ঢাকা | বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

বিদেশের মাটিতে মতভিন্নতার নামে নিগ্রহ: এ কেমন প্রতিবাদ?

ইতালিতে বাংলাদেশের লাক্স-তারকা এবং জনপ্রিয় টেলিভিশন ও চলচ্চিত্র অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের সঙ্গে ‘জুলাই’ ইস্যুকে কেন্দ্র করে কিছু প্রবাসী বাংলাদেশির দুর্ব্যবহারের অভিযোগ এবং শারীরিকভাবে নাজেহাল করার যে ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। মতের অমিল থাকতে পারে, রাজনৈতিক অবস্থান ভিন্ন হতে পারে, এমনকি কারও কোনো বক্তব্য বা কর্মকাণ্ডের সঙ্গে দ্বিমতও থাকতে পারে; কিন্তু সেই মতভিন্নতার জবাব কখনোই গালিগালাজ, হেনস্তা কিংবা শারীরিক আক্রমণ হতে পারে না।

ঘটনাটিকে আরও বেদনাদায়ক করে তুলেছে, আজমেরী হক বাঁধনের সঙ্গে তাঁর ভাই ও পরিবারের সদস্যদের উপস্থিতির বিষয়টি। ভাইরাল হওয়া ভিডিওতে একটি ছোট শিশুর কান্নার শব্দও শোনা গেছে। একটি শিশুর সামনে তাঁর পরিবারের সদস্যদের এমন বিব্রতকর ও ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হওয়া নিঃসন্দেহে অত্যন্ত কষ্টদায়ক। শিশুটির কাছে ঘটনাটি যে আতঙ্কের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে, সেটিও আমাদের বিবেচনায় রাখা উচিত।

তবে এ ঘটনার সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক শুধু একজন শিল্পীর সঙ্গে দুর্ব্যবহার নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বিদেশের মাটিতে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি এবং ইতালিতে বসবাসরত বিপুলসংখ্যক প্রবাসী বাংলাদেশির স্বার্থ। কয়েকজন ব্যক্তির দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের দায় যেন পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজকে বহন করতে না হয়। বিদেশের মাটিতে কোনো বাংলাদেশি আইন ভঙ্গ বা জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিত করার মতো কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী তার পরিণতি ভোগ করতে হতে পারে। ফলে রাজনৈতিক বা মতাদর্শগত বিরোধকে কেন্দ্র করে এমন আচরণ শুধু ব্যক্তিগত পর্যায়েই ক্ষতিকর নয়, বৃহত্তর প্রবাসী সমাজের জন্যও বিব্রতকর ও ঝুঁকিপূর্ণ।

এখানে একটি মৌলিক বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন—গণআন্দোলন বা দেশের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কোনো আন্দোলনে শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী, শিক্ষক, ব্যবসায়ী, পেশাজীবী কিংবা সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের অংশগ্রহণের নজির রয়েছে।

বাংলাদেশের ২০২৪ সালের গণআন্দোলনও এর ব্যতিক্রম নয়। সেই আন্দোলনে ছাত্রসমাজের পাশাপাশি সমাজের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ কোনো না কোনোভাবে সম্পৃক্ত হয়েছিলেন। আজমেরী হক বাঁধনও সেই সময়ে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের প্রতি সংহতি প্রকাশ করেছিলেন এবং আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন—এটি তাঁর নিজস্ব নাগরিক ও মতপ্রকাশের অধিকার হিসেবে দেখাই যুক্তিসঙ্গত। কেউ তাঁর রাজনৈতিক বা সামাজিক অবস্থানের সঙ্গে একমত নাও হতে পারেন; কিন্তু সে কারণে তাঁকে অপমান, হেনস্তা বা শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করার অধিকার কারও নেই।

বরং গণআন্দোলন কেন সৃষ্টি হয়, সেটি বোঝার চেষ্টা করা জরুরি। সাধারণত যখন একটি রাষ্ট্রে মানুষের মধ্যে দীর্ঘদিনের ক্ষোভ, বঞ্চনা, বৈষম্য, দুর্নীতি, রাজনৈতিক নিপীড়ন, দ্রব্যমূল্যের চাপ, বেকারত্ব, নিরাপত্তাহীনতা কিংবা জবাবদিহিতার অভাব ক্রমাগত বাড়তে থাকে, তখন সেই ক্ষোভ একসময় সম্মিলিত প্রতিবাদে রূপ নিতে পারে। কখনো সেই প্রতিবাদ গণআন্দোলন, কখনো গণঅভ্যুত্থানের রূপ নেয়। ইতিহাসে এর অসংখ্য উদাহরণ রয়েছে।

একইভাবে, কোনো আন্দোলনের সঙ্গে কেউ একাত্মতা প্রকাশ করবেন, কেউ করবেন না—এটিও একটি স্বাভাবিক গণতান্ত্রিক বাস্তবতা। কিন্তু কারও রাজনৈতিক অবস্থান পছন্দ না হওয়াকে কেন্দ্র করে তাকে আক্রমণ করার সংস্কৃতি কোনো সুস্থ গণতান্ত্রিক সমাজে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

আজমেরী হক বাঁধন একজন শিল্পী। একজন শিল্পীরও একজন নাগরিক হিসেবে নিজের মত প্রকাশের অধিকার রয়েছে। তাঁর সেই মত কারও পছন্দ না হলে যুক্তি দিয়ে প্রতিবাদ করা যায়, সমালোচনা করা যায়, তাঁর বক্তব্যের বিরোধিতা করা যায়। কিন্তু বিদেশের মাটিতে গিয়ে তাঁকে হেনস্তা করা কিংবা শারীরিকভাবে নাজেহাল করার অভিযোগ কোনোভাবেই প্রতিবাদের গ্রহণযোগ্য ভাষা হতে পারে না।

আমাদের মনে রাখতে হবে—মতপ্রকাশের স্বাধীনতা যেমন একজনের অধিকার, তেমনি ভিন্নমত পোষণ করাও অন্য একজনের অধিকার। গণতন্ত্রের সৌন্দর্যই হলো মতের ভিন্নতা থাকা এবং সেই ভিন্নতাকে সহ্য করার সক্ষমতা অর্জন করা।

বিশেষ করে প্রবাসীদের ক্ষেত্রে দায়িত্ব আরও বেশি। বিদেশে একজন বাংলাদেশির আচরণ অনেক সময় শুধু তার নিজের পরিচয় বহন করে না; তার আচরণের মাধ্যমে বাংলাদেশ ও বাংলাদেশিদের সম্পর্কেও একটি ধারণা তৈরি হয়। তাই বিদেশের মাটিতে রাজনৈতিক মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে কোনো ধরনের সংঘাত, হেনস্তা বা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া শুধু ব্যক্তিগত বিচক্ষণতার অভাব নয়—এটি দেশের ভাবমূর্তির জন্যও ক্ষতিকর।

রাজনীতি নিয়ে আমাদের মতভেদ থাকতেই পারে। ২০২৪ সালের আন্দোলন নিয়ে আমাদের মূল্যায়নও এক নাও হতে পারে। কিন্তু সেই মতভেদ যেন কখনো মানবিকতা, শালীনতা ও আইনের সীমা অতিক্রম না করে। ইতালির মতো একটি দেশে বসবাসরত বাংলাদেশিদেরও মনে রাখতে হবে, সেখানে বাংলাদেশের আইন নয়, ইতালির আইনই প্রযোজ্য। তাই আবেগের বশবর্তী হয়ে এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়া উচিত নয়, যার নেতিবাচক প্রভাব ব্যক্তি ছাড়িয়ে পুরো প্রবাসী বাংলাদেশি সমাজের ওপর পড়তে পারে।

সবশেষে বলতে হয়—আজমেরী হক বাঁধন কোনো রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধি হিসেবে নয়, একজন নাগরিক ও শিল্পী হিসেবে একটি আন্দোলনের সঙ্গে সংহতি প্রকাশ করেছিলেন। তাঁর সেই অবস্থান কারও কাছে গ্রহণযোগ্য হতে পারে, কারও কাছে নাও হতে পারে। কিন্তু মতের অমিলের প্রতিক্রিয়া যদি হয় হেনস্তা ও শারীরিক আক্রমণ, তাহলে সেটি কোনোভাবেই গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা নয়।

বিদেশের মাটিতে আমরা যেন মতের পার্থক্যকে শত্রুতায়, প্রতিবাদকে প্রতিহিংসায় এবং রাজনৈতিক বিরোধকে ব্যক্তিগত আক্রমণে পরিণত না করি। কারণ কয়েকজনের উচ্ছৃঙ্খল আচরণের দায় যেন হাজারো প্রবাসী বাংলাদেশিকে বহন করতে না হয়।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক