ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত ও প্রশস্তকরণের কথা বলছিলাম। সে প্রসঙ্গে একটু পরেই আসছি। তার আগে এই লেখার প্রেক্ষাপটটা একটু বলে নেওয়া প্রয়োজন।
আমার গ্রামের বাড়ি হবিগঞ্জ জেলার মাধবপুর উপজেলার ঐতিহাসিক তেলিয়াপাড়ায়—যে তেলিয়াপাড়া আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। কর্মের তাগিদে বাড়ি থেকে বের হয়েছিলাম প্রায় ৩৫ বছর আগে। মা-বাবা বেঁচে থাকতে বাড়িতে যাওয়া-আসাটা ছিল নিয়মিত। কিন্তু ১৯৯৬ সালে হঠাৎ করেই বাবা চলে গেলেন। এরপর ২০১৫ সালে মা-ও চলে গেলেন না-ফেরার দেশে। করোনাকালে বড় ভাইকেও হারালাম। একে একে আপনজনদের হারানোর পর কেন জানি গ্রামের বাড়ির প্রতি টানটাও অনেকটাই কমে গেল।
এরই মধ্যে নিজের বয়সও বাড়ছে, আর চাকরি থেকে অবসরের সময়ও ধীরে ধীরে ঘনিয়ে আসছে। তাই গত কয়েক বছর ধরে মনে মনে একটা পরিকল্পনা করছিলাম—বাবার ভিটায় যদি একটা ছোট্ট মাথা গোঁজার ঠাঁই করা যায়! যদি আল্লাহ হায়াত দেন, তাহলে অবসর জীবনের কিছুটা সময় গ্রামের বাড়িতে কাটাব। শহরের ব্যস্ততা থেকে দূরে, নিজের শেকড়ের কাছে ফিরে গিয়ে একটু শান্তিতে বাঁচার চেষ্টা করব।
আমার স্ত্রীর আবার গাছপালা ও বাগান করার ভীষণ শখ। ঢাকার আশপাশে জমি কিনে বাগানবাড়ি করার মতো আর্থিক সামর্থ্য আমাদের নেই। তাই ভাবলাম, নিজের বাবার ভিটাতেই না হয় সেই স্বপ্নটা পূরণ করি। কিন্তু সময়, অর্থ—কোনোটার হিসাবই যেন মিলছিল না।
শেষ পর্যন্ত আল্লাহর ওপর পূর্ণ ভরসা রেখে অফিস ও বিভিন্ন জায়গা থেকে কিছু ঋণ নিয়ে, নিজের জমানো সামান্য কিছু অর্থ আর বুকভরা সাহস সম্বল করে দেড় বছরেরও কিছু বেশি সময় আগে বাড়ির কাজ শুরু করে দিলাম। আলহামদুলিল্লাহ, এখন বাড়ির কাজ প্রায় শেষের দিকে। চলছে শেষ মুহূর্তের ফিনিশিংয়ের কাজ।
কিন্তু এই দেড় বছরেরও বেশি সময়ে বাড়ির কাজ দেখভালের জন্য প্রায় প্রতি সপ্তাহেই ঢাকা থেকে তেলিয়াপাড়া ছুটতে হয়েছে। এমন কোনো সপ্তাহ নেই, যে সপ্তাহে বাড়ি যাওয়া হয়নি। কাজ দেখাশোনার মতো নির্ভরযোগ্য কেউ না থাকায় কষ্ট হলেও সবকিছু নিজেকেই সামলাতে হয়েছে। আর এই যাতায়াতের পুরো অভিজ্ঞতাটা আমার শরীরের ওপর দিয়ে যে কী ভয়াবহ ঝড় বইয়ে দিয়েছে, তা আমার আপনজন ও সহকর্মীরাই ভালো বলতে পারবেন।
ঢাকা থেকে বাড়ি যেতে কখনো তিন ঘণ্টা, আবার কখনো সেই একই পথ পাড়ি দিতে দশ-বারো ঘণ্টাও লেগেছে। কখনো এমনও হয়েছে, দীর্ঘ যানজটে আটকে থেকে বাড়ি পৌঁছাতে পারিনি। রাস্তার বেহাল দশা, নির্মাণকাজের ধীরগতি, খানাখন্দ, যানজট—সব মিলিয়ে ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে যাতায়াত অনেক সময়ই এক ধরনের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়েছে।

এবার আসি মূল কথায়—ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক ছয় লেনে উন্নীত ও প্রশস্তকরণের কাজ।
প্রায় ২৫০-৩০০ কিলোমিটার একটি মহাসড়ক প্রশস্তকরণের কাজে বছরের পর বছর লেগে যাওয়ার উদাহরণ পৃথিবীর আর কোনো দেশে আছে কি না, আমি জানি না। অথচ আমাদের দেশে বছরের পর বছর ধরে এই কাজ চলছেই। এত বছর পার হয়ে যাওয়ার পরও পুরো প্রকল্পের অর্ধেক কাজও যদি শেষ না হয়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—এত দীর্ঘসূত্রতার কারণ কী?
সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয়, কোথাও কোথাও এখনো নাকি জমি অধিগ্রহণ বা বরাদ্দের কাজই পুরোপুরি শেষ হয়নি। অর্থাৎ উন্নয়নের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে, প্রকল্প নেওয়া হয়েছে, অর্থ বরাদ্দ হয়েছে—কিন্তু বাস্তবায়নের মৌলিক প্রস্তুতিই যদি বছরের পর বছর ধরে শেষ না হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন আসলে কার জন্য?
আমি যখন এই লেখাটি লিখছি, তখনও অনিশ্চিত এক যানজটে আটকে আছি। সামনে কতদূর যেতে পারব, কখন বাড়ি পৌঁছাব—তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। চারপাশে শুধু গাড়ির দীর্ঘ সারি আর মানুষের অসহায় অপেক্ষা।
সত্যি বলতে কী, মাঝে মাঝে মনে হয়—এই দেশটার প্রতি কি আমাদের কারও কোনো মায়া আছে? দেশের প্রতি দায়িত্ববোধ আছে? জবাবদিহিতার কোনো জায়গা আছে?
সবাই যেন যার যার স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত। এমন একটা পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে যে, ঘুষ ছাড়া কোনো কাজই যেন এগোতে চায় না। চাঁদাবাজি আর টেন্ডারবাজি তো অনেকের কাছে এখন প্রায় মামুলি বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অন্যদিকে, একজন ঠিকাদার যখন বাস্তবে কাজ করতে যান, তখন তাকেও নানা ধরনের চাপ ও প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়। একদিকে চাঁদাবাজি, অন্যদিকে প্রশাসনিক জটিলতা। যে প্রশাসনের কাজ হওয়া উচিত চলমান উন্নয়ন কাজকে সহজ করা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেওয়া এবং কাজের গতি বাড়ানো, অনেক সময় সেই প্রশাসনিক জটিলতাই হয়ে দাঁড়ায় কাজের অন্যতম প্রধান বাধা।
চতুর্দিকে চাঁদা, ঘুষ, অনিয়ম আর নানা ধরনের অদৃশ্য খরচের বোঝা শেষ পর্যন্ত গিয়ে পড়ে প্রকল্পের ওপর। আর এর মাশুল দিতে হয় সাধারণ মানুষকে। অনেক ক্ষেত্রে ঠিকাদারও বাধ্য হন খরচ কমাতে, যার সরাসরি প্রভাব পড়ে কাজের মানের ওপর। ফলে একটি রাস্তা তৈরি হতে না হতেই কিছুদিন পর আবার সেটি ভাঙতে শুরু করে। নতুন করে সংস্কার, নতুন করে বরাদ্দ, নতুন করে টেন্ডার—চক্রটি চলতেই থাকে।
এভাবেই উন্নয়নের নামে আমরা বছরের পর বছর বিড়ম্বনা আর দুর্ভোগের মধ্যে বসবাস করছি। এ তো শুধু ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের কথা বললাম। বাস্তবতা হলো, দেশের আরও অনেক উন্নয়ন প্রকল্পের চিত্র কমবেশি একই রকম। প্রকল্প নেওয়া হয়, সময় বাড়ে, ব্যয় বাড়ে, মেয়াদ বাড়ে—কিন্তু সাধারণ মানুষের দুর্ভোগ কমে না।
স্বাধীনতার ৫৫ বছর পার হয়ে গেছে। এই দীর্ঘ সময়ে আমরা অনেক কিছু অর্জন করেছি, অনেক অবকাঠামো নির্মাণ করেছি, অনেক উন্নয়নের গল্প শুনিয়েছি। কিন্তু প্রশ্ন হলো—আমরা কি সত্যিই সেই কাঙ্ক্ষিত জায়গায় পৌঁছাতে পেরেছি? আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন কতটা হয়েছে? দায়িত্ববোধ, সততা, জবাবদিহিতা ও দেশপ্রেম কি সত্যিই আমাদের কর্মকাণ্ডে প্রতিফলিত হচ্ছে?
শুধু বড় বড় প্রকল্প গ্রহণ করলেই উন্নয়ন হয় না। উন্নয়ন তখনই অর্থবহ হয়, যখন সেই উন্নয়নের সুফল সাধারণ মানুষের জীবনকে সহজ করে, তাদের সময় ও অর্থের সাশ্রয় করে এবং তাদের দুর্ভোগ কমায়।
আমরা উন্নয়ন চাই, অবশ্যই চাই। কিন্তু এমন উন্নয়ন চাই না, যার নামে বছরের পর বছর মানুষের দুর্ভোগ বাড়বে। আমরা এমন উন্নয়ন চাই, যেখানে পরিকল্পনা থাকবে, সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হবে, অর্থের সঠিক ব্যবহার হবে, কাজের মান নিশ্চিত হবে এবং সর্বোপরি—জবাবদিহিতা থাকবে।
নইলে উন্নয়নের নামে এই বিড়ম্বনা চলতেই থাকবে। আর সাধারণ মানুষ শুধু প্রশ্ন করেই যাবে—এই উন্নয়ন কার জন্য?
লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক







