ঢাকা | রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২২ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহরে নিরাপত্তাবেষ্টনী ভেঙে মোটরসাইকেল আরোহী: প্রশ্নের মুখে নিরাপত্তা ব্যবস্থা!

রাষ্ট্রের রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, মন্ত্রী কিংবা অন্য কোনো অতি গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির চলাচলের সময় নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। ব্যক্তির পদ যত গুরুত্বপূর্ণ, তাঁর নিরাপত্তার বিষয়টিও তত বেশি স্পর্শকাতর। এ কারণে বিশ্বের প্রায় সব দেশেই রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের চলাচলের সময় নির্দিষ্ট প্রটোকল, নিরাপত্তাবেষ্টনী এবং গোয়েন্দা নজরদারির ব্যবস্থা রাখা হয়।

অবশ্য এর ব্যতিক্রমও আছে। বিশ্বের কিছু উন্নত ও নিরাপদ দেশে রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানকে অনেকটা সাধারণ মানুষের মতো চলাফেরা করতে দেখা যায়। নেদারল্যান্ডসের সাবেক প্রধানমন্ত্রীকে যেমন নিয়মিত সাইকেলে করে অফিসে যাতায়াত করতে দেখা গেছে। কিন্তু বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় একজন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে এ ধরনের অবাধ চলাচল কতটা নিরাপদ—তা নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।

তারপরও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার যে চেষ্টা করছেন, তা নিঃসন্দেহে লক্ষণীয়। প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর চলাচলের সময় সাধারণ মানুষের দিকে হাত নেড়ে শুভেচ্ছা জানানো, কখনো সালাম বিনিময় করা কিংবা মানুষের সঙ্গে সংক্ষিপ্ত কথোপকথনের চেষ্টা—এসবের মধ্য দিয়ে একজন সরকারপ্রধানের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমানোর একটি ইতিবাচক বার্তা পাওয়া যায়।

কিন্তু এখানেই নিরাপত্তার বিষয়টি নতুন করে সামনে আসে।

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর গাড়িবহর চলাচলের সময় একজন হেলমেট পরিহিত মোটরসাইকেল আরোহীকে নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির অত্যন্ত কাছাকাছি চলে যেতে দেখা গেছে। পরে নিরাপত্তাকর্মীরা তাকে সেখান থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ওই ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। প্রাথমিকভাবে তিনি দাবি করেছেন, প্রধানমন্ত্রীকে একনজর দেখার উদ্দেশ্যেই তিনি গাড়িবহরের কাছে গিয়েছিলেন।

বিষয়টি সত্যিই যদি শুধু প্রধানমন্ত্রীকে কাছ থেকে দেখার আগ্রহ হয়ে থাকে, তাহলেও ঘটনাটি নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন সাধারণ মোটরসাইকেল আরোহী কীভাবে একাধিক স্তরের নিরাপত্তাবেষ্টনী অতিক্রম করে প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির এত কাছে পৌঁছে গেলেন—এটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন।

এখানেই মূলত নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতার সম্ভাবনাটি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন। একজন ব্যক্তি যদি কোনো ধরনের বাধা ছাড়াই প্রধানমন্ত্রীর গাড়ির কাছাকাছি পৌঁছে যেতে পারেন, তাহলে একই পরিস্থিতিতে অন্য কেউ আরও ভয়ংকর উদ্দেশ্য নিয়ে এগিয়ে এলে কী ঘটতে পারত—এই প্রশ্নটি উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

অবশ্যই ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা সন্দেহকে তদন্তের আগে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে ধরে নেওয়া উচিত নয়। তিনি কী উদ্দেশ্যে সেখানে গিয়েছিলেন, তাঁর পরিচয় কী, তাঁর সঙ্গে কারও যোগাযোগ ছিল কি না কিংবা ঘটনাটি নিছক আবেগের বহিঃপ্রকাশ ছিল কি না—এসব বিষয় যথাযথ তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া সম্ভব। প্রয়োজন হলে তাঁর পরিচয়, গতিবিধি এবং ঘটনার প্রেক্ষাপট যাচাই করা যেতে পারে। তবে একই সঙ্গে তদন্তের স্বার্থে তাঁর সঙ্গে মানবিক ও আইনসম্মত আচরণ নিশ্চিত করাও জরুরি।

এখানে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। প্রধানমন্ত্রী নিজেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে দূরত্ব কমানোর চেষ্টা করছেন। ফলে মানুষের মধ্যে তাঁকে কাছ থেকে দেখার কিংবা শুভেচ্ছা জানানোর আগ্রহ তৈরি হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু এই ইতিবাচক রাজনৈতিক ও সামাজিক যোগাযোগ যেন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার জন্য কোনো ঝুঁকি তৈরি না করে, সেটিও নিশ্চিত করতে হবে।

সুতরাং ঘটনাটিকে শুধু একজন মোটরসাইকেল আরোহীর প্রটোকল ভঙ্গ হিসেবে দেখলে বিষয়টির মূল গুরুত্বটি হয়তো আড়ালে থেকে যাবে। বরং এটি প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তাব্যবস্থার কার্যকারিতা মূল্যায়নের একটি সুযোগ হিসেবেও দেখা উচিত।

তদন্তের আওতায় যেমন ওই মোটরসাইকেল আরোহীর উদ্দেশ্য ও গতিবিধি খতিয়ে দেখা প্রয়োজন, তেমনি তাঁর এত কাছে পৌঁছে যাওয়ার ক্ষেত্রে নিরাপত্তাব্যবস্থার কোথাও কোনো ঘাটতি ছিল কি না, সেটিও নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা দরকার। কোন স্তরে নিরাপত্তাবেষ্টনী দুর্বল ছিল, দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো ঘাটতি ছিল কি না এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনা প্রতিরোধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজে বের করা জরুরি।

প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্তার মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে কাউকে আগেভাগে দায়ী করা যেমন ঠিক নয়, তেমনি কাউকেই তদন্তের ঊর্ধ্বে রাখা উচিত নয়। নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা যদি কোনো ভুল বা দায়িত্বে অবহেলা করে থাকেন, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তে উঠে আসা প্রয়োজন।

সবশেষে কথা একটাই—একজন প্রধানমন্ত্রী শুধু একটি রাজনৈতিক দলের নেতা নন; তিনি রাষ্ট্রের সরকারপ্রধান। তাঁর নিরাপত্তার সঙ্গে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার বিষয়টি ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তাই প্রধানমন্ত্রীর সাধারণ মানুষের কাছাকাছি থাকার উদ্যোগ অবশ্যই অব্যাহত থাকুক, কিন্তু সেই উন্মুক্ততার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখেই নিরাপত্তাব্যবস্থাকে হতে হবে আরও আধুনিক, পেশাদার, সমন্বিত ও নিশ্ছিদ্র। কোনো একটি ঘটনার পর আতঙ্কিত হওয়ার চেয়ে বরং ঘটনা থেকে শিক্ষা নিয়ে ভবিষ্যতের নিরাপত্তাব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করাই হবে দায়িত্বশীল রাষ্ট্রের কাজ।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক