ঢাকা | শুক্রবার, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৩ আশ্বিন ১৪৩৩

সাগর-রুনি হত্যাকাণ্ড: স্রেফ জোড়া খুন নাকি গভীর ষড়যন্ত্র?

সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনি হত্যা মামলার মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে এক চাঞ্চল্যকর তথ্য। অন্য মামলার কল রেকর্ড বিশ্লেষণে এই হত্যাকাণ্ডে এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের সংযোগ মিলেছে। প্রত্যক্ষদর্শীর ভাষ্যমতে, হত্যাকাণ্ডের দিন ওই ব্যক্তি ফ্ল্যাটে প্রবেশ করে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি সরিয়ে নেন, যা পরে র‍্যাব সদর দপ্তরে পৌঁছায়। ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি অপরিচিত ডিএনএর রহস্য এবং নথি চুরির এই ঘটনায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি স্রেফ জোড়া খুন, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর ষড়যন্ত্র?

২০১২ এর ১১ ফেব্রুয়ারি। পুরো দেশকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল সাংবাদিক দম্পতি সাগর সারোয়ার ও মেহেরুন রুনীর হত্যাকাণ্ড। এক দশক পার হলেও মেলেনি বিচার। তবে ১৪ বছর পর এই হত্যার সমীকরণে যোগ হয়েছে নতুন মোড়।

তদন্তের দীর্ঘ ঝুলন্ত পথ, ১২৯ বারেরও বেশি সময় পেছানো প্রতিবেদন। এতদিন যা ছিল স্রেফ এক অজানা রহস্য, তা এবার নতুন বাঁক নিলো এক চাঞ্চল্যকর তথ্যে। হত্যার ঘটনা নাকি আগেই জানা ছিল আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর? এমনকি হত্যার পর পরই সেখান থেকে গায়েব করা হয়েছিল গুরুত্বপূর্ণ সব নথি!

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা জানান, অন্য একটি মামলার কল রেকর্ড যাচাইয়ের সময় সাগর-রুনী হত্যায় এক সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বের যোগসূত্র পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দিতে জানা যায়, ঘটনার দিন ওই সাংস্কৃতিক কর্মী সাধারণ দর্শনার্থীর মতো ফ্ল্যাটে ঢুকেছিলেন এবং সেখান থেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু নথি সরিয়ে নেন। পরবর্তীতে সেই নথি সরাসরি র‍্যাব সদর দপ্তরে গিয়ে পৌঁছায়।

তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, ‘এটাতে স্টেট স্পন্সরড, অর্থাৎ রাষ্ট্রপক্ষ জানত। বিশেষ করে র‍্যাব ইন্টেল জানত এরকম একটা মার্ডার হতে যাচ্ছে। মার্ডারের খুব ইমিডিয়েট পরে ওনার বাসায় যেতে হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু ডিস্ক উনি তখন সরাসরি র‍্যাবের গোয়েন্দা প্রধানের কাছে উনি বহন করেছেন, বহন করে সেটা উনি ওখানে প্রদান করে এসেছেন।’

ঘটনাস্থল থেকে উদ্ধার হওয়া দুটি ডিএনএর ব্যক্তির পরিচয় এখনও না মেলায় এবং প্রাতিষ্ঠানিক সত্য গোপনের ইঙ্গিত পাওয়ায় প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি জোড়া খুন, নাকি এর পেছনে রয়েছে গভীর রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক ষড়যন্ত্র? প্রত্যক্ষদর্শীর এই বয়ান হয়তো উন্মোচন করতে পারে সাগর-রুনী খুনের মূল হোতাদের আসল চেহারা।

তিনি বলেন, ‘নিছক চুরি আসলে দুটি ল্যাপটপ এবং একটি মোবাইল খোয়া, শুধু রুনির ফোনটা এখানে থাকা এটি নিছক চুরির কোনো ঘটনা ঘটতেই পারে না, বলে আমরা মনে করি। এটা একটা পূর্বপরিকল্পিত। এটা আসলে হঠাৎ করে কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। দুটি ডিএনএ পাওয়া গিয়েছে, যে ডিএনএ অ্যাকচুয়ালি এখনো আনআইডেন্টিফাইড। তারা দেশি না বিদেশি, সেটাও আসলে খতিয়ে দেখা দরকার।’

পরিবারের দাবি ঘটনা যেমনই হোকনা কেন, প্রকৃত সত্য যেন দেশবাসীকে জানানো হয়। তারা বলছেন, সবাই সত্য জানলেই কেবল এই দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটবে।

মেহেরুন রুনির ভাই নওশের রোমান বলেন, ‘আমরা তো শুনেছি এবং তারা অনেক কনফিডেন্ট, যারা এটা পেয়েছেন। দেখা যাক তারা আসলে ফাইনালি এটা কতটুক প্রমাণ হাজির করতে পারে। যেই জড়িত থাক, সুষ্ঠু এবং সঠিক তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত যারা খুনী, তাদের বিচারে আওতায় আনা হোক।’

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল ফরেনসিক প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহারের মাধ্যমে ক্লু-লেস মামলার রহস্য উদঘাটন এবং অপরাধীদের শনাক্ত করা সম্ভব।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অপরাধবিজ্ঞান বিভাগের চেয়ারম্যান রেজাউল করিম সোহাগ বলেন, ‘ফরেনসিক অনেক কিছু আমরা আসলে নিয়ে আসছি। আসলে এগুলো ভ্যালিড কি না বা ফরেনসিক যে মেথডসগুলো অ্যাপ্লাই করতে হয় একটা মামলা ডিসমিশ করার ক্ষেত্রে বা মামলার শেষ পর্যন্ত ডেস্টিনেশনে পৌঁছার ক্ষেত্রে, যদি কোনো কনফিউশন চলে আসে, সে কনফিউশনগুলো অ্যাড্রেস করাও কিন্তু একটা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।’

অন্যায়ের বিরুদ্ধে সোচ্চার সাংবাদিকরাই আজ বিচারহীনতার প্রতীকে পরিণত হয়েছেন। নিরপেক্ষ তদন্ত সাপেক্ষে প্রত্যক্ষদর্শীর তথ্য কিংবা ফাইল চুরির অভিযোগ এবং র‍্যাবের ভূমিকা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলো পুরো মামলার গতিপথ বদলে দিতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত এই বিস্ফোরক তথ্য কি মামলার জট খুলবে, নাকি এটিও আইনি জটিলতা ও রহস্যের অতল গহ্বরে হারিয়ে যাবে—সেই উত্তরই এখন সময়ের হাতে।

খবর এখন টিভি