ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

স্বাধীনতাকে অর্থবহ করতে বদলাতে হবে নিজেদের

অতি ক্ষুদ্র দেশগুলোকে বড় শক্তিধর দেশগুলো গিনিপিগ হিসেবে গণ্য করে। তাই শক্তিধর দেশগুলো তাদের যত এক্সপেরিমেন্ট আছে সব এক্সপেরিমেন্ট এই সব ছোট ছোট দেশগুলোর উপর দিয়ে চালায়। তবে এআই-এর মতো এটা নতুন কোনো উদ্ভাবন নয়, বরং সৃষ্টিলগ্নের প্রাক্কাল থেকেই এমনটা হয়ে আসছে। দুর্ভাগ্যবশতই হোক আর সৌভাগ্যবশতই হোক, সে দিক বিবেচনায় আমরাও পড়েছি গিনিপিগের কাতারে। সত্যিকার অর্থে এসব মেনে নেওয়া ছাড়া কিছু করারও নেই। তবে পৃথিবীতে অনেক দেশ আছে যেগুলো হয়তোবা আয়তনে ছোট, তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাও হয়তোবা তেমন একটা ভালো নেই—তারপরও সে সব দেশগুলো শক্তিধর দেশগুলোকে তেমন একটা পাত্তা দেয় না। তাতে হয়তো তাদের কিছুটা সমস্যা হয়, তারপরও তারা মাথা নিচু করার মতো পাত্র নয়। কারণ তাদের বড় শক্তি হলো তাদের মনোবল, নৈতিকতা, জবাবদিহিতা ও দেশের প্রতি ভালোবাসা।

৭১-এর মুক্তিযুদ্ধের পর, মানে দেশ স্বাধীন হওয়ার পর এ দেশের মানুষও ভেবেছিল দেশটা হয়তোবা পাকিস্তানি হানাদার আর বর্বরদের কবল থেকে মুক্তি পেয়ে স্বাধীন হয়ে গেছে। কিন্তু স্বাধীনতার ৫৫ বছর পর এসে মনে হচ্ছে, এটা তো কোনোভাবেই সত্যিকারের স্বাধীন দেশ হতে পারে না। স্বাধীনতার মানে কি শুধু একটা দেশের কবল থেকে মুক্তি পাওয়া? স্বাধীনতার মানে কি আগে যেমনটা চলেছে, দেশ এখনো তেমনটাই চলবে? স্বাধীনতার মানে কি শুধু অরক্ষিতই হোক আর সুরক্ষিতই হোক একটা সীমারেখা থাকলেই চলবে? স্বাধীনতার মানে কি শুধু নিজেদের একটা পতাকা হলেই চলবে? যা যা বললাম এসবের কোনোটিই পুরোপুরি স্বাধীনতার মানে হতে পারে না, যতক্ষণ না পর্যন্ত বাকস্বাধীনতা নিশ্চিত করা যাবে। তবে বাকস্বাধীনতা বলতে আবার সে স্বাধীনতাকে বোঝায় না, যে স্বাধীনতার গরমে মন যা চায় তা-ই বকে যাব—সেটা অন্য মানুষের সহ্য হোক আর না হোক। বাকস্বাধীনতা হলো এমন একটা স্বাধীনতা যেখানে মানুষ মন যা চায় তা-ই বলবে, কিন্তু সে বলাগুলো হতে হবে সৃজনশীল, দেশের স্বার্থে, জনমানুষের স্বার্থে। তবে আমি মনে করি স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় মানেটা হলো নিজেদের চরিত্র বদলানো। বর্বরদের অধীনে থাকাকালীন চরিত্র যেমন ছিল, বর্বরমুক্ত হওয়ার পরও যদি নিজেদের চরিত্র তার চেয়ে বেশি খারাপ হয়ে যায় তাহলে সেটাকে কি বলব? তাই নিজেদের চরিত্রটা আগে বদলাতে হবে।

স্বাধীনতার ৫৫ বছর পরও দেশটা এমন হযবরল অবস্থার মধ্যে থাকবে কেন? আক্ষরিক অর্থে দেশের আমূল পরিবর্তন ঘটবে না কেন? দেশের আর জনমানুষের স্বার্থের চেয়ে নিজেদের স্বার্থকে বড় করে দেখব কেন? রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতে পারে, থাকবেও; তাই বলে অন্যদের মতকে পদদলিত করব কেন? ৭১-এ যে যুদ্ধ শুরু হয়েছিল দেশটাকে বর্বরমুক্ত করে সবার জন্য বাসযোগ্য একটা দেশ গড়ে তুলব বলে, সেখান থেকে আমরা সরে আসলাম কেন? এমন তো কথা ছিল না যে, নিজের দেশের অর্থ বিদেশে পাচার করে দেশটাকে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মধ্যে ঠেলে দেব? এমন কি কথা ছিল দেশ স্বাধীন হলে মুক্তিযোদ্ধারা অনাদর, অবহেলা, অর্থকষ্ট ও বিনা চিকিৎসায় দিনাতিপাত করবে? এমন কি কথা ছিল দেশ স্বাধীন হলে মুক্তিযোদ্ধারা ভিক্ষা করবে, রিকশা চালাবে, না খেয়ে থাকবে, একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই থাকবে না তাদের? অনেক মুক্তিযোদ্ধা হয়তো ভালো আছেন। তবে মুক্তিযুদ্ধের সময় তাদের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন আছে সাধারণ মানুষের মনে। আবার দেশের প্রেক্ষাপট বদলের সাথে সাথে রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতায় অনেক রাজাকারও মুক্তিযোদ্ধা বনে গেছে আজকাল।

একটা মানুষ নিজের দেশকে কতটুকু ভালোবাসে সেটা বুঝতে হলে বড় কোনো ডিগ্রি নেওয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা অনেক সময় মনে করি আমি যে মিথ্যে বলছি সেটা মানুষ বোঝে না, আমি যে চুরি করছি সেটা মানুষ দেখে না, আমি যে অপকর্ম করছি সেটা মানুষের বোধগম্য হবে না। সাধারণ মানুষ সবই বোঝে, সবই দেখে; শুধু তাদের কিছু করার ক্ষমতা নেই মেনে নেওয়া ছাড়া।

আমরা কিন্তু ইচ্ছে করলে এখনো দেশটাকে মনের মতো করে গড়ে তুলতে পারি। কী নেই আমাদের? আমাদের সবচেয়ে বড় সম্পদ দেশের ২০ কোটি মানুষ। যে দেশের মানুষ অন্য দেশ গঠনে ভূমিকা রাখে, সে মানুষগুলো তো নিজের দেশ গঠনেও ভূমিকা রাখতে পারে—যদি সে সুযোগ তারা পায়। আর কী নেই এ দেশে? এত প্রাকৃতিক সম্পদ অনেক বড় বড় দেশেরও নেই। আমাদের বড় ব্যর্থতা হলো আমরা আমাদের নিজেদের সম্পদের সঠিক ব্যবহার করতে অক্ষম। কারণ আমরা পরনির্ভরশীলতায় বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। নিজেদের বদলাতে হলে, মাথা উঁচু করে পৃথিবীকে জানান দিতে হলে পরনির্ভরশীলতা কমাতে হবে। নীতি-নৈতিকতায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। নিজের চেয়ে দেশের স্বার্থকে আগে প্রাধান্য দিতে হবে। দলমত-নির্বিশেষে সবাই মিলে দেশটাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে। চলুন সবাই মিলে নিজের স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে দেশের স্বার্থটাকে আগে প্রাধান্য দিই। চলুন আমরা এমন একটা সুন্দর বাসযোগ্য দেশ গড়ে তুলি যেখানে থাকবে না কোনো হিংসা-নিন্দা, মারামারি, কাটাকাটি, দাঙ্গাহাঙ্গামা, চুরি-ডাকাতি, রাহাজানি। যেখানে আমাদের আগামী প্রজন্ম সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারবে আর আমাদের জন্য খোদার কাছে হাত তুলে প্রার্থনা করবে তাদের জন্য সুন্দর একটা বাসযোগ্য দেশ রেখে যাওয়ার জন্য।

মো. কাওছার আলম চৌধুরী: কবি ও লেখক