ঢাকা | শনিবার, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,১১ আশ্বিন ১৪৩৩

রাজনৈতিক কর্মীর জীবনও হোক সুন্দর

রাজনীতি মানুষের জন্য। রাজনীতির কেন্দ্রে মানুষ। তাহলে রাজনৈতিক কর্মী কি সেই মানুষের বাইরে? প্রশ্নটি সরল। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ। একজন তরুণ দিনের পর দিন দলের কর্মসূচিতে অংশ নেন। মিছিল করেন। সভায় যান। পোস্টার লাগান। মানুষের কাছে যান। ঝুঁকি নেন। সময় দেন। অনেক ক্ষেত্রে অর্থও ব্যয় করেন। কিন্তু দিন শেষে তাঁর নিজের জীবনের হিসাব কী? তাঁর কি চাকরি দরকার নেই? তাঁর কি ব্যবসা করার প্রয়োজন নেই? তাঁর কি দক্ষতা অর্জনের সুযোগ দরকার নেই? তাঁর কি পরিবার চালাতে সম্মানজনক আয় প্রয়োজন নেই? অবশ্যই আছে। কর্মীও মানুষ। তাঁরও ক্ষুধা আছে। তাঁরও পরিবার আছে। তাঁরও স্বপ্ন আছে। তাঁরও ভবিষ্যৎ আছে। এই বাস্তবতাকে রাজনীতির আলোচনার বাইরে রাখা যায় না।

বাংলাদেশের শ্রমবাজারের সামগ্রিক চিত্রও খুব স্বস্তিদায়ক নয়। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, দেশে শ্রমশক্তি প্রায় ৭ কোটি ১০ লাখ। শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণের হার ৪৯.৫ শতাংশ। যুব বেকারত্বের হার ১৬.৮ শতাংশ। তরুণীদের ক্ষেত্রে তা ২২.৭ শতাংশ। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, তরুণদের ৩০.৯ শতাংশ কর্মসংস্থান, শিক্ষা বা প্রশিক্ষণের বাইরে। তরুণীদের ক্ষেত্রে এই হার ৪৯.৩ শতাংশ। এগুলো শুধু পরিসংখ্যান নয়। এগুলো অসংখ্য পরিবারের বাস্তবতা। বিশ্বব্যাংকও বলছে, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ তরুণ শ্রমবাজারে প্রবেশ করে। কিন্তু তাদের সবার জন্য পর্যাপ্ত মানসম্মত কাজ তৈরি হচ্ছে না। অন্যদিকে দেশের কর্মসংস্থানের বড় অংশ অনানুষ্ঠানিক খাতে। বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, মোট কর্মসংস্থানের ৮৫ শতাংশ পর্যন্ত অনানুষ্ঠানিক খাতে। এই খাতে উৎপাদনশীলতা ও মজুরি তুলনামূলক কম। এই বাস্তবতায় রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশ্নটি আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ রাজনৈতিক সংগঠনগুলোর বড় শক্তি তরুণেরা। তাঁদের সময় আছে। উদ্যম আছে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ আছে। সাংগঠনিক দক্ষতা আছে। সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা আছে। এই শক্তিকে শুধু মিছিলের সংখ্যা বাড়ানোর কাজে ব্যবহার করা হলে তা অপচয়। একজন রাজনৈতিক কর্মীর মধ্যে নেতৃত্বের গুণ থাকতে পারে। সংগঠনের দক্ষতা থাকতে পারে। মানুষের সঙ্গে যোগাযোগের সক্ষমতা থাকতে পারে। ডিজিটাল প্রযুক্তি ব্যবহারের দক্ষতা থাকতে পারে। ব্যবসার আগ্রহ থাকতে পারে। তাঁকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হলে তিনি উদ্যোক্তা হতে পারেন। কারিগরি শিক্ষা পেলে দক্ষ কর্মী হতে পারেন। ডিজিটাল দক্ষতা অর্জন করলে ফ্রিল্যান্সিং বা অনলাইন ব্যবসায় যেতে পারেন। কৃষি প্রশিক্ষণ পেলে আধুনিক কৃষি উদ্যোক্তা হতে পারেন। অর্থাৎ রাজনৈতিক কর্মীকে শুধু কর্মসূচির অংশগ্রহণকারী হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। তাঁকে উৎপাদনশীল নাগরিক হিসেবেও দেখতে হবে।

এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার হওয়া জরুরি। রাজনৈতিক পরিচয়ের কারণে সরকারি চাকরি বা রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। চাকরি হতে হবে যোগ্যতার ভিত্তিতে। সরকারি সহায়তা হতে হবে স্বচ্ছ নীতির ভিত্তিতে। রাজনৈতিক পরিচয় যেন নিয়োগ বা সুবিধা পাওয়ার বিশেষ পাসপোর্ট না হয়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে রাজনৈতিক কর্মীদের জীবিকা নিয়ে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো ভাববে না। বরং সংগঠনগুলোর নিজস্ব উদ্যোগে দক্ষতা উন্নয়ন, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং, উদ্যোক্তা প্রশিক্ষণ, ক্ষুদ্র ব্যবসা ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি শিক্ষা এবং বৈধ কর্মসংস্থানের তথ্য দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে। এতে কারও প্রতি অবিচার হবে না। বরং তরুণদের উৎপাদনশীল কাজে যুক্ত করা যাবে। বিশ্বব্যাংকের একটি কর্মসূচির অভিজ্ঞতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ। তাদের সহায়তায় পরিচালিত RAISE কর্মসূচিতে ১৭ হাজারের বেশি তরুণ চাকরিমুখী প্রশিক্ষণ ও শিক্ষানবিশি শেষ করেছেন। তাঁদের প্রায় ৯০ শতাংশ পরবর্তীতে চাকরি পেয়েছেন অথবা ক্ষুদ্র উদ্যোগ পরিচালনা করছেন। একই কর্মসূচিতে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাকে ব্যবসা উন্নয়নে সহায়তা দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ, পরামর্শ, শিক্ষানবিশি এবং অর্থায়নের সুযোগ একসঙ্গে দেওয়া হলে তরুণদের কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করা সম্ভব।

এখানেই রাজনীতির জন্য একটি বড় শিক্ষা আছে। তরুণদের শুধু বলা যাবে না- ‘অপেক্ষা করো।’ আজ মিছিল করো। কাল সভা করো। পরশু পোস্টার লাগাও। তারপর আবার পরবর্তী কর্মসূচির জন্য অপেক্ষা করো। এভাবে বছরের পর বছর চলে না। একজন তরুণের বয়স থেমে থাকে না। পরিবারের দায়িত্ব থেমে থাকে না। জীবনযাত্রার ব্যয় থেমে থাকে না। তাঁর বন্ধুরা চাকরি পাচ্ছেন। কেউ ব্যবসা করছেন। কেউ বিদেশে যাচ্ছেন। কেউ প্রযুক্তির মাধ্যমে আয় করছেন। আর তিনি যদি শুধু রাজনৈতিক কর্মসূচির পর কর্মসূচিতে সময় দেন, তাহলে তাঁর নিজের ভবিষ্যৎ কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর প্রয়োজন। আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক কর্মীদের জন্য জীবিকার পথ তৈরি মানে শুধু চাকরি দেওয়া নয়। চাকরি সব সমস্যার সমাধান নয়। ব্যবসা, উদ্যোক্তা, কৃষি, প্রযুক্তি, কারিগরি কাজ, ফ্রিল্যান্সিং, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ- সব পথই বিবেচনায় নিতে হবে। কারও হয়তো চাকরি দরকার। কারও দরকার ব্যবসার পুঁজি। কারও দরকার প্রশিক্ষণ। কারও দরকার বাজারের সঙ্গে যোগাযোগ। কারও দরকার একটি ভালো পরামর্শ। অর্থাৎ প্রয়োজনভিত্তিক সহায়তা দরকার। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সংগঠনগুলো নিজেদের মধ্যে ‘কর্মী উন্নয়ন কর্মসূচি’ নিতে পারে।

জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে ক্যারিয়ার সহায়তা কেন্দ্র করা যেতে পারে। দক্ষতা উন্নয়নের জন্য সরকারি-বেসরকারি প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বৈধ ও স্বচ্ছভাবে যোগাযোগ করা যেতে পারে। উদ্যোক্তা হতে আগ্রহীদের ব্যবসা পরিকল্পনা, হিসাব ব্যবস্থাপনা ও বাজার সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেওয়া যেতে পারে। তবে সবকিছুর ভিত্তি হতে হবে যোগ্যতা ও স্বচ্ছতা। রাজনীতির নামে কোনো অনৈতিক সুবিধা নয়। দলীয় পরিচয়ের নামে অন্যের অধিকার হরণ নয়। বরং কর্মীকে সক্ষম করে তোলা। এটাই হতে পারে টেকসই পথ। কারণ বিশ্বব্যাংকের সাম্প্রতিক বিশ্লেষণ বলছে, ২০১৬ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে ১ কোটি ৪০ লাখ তরুণ কর্মক্ষম বয়সে প্রবেশ করলেও নতুন কাজ তৈরি হয়েছে প্রায় ৮৭ লাখ। অর্থাৎ শ্রমবাজারে প্রবেশ করা তরুণদের একটি বড় অংশ পর্যাপ্ত কাজের সুযোগ পায়নি। একই সময়ে উৎপাদনশীল কর্মসংস্থানের ঘাটতি এবং দক্ষতার অমিলও বড় সমস্যা হয়ে উঠেছে। এই পরিস্থিতিতে রাজনৈতিক কর্মীদের প্রশ্নটি আরও বড় জাতীয় প্রশ্নের অংশ। আজকের তরুণ কর্মী আগামী দিনের উদ্যোক্তা হতে পারেন। শ্রমিক হতে পারেন। শিক্ষক হতে পারেন। প্রকৌশলী হতে পারেন। কৃষি উদ্যোক্তা হতে পারেন। প্রযুক্তিবিদ হতে পারেন। তাঁকে সেই সুযোগ দিতে হবে। রাজনীতি যদি মানুষের কল্যাণের কথা বলে, তাহলে মানুষের জীবিকার কথাও বলতে হবে। শুধু ভোটের সময় নয়। শুধু মিছিলের সময় নয়। শুধু আন্দোলনের সময় নয়। সারা বছর। রাজনৈতিক কর্মীদের সম্মানজনক জীবিকার প্রশ্নটি তাই কোনো বিলাসী দাবি নয়। এটি মানবিক প্রশ্ন। এটি সামাজিক প্রশ্ন। এটি অর্থনৈতিক প্রশ্ন। একজন কর্মী যখন দলের জন্য সময় দেন, তখন তাঁর নিজের জীবনের সময়ও এগিয়ে যায়। তাই তাঁর ত্যাগের স্বীকৃতি শুধু ফুলের মালা বা প্রশংসার বক্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকা উচিত নয়। তাঁর দক্ষতা বাড়ানোর পথ চাই। কাজের তথ্য চাই। উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ চাই। প্রশিক্ষণ চাই। সম্মানজনক আয়ের সুযোগ চাই। সবচেয়ে বড় কথা, নিজের পায়ে দাঁড়ানোর সুযোগ চাই।

কর্মীকে নির্ভরশীল করে রাখা কোনো দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নয়। তাঁকে সক্ষম করে তোলাই প্রকৃত শক্তি। কারণ শক্তিশালী কর্মী মানে শুধু বড় মিছিল নয়। শক্তিশালী কর্মী মানে স্বাবলম্বী পরিবার। শক্তিশালী কর্মী মানে উৎপাদনশীল সমাজ। শক্তিশালী কর্মী মানে শক্তিশালী অর্থনীতি। তাই সময় এসেছে দৃষ্টিভঙ্গি বদলের। কর্মী শুধু পোস্টার নয়। কর্মী শুধু মিছিল নয়। কর্মী শুধু সভার সংখ্যা নয়। কর্মী একজন মানুষ। তাঁর পেটেও ক্ষুধা আছে। তাঁর ঘরেও খরচ আছে। তাঁর সন্তানদের ভবিষ্যৎ আছে। তাঁর নিজেরও একটি স্বপ্ন আছে। রাজনীতি যদি সত্যিই মানুষের জন্য হয়, তাহলে সেই স্বপ্নের কথাও বলতে হবে। মিছিলের শক্তির সঙ্গে জীবনের শক্তি যোগ করতে হবে। ত্যাগের সঙ্গে দক্ষতা যোগ করতে হবে। রাজনীতির সঙ্গে কর্মসংস্থানের কথাও বলতে হবে। কারণ একজন কর্মীকে শুধু রাজপথে প্রয়োজন হয় না। দেশ গড়ার কাজেও তাঁকে প্রয়োজন। আর দেশ গড়তে হলে তাঁর হাতে শুধু পতাকা নয়- দক্ষতা, কাজ এবং সম্মানজনক জীবিকার সুযোগও দিতে হবে।

লেখক: অধ্যাপক (কৃষি) ও সাবেক ডিন, কৃষি ও পল্লী উন্নয়ন অনুষদ এবং সাধারণ সম্পাদক, জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরাম, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়।