রাজধানীর সরকারি সাত কলেজকে নিয়ে গঠিত ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি। এই বিশ্ববিদ্যালয়কে ঘিরে দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক ও একাডেমিক জটিলতা নিরসনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে। তবে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামোয় নিজেদের অবস্থান ও ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তায় পড়েছেন সাত কলেজে কর্মরত বেসরকারি কর্মচারীরা।
কর্মচারীদের অভিযোগ, বছরের পর বছর কলেজগুলোর প্রশাসনিক ও দৈনন্দিন কার্যক্রম সচল রাখতে কাজ করলেও নতুন বিশ্ববিদ্যালয় কাঠামোয় তাঁদের অবস্থান কী হবে, সে বিষয়ে এখনো কোনো সুস্পষ্ট নিশ্চয়তা তাঁরা পাননি। ফলে একদিকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে যখন স্বপ্ন দেখছেন শিক্ষার্থী ও সংশ্লিষ্টরা, অন্যদিকে একই প্রতিষ্ঠানের দীর্ঘদিনের কর্মচারীদের মধ্যে তৈরি হয়েছে চাকরি হারানোর আশঙ্কা।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাত কলেজে বর্তমানে মোট প্রায় ৭৮১ জন বেসরকারি কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। এর মধ্যে ঢাকা কলেজে প্রায় ২০০ জন, ইডেন মহিলা কলেজে ১৮০ জন, সরকারি তিতুমীর কলেজে ১৩০ জন, সরকারি বাংলা কলেজে ১০৯ জন, বেগম বদরুন্নেসা সরকারি মহিলা কলেজে ৫২ জন, কবি নজরুল সরকারি কলেজে ৬০ জন এবং সরকারি শহীদ সোহরাওয়ার্দী কলেজে প্রায় ৫০ জন কর্মচারী রয়েছেন।
অফিস সহায়তা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, প্রশাসনিক সহায়তা ও বিভিন্ন দৈনন্দিন সহায়তার অংশ নেওয়া এসব কর্মচারীদের দুই দশকের বেশি সময় ধরে, কেউবা আরও দীর্ঘ সময় ধরে এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত। দীর্ঘদিন একই প্রতিষ্ঠানে কাজ করার কারণে এই চাকরিই তাঁদের পরিবারের প্রধান বা একমাত্র আয়ের উৎস হয়ে উঠেছে।
বছরের পর বছর চাকরি, বেতন ৫ থেকে ২০ হাজারের মধ্যে
দীর্ঘদিন চাকরি করেও সাত কলেজের বেসরকারি কর্মচারীদের অনেকের মাসিক বেতন ৫ হাজার টাকা বা তারও কম। সর্বোচ্চ বেতনও ২০ হাজার টাকার বেশি নয় বলে কর্মচারীরা জানিয়েছেন। কেউ ৩ থেকে ৪ হাজার টাকা বেতনে চাকরি শুরু করেছেন। পরে ধাপে ধাপে ২০০, ৪০০, ৫০০ বা ৭০০ টাকা করে বেতন বাড়লেও তাঁদের অনেকের আয় এখনো সীমিত পর্যায়েই রয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়লেও সীমিত আয়ের এই কর্মচারীদের বড় একটি অংশকে একই সঙ্গে পরিবার চালানো ও চাকরির ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবতে হচ্ছে।
কর্মচারীরা বলেন, একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শুধু শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের নিয়ে পরিচালিত হয় না। অফিস সহায়তা, নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্নতা, প্রশাসনিক সহায়তা, নথিপত্র সংরক্ষণসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ কাজে বেসরকারি কর্মচারীদের ভূমিকা রয়েছে।
আমাদের বিষয়ে এখনো কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি
কর্মচারীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিষ্কার সিদ্ধান্ত না আসায় তাঁদের মধ্যে উদ্বেগ বাড়ছে বলে জানিয়েছেন কর্মচারী পরিষদের সভাপতি মশিউর।
তিনি বলেন, “এ পর্যন্ত আমাদের বিষয়ে কোনো সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি। আমরা উপাচার্য স্যারকে স্মারকলিপি দিয়েছি। প্রশাসন বা বিশ্ববিদ্যালয় যেভাবে কাজ করতে বলবে, আমরা সেভাবেই কাজ করব। গত বছরের ভর্তি কার্যক্রম অনেক প্রতিকূল ছিল। তখন আমরা আমাদের জায়গা থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা শিক্ষকদের সঙ্গেও কথা বলব, তাঁরা আমাদের নিয়ে কোনো উদ্যোগ বা পরিকল্পনা করছেন কি না, তা জানার চেষ্টা করব। সাত কলেজের সব অধ্যক্ষের কাছে আমরা স্মারকলিপি দিয়েছি। আমাদের অধ্যক্ষ আমাদের বিষয়ে খুবই আন্তরিক। তিনি প্রশাসনিক দায়িত্ব নেওয়ার পর সাত কলেজের কর্মচারীদের তালিকা ইউজিসিতে পাঠিয়েছিলেন।”
বেতন নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে তিনি বলেন, “সরকারি কর্মচারীদের পে-স্কেল আছে। কিন্তু আমাদের ক্ষেত্রে বেতন বৃদ্ধি তো পরের বিষয়, সামনে দুই-চার মাস পর বেতন দিতে পারব কি না, সেটাই বড় প্রশ্ন। কারণ আমাদের বেতন ভর্তি কার্যক্রম থেকে আসা অর্থের ওপর নির্ভর করে। বর্তমানে শিক্ষার্থী কম ভর্তি হচ্ছে। এ অবস্থায় এই ব্যবস্থা কতদিন চালিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে, সেটি আমরা জানি না।”
কর্মচারীদের প্রত্যাশা, স্থায়ী সমাধান
কর্মচারীদের স্থায়ী সমাধান চেয়ে কর্মচারী পরিষদের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক দুলাল বলেন, “আমরা দীর্ঘদিন ধরে এই কলেজে কাজ করছি। আমাদের কাজে সন্তুষ্ট বলেই কর্তৃপক্ষ এতদিন ধরে আমাদের রেখেছে। আমরা যখন কাজে যোগ দিই, তখন শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল অষ্টম শ্রেণি পাস। বর্তমানে তা উচ্চমাধ্যমিক পাস করা হয়েছে।”
বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়ার দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, “যখন একটি বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন ওই প্রতিষ্ঠানের আওতাধীন জায়গার সবকিছুই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনার অধীনে চলে আসে। আমরা দীর্ঘদিন ধরে কলেজের কার্যক্রমে যুক্ত। বিষয়টি উপাচার্য স্যারকে জানালে তিনি বলেছেন, আমি তোমাদের বিষয়গুলো দেখছি।”
বেতন নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “শিক্ষার্থী ভর্তি কমে যাওয়ায় আমাদের বেতনের তহবিল কমে যাচ্ছে। পে-স্কেল তো দূরের কথা, বর্তমানে যে বেতন পাওয়ার কথা, সেটিও নিয়মিত দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের অধীনে নেওয়া হলে পরিবার নিয়ে স্থায়ীভাবে জীবনযাপন করতে পারব।”
কর্মচারী ছাড়া কলেজের কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়
কর্মচারীদের বিষয়ে ঢাকা কলেজের অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম ইলিয়াস বলেন, “কর্মচারীরা আমাকে স্মারকলিপি দিয়েছেন। তবে এরও আগে আমি ইউজিসিতে চিঠি দিয়েছি। কারণ আমাদের আশঙ্কা ছিল, সামনে একটা সংকট তৈরি হবে। শিক্ষার্থী সংখ্যা যেহেতু প্রায় ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে, তাই আয়ও কমে আসবে। আয় কমে গেলে এসব কর্মচারীর কী হবে? তাঁদের ছাড়া তো কলেজের কার্যক্রম চালানো সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “ঢাকা কলেজে ৩২ জন সরকারি কর্মচারী রয়েছেন। বাকি ১৯২ জন বেসরকারি কর্মচারী। এসব কর্মচারীর বেতন দুই ধরনের উৎস থেকে দেওয়া হয়। কিছু কর্মচারী কলেজ থেকে এবং কিছু বিভাগ থেকে বেতন পান।”
বেতন সংকটের বিষয়ে অধ্যক্ষ বলেন, “কিছু বিভাগের আর্থিক সক্ষমতা খুবই সীমিত। কোনো কোনো বিভাগের হাতে এক মাসের বেতন দেওয়ার মতো অর্থও নেই।” তিনি উদাহরণ দিয়ে বলেন, “মনোবিজ্ঞান বিভাগের অবস্থা এমন যে, এক মাসও চলা কঠিন। আরও কয়েকটি বিভাগেরও একই ধরনের সংকট রয়েছে।”
তিনি জানান, “আমি সচিব স্যারকেও বিষয়টি মৌখিকভাবে জানিয়েছি। আমরা আনুষ্ঠানিকভাবেও মন্ত্রণালয়কে জানাব। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট উচ্চপর্যায়ের ব্যক্তিদের সঙ্গেও যোগাযোগের চেষ্টা করছি। কারণ আয় না থাকলে হয়তো কিছুদিন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া সম্ভব হবে, কিন্তু অনেক কর্মচারীর আর্থিক অবস্থা অত্যন্ত শোচনীয়। তাই এখন থেকেই বিকল্প ব্যবস্থা নিয়ে ভাবতে হবে।”
ঢাকা কলেজের আয় ও ব্যয়ের হিসাব তুলে ধরে তিনি বলেন, “আমি দায়িত্বে থাকা অবস্থায় ইউজিসিতে চিঠি দিয়ে জানিয়েছি, আমাদের শিক্ষার্থী সংখ্যা কত, সেখান থেকে সম্ভাব্য আয় কত, কর্মচারী সংখ্যা কত এবং তাঁদের পেছনে ব্যয় কত হবে। সেই হিসাবে ঘাটতির বিষয়টিও জানিয়েছি। সাত কলেজ মিলিয়ে কর্মচারীদের বেতন বাবদ বছরে প্রায় ১০ থেকে ১১ কোটি টাকা প্রয়োজন হতে পারে।” তিনি আরও বলেন, “ঢাকা কলেজে শুধু কর্মচারীদের বেতন বাবদ মাসে প্রায় ১৮ লাখ টাকা প্রয়োজন হয়।”
সরকারের সিদ্ধান্ত ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় নেওয়া সম্ভব নয়
কর্মচারীদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় নেওয়ার বিষয়ে ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির উপাচার্য অধ্যাপক নুরুল ইসলাম বলেন, “কর্মচারীদের নিয়োগ দিয়েছেন কলেজ কর্তৃপক্ষ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি লোকবল নিয়োগ দেয়নি। কলেজ প্রশাসন আলাদা। তাঁদের সঙ্গে আমাদের শুধু প্রাতিষ্ঠানিক সম্পর্ক।”
তিনি বলেন, “আমি মনে করি, কলেজ অধ্যক্ষরা যেহেতু বিভিন্ন সময়ে তাঁদের নিয়োগ দিয়েছেন, তাই তাঁরা উদ্যোগ নিক। আমাদের কাছে যেহেতু লোকবল নেই, তাই আমাদের জায়গা থেকে যতটুকু পারা যায়, আমরা সহায়তা করব। সরকারকে তাঁদের বিষয়ে আমরাও বলব। কারণ তাঁরা তো বাংলাদেশেরই মানুষ। যাঁরা বেসরকারি পর্যায়ের কর্মচারী রয়েছেন, তাঁদের জন্য অবশ্যই আমাদের একটা ইতিবাচক চিন্তা থাকা উচিত।”
শিক্ষার্থী কমানোয় কর্মচারী তহবিল কমে যাচ্ছে—এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “এ ব্যাপারে আমার মন্তব্য নেই, কারণ শিক্ষার্থীদের কমানোয় এটা শুরু হয়েছে গত বছর থেকে। তখন তো আমি ভিসি ছিলাম না। আমি তো আর হুট করে এসে বাড়াতে পারি না। আর আমার জানতে হবে কেন তাঁরা কমিয়েছিলেন। সেই বিষয়গুলো জেনে আমরা যৌক্তিক একটা সিদ্ধান্তে যাব।”
কর্মচারীদের স্মারকলিপি প্রদান প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “কর্মচারী তো আমাকে দিতেই পারে। কিন্তু তাঁরা তো আমার সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটির অংশ নয়। তাঁরা দিতে পারে, আমরা সেটা নিয়ে সরকারকে জানিয়েছি, এদের ব্যাপারে কী করবেন। আমরা ইতিবাচকভাবে সাড়া করেছি। কিন্তু আমার বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় নিতে হলে সেটা সরকারকে সিদ্ধান্ত দিতে হবে, সরকারকে বলতে হবে এতগুলো কর্মচারী আপনাকে দিলাম, এদেরকে বরাদ্দ করেন। বিষয়টা এরকম, পদ সৃষ্টি করে করতে হবে। তাঁরা তো কলেজে নিয়োগ পেয়েছে। তাঁরা তো আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ পায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “শিক্ষকদের পদায়ন, বদলি ও যোগদানের বিষয়গুলো যেমন মন্ত্রণালয় দেখে, কর্মচারীদের বিষয়েও মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে সঠিক উত্তর পাওয়া যাবে। আমার ক্ষমতার মধ্যে থেকে যতটুকু করা সম্ভব, মানুষের জন্য আমরা তা করব।”
সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় কর্মচারীরা
একদিকে নতুন বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তোলার প্রক্রিয়া চলছে, অন্যদিকে দীর্ঘদিন ধরে সাত কলেজের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত বেসরকারি কর্মচারীরা অপেক্ষায় রয়েছেন নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তের। কলেজ প্রশাসন বিষয়টি মন্ত্রণালয় ও ইউজিসির কাছে তুলে ধরার কথা বলছে। আর বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বলছে, তাঁদের বিশ্ববিদ্যালয়ের আওতায় নিতে হলে সরকারের সিদ্ধান্ত ও প্রয়োজনীয় সাংগঠনিক কাঠামো প্রয়োজন। ফলে সাত কলেজের শত শত বেসরকারি কর্মচারীর চাকরি ও বেতন শেষ পর্যন্ত কী হবে, সেটিই এখন তাঁদের প্রধান প্রশ্ন।






