক শস্য রপ্তানি ১২ শতাংশ বেড়ে ৩০.৮ মিলিয়ন টনে দাঁড়িয়েছে। বিশেষ করে ২০২৩-২৪ কৃষি বছরে রাশিয়া বাংলাদেশে রেকর্ড ৩.৮ মিলিয়ন টন গম রপ্তানি করেছে, যা আগের বছরের তুলনায় প্রায় ১.৮ গুণ বেশি। বিশ্ববাজারে আন্তর্জাতিক খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি সত্ত্বেও তারা সাশ্রয়ী মূল্যে গুণগত মানসম্মত গম পাঠিয়েছে।
খাদ্যশস্যের পাশাপাশি বাংলাদেশের কৃষি উৎপাদনের মূল চালিকাশক্তি রাসায়নিক সার সরবরাহে রাশিয়ার অবদান কৌশলগত সহযোগিতায় রূপ নিয়েছে। গত ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ তারিখে জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির আওতায় রাশিয়ার সার প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠান ‘উরালচেম’ বাংলাদেশকে উপহার হিসেবে ৩০ হাজার মেট্রিক টন এমওপি পটাশ সার হস্তান্তর করে। পাশাপাশি খাদ্য উৎপাদন খরচ কমাতে রাশিয়া সম্প্রতি আন্তর্জাতিক বাজারদরের চেয়ে প্রতি মেট্রিক টনে ১০ মার্কিন ডলার কম দামে প্রায় ২ লাখ ৮০ হাজার মেট্রিক টন ইউরিয়া সার সরবরাহের প্রস্তাব দিয়েছে। সারের পাশাপাশি সূর্যমুখী তেল, ডাল ও অন্যান্য খাদ্যপণ্য সরবরাহে দুই দেশের মধ্যে নতুন যৌথ আলোচনা ও চুক্তি সম্পাদিত হয়েছে।

ইউক্রেন সংঘাতের পর মার্কিন নেতৃত্বাধীন পশ্চিমা অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক ব্যাংকিং লেনদেন ব্যবস্থা ‘সুইফট’ থেকে রাশিয়ার ব্যাংকগুলোকে বিচ্ছিন্ন করার ফলে বাণিজ্যে বড় ধরনের আর্থিক জটিলতা তৈরি হয়। তবে এই বাধা সত্ত্বেও খাদ্য ও সারের চাহিদা মেটাতে বিকল্প পেমেন্ট ব্যবস্থার দিকে হাঁটছে ঢাকা ও মস্কো। স্থানীয় মুদ্রা কিংবা আঞ্চলিক ব্যাংকিং সুবিধার মাধ্যমে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্য নিষ্পত্তির এই প্রক্রিয়া বাস্তবায়িত হলে আগামী দিনে খাদ্য ও সার আমদানির পথ পুরোপুরি সংকটমুক্ত হবে।
খাদ্য নিরাপত্তা সুসংহত করতে পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে শস্য সংগ্রহ করা অত্যন্ত জরুরি। তথ্যের সঠিক পর্যালোচনা নিশ্চিত করে যে রাশিয়ার সাথে এই স্বচ্ছ বাণিজ্য ও দীর্ঘমেয়াদি কৃষি সহযোগিতা বাংলাদেশের জন্য একটি টেকসই সমাধান। অপপ্রচার বা বিভ্রান্তিকর তথ্যের ঊর্ধ্বে উঠে দ্বিপাক্ষিক বাণিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখাই দেশের খাদ্য নিরাপত্তার স্বার্থে সবচেয়ে মঙ্গলজনক।
লেখক: ড. বারেক কায়সার, শিক্ষক ও স্বাধীন সাংবাদিক।





