চাকরিজীবী বলি আর ব্যবসায়ী বলি, প্রত্যেকটা মানুষের জীবনেই একটা স্বপ্ন থাকে। আর সেটা হলো—একদিন নিজের একটা ঘর হবে। মনে মনে সবাই স্বপ্ন বোনে আর ভাবে, সেই দিনটা কবে আসবে, যেদিন মাসের শেষে বাড়িওয়ালা এসে আর ভাড়া দেওয়ার তাগাদা দেবেন না। যাদের টাকা-পয়সার কোনো অভাব নেই, তারা নিজেরাই জমি কিনে সেই জমিতে সুন্দর একটা বাড়ি তৈরি করে পরিবারের সবাইকে নিয়ে সুখে-শান্তিতে জীবনযাপন করেন। আর যাদের আয় সীমিত, তাদের সামর্থ্য অনুযায়ী ছোটখাটো একটা ফ্ল্যাট-বাড়ি পর্যন্তই স্বপ্নটা সীমাবদ্ধ থাকে।
নিজের একটা ফ্ল্যাট বা বাড়ির মালিক হওয়ার একটা জেদও কাজ করে মনে মনে। একটা ফ্ল্যাটে সাধারণত ফ্ল্যাট-বাড়ির মালিকেরা নিজেরাও থাকেন, আবার কিছু কিছু ফ্ল্যাট ভাড়াও দেওয়া থাকে। এই যে ফ্ল্যাট-বাড়ির মালিক আর ভাড়াটিয়া—এই দুই পক্ষের মধ্যেও থাকে একধরনের দূরত্ব। বেশিরভাগ ফ্ল্যাট-বাড়িতেই বাড়িওয়ালারা ভাড়াটিয়াদের তেমন একটা পাত্তা দিতে চান না। আবার কিছু সংখ্যক ফ্ল্যাট মালিকও এটা বুঝতে চান না যে দু-একটা ফ্ল্যাটের মালিক বনে যাওয়া মানে আম্বানি, আদানি বা ইলন মাস্ক বনে যাওয়া নয়।
যাই হোক, নানাবিধ বিড়ম্বনা, মনোকষ্ট আর নিজের একটা মাথা গোঁজার ঠাঁই করার খায়েশ থেকেই মানুষ গ্রামের জমিজমা বিক্রি করে হলেও একটা ফ্ল্যাট কেনার প্রাণান্ত চেষ্টা করে থাকে। একটা ফ্ল্যাটের মালিক হওয়া কারও কারও কাছে সোনার হরিণ অথবা আলাদিনের প্রদীপ হাতে পাওয়ার মতো অবস্থা। তবে যে যাই বলুক, এই তথাকথিত ফ্ল্যাট-বাড়িগুলোকে আমার কাছে অনেকটা কবুতরের খাঁচার মতোই মনে হয়। কবুতর যেমন বেলা শেষে নিজের খাঁচায় ঢুকে পড়ে, ঠিক তেমনি ফ্ল্যাট-বাড়িতে বসবাসকারী মানুষগুলোও বেলা শেষে ডানে-বামে না তাকিয়ে সোজা এসে নিজের ফ্ল্যাটে ঢুকে পড়ে।
একেকটা বিল্ডিংয়ে সাধারণত অনেকগুলো ফ্ল্যাট থাকে। এসব ফ্ল্যাটে বসবাসকারী একেকজন ফ্ল্যাট মালিকের শিক্ষাদীক্ষা আলাদা, ব্যবসা বলি আর চাকরি বলি—সেসবের ধরন আলাদা। একেকজনের সামাজিক অবস্থান একেক রকম। একেকজন ফ্ল্যাট মালিক ভিন্ন ভিন্ন এলাকার মানুষ হওয়ার কারণে তাঁদের প্রত্যেকের আচার-আচরণ, চালচলন, মেজাজ-মর্জি ও সংস্কৃতিও ভিন্ন। ফলে প্রত্যেকের সঙ্গে প্রত্যেকের বন্ডিং, মানে আত্মিক সম্পর্কটা, তেমনভাবে গড়ে ওঠে না। তাই একেকবার মনে হয়, ভাড়াবাড়িতেই তো ভালো ছিলাম, সুখে ছিলাম। কোনো ঝুটঝামেলাই ধারেকাছেও ঘেঁষত না। তাহলে পয়সা খরচ করে কি অশান্তিই কিনে নিলাম?
ফ্ল্যাট-বাড়িগুলোতে আরেকটা অদ্ভুত ব্যাপার হলো—একই বিল্ডিংয়ে বসবাস, কিন্তু কারও সঙ্গে কারও দেখা হয় না, কথা হয় না। কালেভদ্রে কারও সঙ্গে দেখা হলেও তখনও তেমন একটা কথা হয় না। ওই যে বললাম, বন্ডিং অথবা আত্মিক সম্পর্কটা গড়ে ওঠেনি। একজন মানুষ কখন আরেকজন মানুষের সঙ্গে সময় কাটায়, কথা বলে, দু-এক দিন না দেখা হলে পাগলের মতো খোঁজখবর নেয়? যখন একজন মানুষের সঙ্গে আরেকজন মানুষের মনের মিল থাকে, আত্মিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে এবং সর্বোপরি ভালোবাসার বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে যায়, তখন।
ফ্ল্যাট-বাড়িতে আরেকটা বড় ঝামেলা হলো—একজনের সঙ্গে আরেকজনের মতবিরোধ লেগেই থাকে। কারও সঙ্গে কারও মতের মিল নেই। কেউ একজন নিজ উদ্যোগে কোনো উন্নয়নমূলক কাজের প্রস্তাব দেবেন, তাতেও কোনো কিছু না ভেবেই বাদ সাধবেন কয়েকজন। অনেক সময় ছোটখাটো বিষয় নিয়ে পরিবেশ উত্তপ্ত করে তুলবেন কিছু লোক। কেউ কেউ আছেন, গায়ের জোরে মন যা চায় তা-ই করবেন। কিছু পরিবার আছে, তারা যেখানে-সেখানে ময়লা-আবর্জনা ফেলে বিল্ডিংয়ের সার্বিক পরিবেশ নোংরা করে রাখবে।
এমন দু-একজনও থাকবেন, যারা উন্নয়নমূলক কাজের চাঁদা ঠিক সময়ে দেবেন না; এমনকি প্রতি মাসের সার্ভিস চার্জ দিতেও গড়িমসি করবেন, সময়ক্ষেপণ করবেন। কত আর বলব! ইত্যাদি-ইত্যাদি হাজারো সমস্যায় জর্জরিত প্রতিটি ফ্ল্যাটবাড়ি।
এর মধ্যে দু-একজন আছেন, যারা গাছপালা, শাকসবজি লাগিয়ে ছাদের দখল নিতে উঠেপড়ে লাগেন। লোকগুলো একবারও ভাবেন না, ছাদটা আমার একার নয়। তাহলে অন্যের হক নষ্ট করা কি আমার ঠিক হচ্ছে? দু-একজন অতি লোভী ফ্ল্যাট মালিক আছেন, যারা পারলে ছাদের ওপর থাকা কমন হলরুমটাও নিজেদের দখলে নিয়ে নিতে চান। আবার অনেক ভদ্র ফ্ল্যাট মালিকও আছেন, যারা ইচ্ছা করেই কোনো ঝুটঝামেলায় নিজেদের জড়ান না।
তবে হ্যাঁ, ব্যতিক্রম যে নেই, তা-ও কিন্তু নয়। এমন অনেক ফ্ল্যাট-বাড়ি আছে, যেখানে শিক্ষিত, দায়িত্বশীল ও সামাজিকভাবে সচেতন মানুষ বসবাস করেন। সেখানকার পরিবেশও অবশ্যই আলাদা হবে। সমস্যাটা তখনই দাঁড়ায়, যখন সবকিছু যাচাই-বাছাই না করে কেউ ফ্ল্যাট কিনে ফেলেন।
অনেকেই আছেন, যারা একসঙ্গে জমি কিনে সেই জমিতে নিজেরা বিল্ডিং তৈরি করেন। এখন কথা হলো, আপনি পার্টনারশিপে জমি কিনলেন—আপনার বাকি পার্টনাররা কারা, তাঁদের মানসিকতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক আচরণ কেমন—তা কি আপনি একবারও যাচাই করে দেখেছেন? নাকি আপনার মনের খায়েশ পূরণের জন্য এবং ভাড়াটিয়া নামের অভিশাপ দূর করার জন্য যেনতেন একটা ফ্ল্যাটের মালিক হতে পারলেই হলো?
একটি ফ্ল্যাট-বাড়িতে বসবাসের ক্ষেত্রে শুধু কার কত টাকা আছে বা কে কী পেশায় আছেন, সেটাই গুরুত্বপূর্ণ নয়। বরং একজন মানুষের আচরণ, মূল্যবোধ, পরিচ্ছন্নতাবোধ, দায়িত্বশীলতা, অন্যের অধিকারের প্রতি সম্মান এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মানসিকতাই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই ছাদের নিচে বসবাস করতে হলে এসব বিষয়ই শেষ পর্যন্ত পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
আমি এখানে কাউকে খাটো করে দেখছি না, কারও পেশাকেই অবজ্ঞা করছি না। কিন্তু আমি এটা অবশ্যই বলব—ইচ্ছে করলেই যার-তার সঙ্গে বসবাস করা যায় না। এটা কোনো বৈষম্য নয়; বরং বাস্তবতা। আবেগ দিয়ে জীবন চলে না, বাস্তবতাও মেনে নিতে হয়। তা না হলে আত্মীয়তা করতে গেলেও কেউ মানুষের পারিবারিক ও সামাজিক পটভূমি বিবেচনা করত না।
শেষ পর্যন্ত নিজের একটা ফ্ল্যাট-বাড়ি থাকা নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয়। কিন্তু সেই ফ্ল্যাট-বাড়ির সঙ্গে যদি শান্তি, পারস্পরিক সম্মান আর সুন্দর প্রতিবেশী সম্পর্ক না থাকে, তাহলে মাথার ওপর নিজের ছাদ থাকলেও মনে হতে পারে—’ভাড়াবাড়িতেই হয়তো ভালো ছিলাম।’
মো. কাওছার আলম চৌধুরী: কবি ও লেখক








