স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে নিরলস প্রচেষ্টার কোনো বিকল্প নেই—এ কথারই প্রমাণ হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (হাবিপ্রবি) কৃষি অনুষদের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী সাদিক আল আমিন। ৪৭তম বিসিএসে কৃষি ক্যাডারে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়েছেন তিনি। এটিই ছিল তাঁর প্রথম বিসিএস পরীক্ষা।
প্রথম বিসিএসেই কাঙ্ক্ষিত ক্যাডার পাওয়ার অনুভূতি, প্রস্তুতির কৌশল, বিশ্ববিদ্যালয়জীবন, ভাইভা অভিজ্ঞতা এবং নতুনদের জন্য পরামর্শ নিয়ে দ্য স্টুডেন্ট জার্নালের সঙ্গে কথা বলেছেন সাদিক আল আমিন।
প্রশ্ন: প্রথম বিসিএসেই কৃষি ক্যাডার পাওয়ার অনুভূতি কেমন?
উত্তর: সত্যি কথা বলতে, প্রত্যাশা একটু বেশিই ছিল। তবে প্রথম বিসিএস হিসেবে আলহামদুলিল্লাহ। আমার চেয়ে আশেপাশের মানুষের অনুভূতি আর উচ্ছ্বাস দেখতে ভালোই লাগছে। বেশ এনজয়এবল।
প্রশ্ন: এই সফলতার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা কী ছিল?
উত্তর: সবচেয়ে বড় ভূমিকা হলো নিজের প্রচণ্ড ইচ্ছেশক্তি। তীব্র তাগিদ ছাড়া কোনো কিছুই আপনাকে সার্টেইন গোলের দিকে পুশ করতে পারবে না।
প্রশ্ন: আপনার প্রস্তুতি কবে থেকে শুরু করেছিলেন?
উত্তর: জানুয়ারি, ২০২৫ এ অনার্স ফাইনাল রেজাল্ট দেওয়ার পরপরই ফেব্রুয়ারিতে ঢাকায় চলে যাই এবং মেইনস্ট্রিম পড়াশোনায় ঢুকে পড়ি। প্রায় ১ বছর ৪ মাসের সফর ছিল।
প্রশ্ন: বিসিএস প্রস্তুতির জন্য টাইম ম্যানেজমেন্ট কেমন ছিল?
উত্তর: পড়াশোনার টাইম ম্যানেজমেন্ট আমার কখনোই ভালো ছিল না। ইচ্ছে হলে পড়তাম, নয়তো পড়তাম না। নিজের ওপর জোর করে পড়া চাপিয়ে দিতাম না। তবে প্রিলির আগে বেশ কয়েকটা কোচিং-এ মডেল টেস্ট দিয়েছিলাম। পরীক্ষার হলের টাইম ম্যানেজমেন্টটা মেইন ফ্যাক্টর। রিটেনের ক্ষেত্রেও সেইম। এর জন্য দরকার প্রচুর পরীক্ষা দেওয়া।
প্রশ্ন: প্রিলিমিনারি, লিখিত ও ভাইভার জন্য আলাদা করে কীভাবে প্রস্তুতি নিয়েছেন?
উত্তর: আপনারা জানেন যে ৪৭ প্রিলি পেছাতে পেছাতে সেপ্টেম্বরে টেনেছে। পরীক্ষাও পিছিয়েছে, পড়াও বাড়িয়েছি। তবে প্রিলির আগে শুধু প্রিলির পড়াই পড়েছি। রিটেনের জন্য পড়িনি। প্রিলি পাশের পর দেখলাম হাতে ২ মাস মাত্র। এর মধ্যে রিটেন পেছানোর আন্দোলন এত জোরালো হয়ে উঠেছিল যে ধরে নিয়েছিলাম পরীক্ষা পেছাবে। কিন্তু শেষমেশ পেছায়নি। ওটুকু সময়ের মধ্যেই যেটুকু পেরেছি, পড়েছি। বাংলা ও ইংরেজিতে ফ্রি-হ্যান্ড রাইটিং ভালো হওয়ায় ততটা বেগ পেতে হয়নি। তাছাড়াও আমি তিনটি বইয়ের লেখক। রিটেন মডেল টেস্টে যখন নতুনরা সাফার করতো, তখন আমি বেশ স্বাচ্ছন্দ্যেই পরীক্ষা দিতে পারতাম। আর ভাইভার কয়েকদিন আগে গাইড বই কিনে প্রচুর পড়াশোনা করেছিলাম। কিন্তু তার কিছুই বোর্ডে ধরেনি। এটা সবার ক্ষেত্রেই হয়। ভাইভায় আপনি কিছুই কমন পাবেন না, কাজে দেবে আপনার উপস্থিত বুদ্ধি আর সিচুয়েশন হ্যান্ডলিং ক্যাপাবেলিটি।
প্রশ্ন: কোন কোন বই ও রিসোর্স আপনার জন্য সবচেয়ে বেশি সহায়ক ছিল?
উত্তর: বাজারের প্রচলিত কিছু বইই ফলো করতাম। প্রিলির ১ মাস আগে ডাইজেস্ট পড়লে কনফিডেন্স বুস্ট হয়। কিন্তু এখন দিন দিন প্রশ্নের ধরন এমন হচ্ছে যে, গাইড বই পড়ে খুব একটা লাভ হয় না। দরকার স্ট্রং বেসিক ও মৌলিক বইয়ের বিষয়ে সম্যক জ্ঞান ও স্পষ্ট ধারণা। নিয়মিত পত্রিকা পড়ার অভ্যাসও করা উচিত।
প্রশ্ন: প্রস্তুতির সময় কী কী চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছেন এবং সেগুলো কীভাবে মোকাবিলা করেছেন?
উত্তর: ম্যাথে আমি একদম দুর্বল। ম্যাথই আমার একমাত্র চ্যালেঞ্জ। কিন্তু মোকাবেলা করবার মতো সময় পাইনি। অন্যান্য সাবজেক্ট দিয়ে কভার করেছি। ইংরেজিতে টপ-নচ প্রিপারেশন ছিল।
প্রশ্ন: হতাশা বা মোটিভেশন কমে গেলে কীভাবে নিজেকে আবার প্রস্তুত করতেন?
উত্তর: প্রখ্যাত উর্দু কবি উস্তাদ বশির বদরের বিখ্যাত একটা কবিতা আমাকে জাগিয়ে রাখত— “হাম ভি দারিয়া হ্যায়/হামে আপনা হোনার মালুম হ্যায়/যিস টারাফ ভি চাল পাড়েঙ্গে/রাস্তা হো যায়েগা।”
প্রশ্ন: বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা ও বিসিএস প্রস্তুতি কীভাবে একসঙ্গে সামলেছেন?
উত্তর: ছাত্রাবস্থায় আমি বিসিএসের মেইনস্ট্রিম পড়াশোনায় ঢুকিনি। কারণ দুটো পড়া আমি সমানতালে চালাতে পারি না। অনার্সে শুধু একাডেমিকই পড়েছি। আমার সিজিপিএ-ও ৩.৫+। তবে প্রচুর আউট-বুক পড়তাম। সেগুলোই আমাকে সমৃদ্ধ করেছে। অনার্স শেষ করে একেবারে মেইনস্ট্রিম পড়াশোনায় ঢুকে পড়ি।
প্রশ্ন: হাবিপ্রবির শিক্ষকদের বা বন্ধুদের কাছ থেকে কী ধরনের সহযোগিতা পেয়েছেন?
উত্তর: শিক্ষকগণ সবসময়ই ভালোবাসা ও অনুপ্রেরণা দিয়ে গেছেন। আমি নিজে না যতটা, তার থেকেও বেশি বন্ধুরা আমার ওপর ভরসা করত; এখনো করে। এটাই আমার শক্তি।
প্রশ্ন: ভাইভা বোর্ডে কী ধরনের প্রশ্ন করা হয়েছিল? কোনো স্মরণীয় অভিজ্ঞতা শেয়ার করবেন?
উত্তর: ভাইভা বোর্ডে মূলত দেখা হয় আপনি প্রেশার হ্যান্ডেল করতে পারছেন কি না। প্রথমে বোর্ডে ঢোকার পর কিছুটা নার্ভাস লাগলেও পরে সামলে নিয়েছি। আর বোর্ড মেম্বাররা এমন গোমরামুখো হয়ে থাকেন এবং প্রশ্ন এমনভাবে প্যাঁচাতে থাকেন যে, আপনার উত্তরে আপনি নিজেই কনফিউজড হয়ে যাবেন। তবে একটা প্রশ্নের উত্তর দিতে পেরে নিজেকে ভালো লেগেছে। চেয়ারম্যান স্যার প্রশ্ন করেছিলেন, “আপনার মতে কৃষিবিদদের অবদানই দেশে সবচেয়ে বেশি কিনা?” আমি ব্যালেন্স করে অন্যান্য সেক্টরের অবদান উল্লেখ করে উত্তর দেয়ার চেষ্টা করলেও স্যার সেটা নেননি। পরে উত্তর করলাম, “স্যার, যেহেতু কৃষিপ্রধান দেশ, কৃষিবিদদেরই অবদান তাই সবচেয়ে বেশি।” স্যার হয়তো উত্তরটি নিয়েছিলেন।
প্রশ্ন: যারা এখন বিসিএসের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন, তাদের জন্য আপনার পরামর্শ কী?
উত্তর: যারা অনার্সে অধ্যয়নরত, তাদের বলবো, প্রচুর পরিমাণে ফিকশন, নন-ফিকশন বই পড়ুন। নিজেকে ধীরে ধীরে সমৃদ্ধ করুন ও গড়ে তুলুন। যাদের স্নাতক শেষ, তাঁরা মৌলিক বইয়ের পাশাপাশি নিয়মিত দুটো পত্রিকা পড়ুন। নিজের বিশ্লেষণী ক্ষমতা বাড়ান। বারবার পরীক্ষা দিন। পরীক্ষার বিকল্প নেই। শুধু পড়ে গেলেই হবে না।
প্রশ্ন: প্রথমবারেই সফল হতে চাইলে কোন বিষয়গুলোতে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত?
উত্তর: ম্যাথ, ইংরেজি, বাংলায় টপ-নচ প্রিপারেশন রাখলে প্রথমবারেই ক্রাক করা সম্ভব।
প্রশ্ন: সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও মোবাইল ব্যবহারের ক্ষেত্রে কীভাবে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রেখেছিলেন?
উত্তর: একেবারেই নিয়ন্ত্রণে রাখিনি। অনেক ফেসবুকিং করতাম। এমন না যে, ক্যাডার হতে হলে ফেসবুক ডিএক্টিভ রাখতে হবে কিংবা চালানো যাবে না। আমার বন্ধু-বান্ধবরা জানে আমি কী পরিমাণ সময় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যয় করতাম। এর কিছু উপকারী দিকও আছে। যেকোনো উপকারী ভিডিও যেকোনো সময় আপনার কাজে লেগে যেতে পারে। জ্ঞান সব সোর্স থেকেই সংগ্রহ করুন। তবে, অপকারী কাজে এসব ব্যবহার করা যাবে না। সময় নষ্ট করা যাবে না।
প্রশ্ন: শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে আপনার অনুপ্রেরণামূলক বার্তা কী?
উত্তর: বার্তা দুটো, ১) নিজেকে জানুন ও বুঝুন। নিজের পটেনশিয়াল বুঝতে শিখুন। বুঝতে শিখুন আপনার দ্বারা কোনটা সম্ভব আর কোনটা নয়। নিজের সাথে বোঝাপড়াটা সবচেয়ে জরুরি। ২) স্বপ্নকে তীব্রভাবে ছুঁতে চাওয়ার মানসিকতা নিজের মধ্যে ধরে রাখুন। Never give up. Never embrace defeat.






