ঢাকা | বুধবার, ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৫ ভাদ্র ১৪৩৩

ভাইভা কি সত্যিই জ্ঞান ও যোগ্যতা যাচাইয়ের বৈজ্ঞানিক মাধ্যম?

মানুষের জীবন আসলে খুবই সংক্ষিপ্ত। কেউ সৌভাগ্যক্রমে শত বছর বেঁচে থাকলেও সেই দীর্ঘ জীবনও একদিন শেষ হয়ে যায়। জীবনের শেষ কয়েকটি বছর অনেকের জন্যই হয়ে ওঠে শারীরিক ও মানসিকভাবে কষ্টকর—যা শুধু নিজের জন্য নয়, পরিবারের অন্য সদস্যদের জন্যও নানা ধরনের বাস্তবতা ও দায়িত্বের জন্ম দেয়। অথচ এই অল্প সময়ের জীবনকে অর্থবহ ও সফল করার জন্য মানুষকে শৈশব থেকেই শুরু করতে হয় এক দীর্ঘ প্রতিযোগিতার পথচলা।

আশি-নব্বইয়ের দশকের আগের সময়ের দিকে তাকালে দেখা যায়, তখন শিশুদের স্কুলে পাঠানোর বয়স ছিল তুলনামূলকভাবে বেশি। পাঁচ-ছয় বছর, এমনকি তারও পরে অনেক শিশুর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবন শুরু হতো। কিন্তু গত কয়েক দশকে পরিস্থিতি সম্পূর্ণ বদলে গেছে। এখন একটি শিশুর বয়স তিন বছর পূর্ণ হতে না হতেই তাকে স্কুলে পাঠানোর প্রবণতা তৈরি হয়েছে। কাকডাকা ভোরে ঘুমন্ত শিশুকে ঘুম থেকে তুলে স্কুলে নিয়ে যাওয়ার দৃশ্য এখন খুবই স্বাভাবিক।

এর পেছনে মূল কারণ একটাই—পরিবর্তিত পৃথিবীর সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলার তীব্র প্রতিযোগিতা।
আশি-নব্বইয়ের দশকের সেই পৃথিবী এখন আর নেই। তখন জনসংখ্যা তুলনামূলক কম ছিল, জীবনযাত্রার মানও আজকের মতো এতটা প্রতিযোগিতামূলক ছিল না। চাকরির বাজার ছিল সীমিত, কিন্তু একই সঙ্গে চাকরি পাওয়ার প্রতিযোগিতাও আজকের মতো তীব্র ছিল না। সময়ের সাথে বিশ্ব এগিয়েছে, জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিতে এসেছে অভাবনীয় পরিবর্তন। কিন্তু তার সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয়, প্রত্যাশা এবং প্রতিযোগিতা।

ফলে বাবা-মায়েরাও অনেকটা বাধ্য হয়েই ছোটবেলা থেকে সন্তানদের ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে শুরু করেন। প্রত্যেক বাবা-মায়ের একটাই প্রত্যাশা—তাদের সন্তান যেন আধুনিক বিশ্বের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে পারে, নিজের যোগ্যতায় প্রতিষ্ঠিত হতে পারে এবং একটি সুন্দর জীবন গড়ে তুলতে পারে।

একসময় পড়ালেখা শেষ করাই ছিল বড় অর্জন। এখন পড়ালেখা শেষ করার পর শুরু হয় আরেকটি বড় যুদ্ধ—চাকরি পাওয়ার যুদ্ধ।
নিজের শিক্ষাগত যোগ্যতা, ফলাফল ও দক্ষতার ওপর ভিত্তি করে প্রত্যেকেই চাকরির বাজারে প্রবেশ করে। কেউ চাকরি খোঁজেন দেশে, আবার কেউ উন্নত জীবনের আশায় উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে পাড়ি জমান। অনেকেই পড়ালেখা শেষে সেই দেশেই স্থায়ী হওয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু এখানেই আমার মূল প্রশ্ন—চাকরি দেওয়ার ক্ষেত্রে যোগ্য প্রার্থী নির্বাচন করার প্রচলিত পদ্ধতিগুলো আসলে কতটা যৌক্তিক, কার্যকর ও বৈজ্ঞানিক?

সাধারণত চাকরির প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে দুটি প্রধান পদ্ধতি অনুসরণ করা হয়—লিখিত পরীক্ষা ও ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা।
আমার মতে, একজন প্রার্থী যে বিষয়ে পড়াশোনা করেছেন, তার চাকরির ক্ষেত্রও যথাসম্ভব সেই বিষয় বা সংশ্লিষ্ট দক্ষতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া উচিত। একইভাবে যে পদের জন্য একজন প্রার্থীকে নিয়োগ দেওয়া হবে, সেই পদের দায়িত্ব, প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও বাস্তব কর্মপরিবেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে লিখিত পরীক্ষার প্রশ্নও প্রণয়ন করা উচিত।

কিন্তু বাস্তবতা অনেক ক্ষেত্রেই ভিন্ন। অনেক চাকরির লিখিত পরীক্ষায় এমন সব প্রশ্ন করা হয়, যার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট পদ, দায়িত্ব কিংবা প্রার্থীর একাডেমিক বিষয়ের সরাসরি কোনো সম্পর্ক খুঁজে পাওয়া কঠিন। তার ওপর রয়েছে প্রশ্নপত্র ফাঁসসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ, যা পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতাকেই প্রশ্নের মুখে দাঁড় করায়।

তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি আমার কাছে অন্য জায়গায়—ভাইভা নেওয়া হয় কেন?
ভাইভা কি সত্যিই একজন প্রার্থীর জ্ঞান, মেধা, যোগ্যতা ও কর্মদক্ষতা যাচাইয়ের একটি নির্ভরযোগ্য ও বৈজ্ঞানিক পদ্ধতি?
ভাইভা বোর্ডে অনেক সময় প্রার্থীকে তার শিক্ষাগত যোগ্যতা, সংশ্লিষ্ট পদ কিংবা সম্ভাব্য দায়িত্বের সঙ্গে সম্পর্কহীন নানা প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হয়। কখনো কখনো এমন কিছু প্রশ্ন করা হয়, যার উত্তর জানা বা না-জানা একজন প্রার্থী ওই নির্দিষ্ট চাকরিটি কতটা দক্ষতার সঙ্গে করতে পারবেন—তার প্রকৃত কোনো নির্দেশক নয়।

আরেকটি বড় সমস্যা হলো ব্যক্তিগত পক্ষপাত ও প্রভাবের সম্ভাবনা। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পরিচিতি, সুপারিশ, রেফারেন্স, সামাজিক বা পেশাগত প্রভাব কিংবা বোর্ড সদস্যের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ প্রার্থীর মূল্যায়নে প্রভাব ফেলতে পারে। এমনকি কখনো কখনো ভাইভা যেন প্রার্থীর যোগ্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে তার চেহারা, কথাবার্তা, ব্যক্তিত্ব কিংবা তাৎক্ষণিক উপস্থাপনার ওপর নির্ভরশীল একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
অথচ একজন মানুষ ভালোভাবে কথা বলতে না পারলেই যে সে অযোগ্য, তা নয়। আবার একজন মানুষ খুব চমৎকারভাবে কথা বলতে পারলেই যে তিনি সংশ্লিষ্ট কাজের জন্য সবচেয়ে যোগ্য—তাও নয়।

তাই আমার প্রশ্ন থেকেই যায়—ভাইভা যদি একজন প্রার্থীর প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা ও কর্মক্ষমতা যথাযথভাবে পরিমাপ করতে না পারে, তাহলে নিয়োগের মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এটিকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেওয়া কতটা যুক্তিসঙ্গত?
আমার মতে, চাকরি কিংবা যেকোনো ধরনের প্রার্থী নির্বাচনের ক্ষেত্রে ভাইভাকে পুরোপুরি বাদ দেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে এর উদ্দেশ্য, কাঠামো ও মূল্যায়ন পদ্ধতিতে আমূল পরিবর্তন আনা প্রয়োজন।

ভাইভায় প্রশ্ন হতে হবে সংশ্লিষ্ট পদ ও দায়িত্বকেন্দ্রিক। প্রার্থীর বাস্তব সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা, সিদ্ধান্ত গ্রহণের দক্ষতা, সংশ্লিষ্ট বিষয়ে জ্ঞান, পেশাগত আচরণ এবং পরিস্থিতি মোকাবিলার সক্ষমতা যাচাই করাই হওয়া উচিত এর মূল উদ্দেশ্য। একই প্রশ্নের ভিত্তিতে নির্ধারিত মানদণ্ডে প্রত্যেক প্রার্থীকে মূল্যায়ন করা গেলে ব্যক্তিগত পক্ষপাতের সুযোগও অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ মূল্যায়ন নিশ্চিত করা।
কারণ একটি চাকরি শুধু একজন মানুষের জীবিকার মাধ্যম নয়; এটি তার পরিবার, ভবিষ্যৎ এবং সামাজিক অবস্থানের সঙ্গেও গভীরভাবে জড়িত। তাই একজন যোগ্য প্রার্থীকে বঞ্চিত করে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য কাউকে নিয়োগ দেওয়া শুধু একজন ব্যক্তির প্রতি অবিচার নয়, বরং প্রতিষ্ঠানের প্রতিও অবিচার।

আমরা যদি সত্যিই মেধাভিত্তিক, দক্ষ ও যোগ্য জনবল গড়ে তুলতে চাই, তাহলে নিয়োগ প্রক্রিয়াকেও সময়ের সঙ্গে আধুনিক, স্বচ্ছ ও বৈজ্ঞানিক করে তুলতে হবে। ভাইভা থাকবে, তবে তা যেন কোনো প্রার্থীর ভাগ্য নির্ধারণের একমাত্র বা প্রধান হাতিয়ার না হয়; বরং লিখিত পরীক্ষা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, বাস্তব দক্ষতা, অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় পেশাগত সক্ষমতার সমন্বিত মূল্যায়নের একটি অংশ হয়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি ভাইভা থাকবে কি থাকবে না—সেটি নয়। মূল প্রশ্ন হলো, একজন যোগ্য মানুষকে যোগ্যতার ভিত্তিতে সঠিকভাবে শনাক্ত করার জন্য আমরা কতটা ন্যায়সংগত, নিরপেক্ষ ও বৈজ্ঞানিক নিয়োগ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে পারছি।

কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক