দেশের বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লেও গত ১৩ বছর ধরে কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি)। ২০০৬ সালে প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রায় দুই দশক পার করলেও আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী আকর্ষণে উল্লেখযোগ্য সাফল্য দেখাতে পারেনি। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র বলছে, প্রতিষ্ঠার পর থেকে মাত্র চারজন বিদেশি শিক্ষার্থী এখানে অধ্যয়ন করেছেন। এর মধ্যে তিনজন ভর্তি হন ২০১১-১২ শিক্ষাবর্ষে এবং একজন ২০১২-১৩ শিক্ষাবর্ষে। এরপর আর কোনো বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি হয়নি।
খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি-সংক্রান্ত ওয়েবসাইটে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা কোনো নির্দেশনা, আবেদন পদ্ধতি কিংবা তথ্যসেবা নেই। যদিও দেশের অনেক পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় নিয়মিত বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তির জন্য বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে থাকে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক মানের আবাসন সুবিধার অভাব, বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক নীতিমালা ও সেবার অনুপস্থিতি, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচারণার ঘাটতি এ অবস্থার জন্য দায়ী মনে করেন কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মশিউর রহমান ।
বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন ( ইউজিসি)’র সর্বশেষ বার্ষিক প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৩ শিক্ষাবর্ষে দেশের উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে মোট ১,৪৫৯ জন বিদেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন। এর মধ্যে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ৮২৬ জন এবং ২১টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ৬৩৩ জন শিক্ষার্থী রয়েছেন। পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে সর্বোচ্চ ১১২ জন বিদেশি শিক্ষার্থী নিয়ে শীর্ষে রয়েছে হাজী মোহাম্মদ দানেশ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়। এর পরেই রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (৯১ জন) এবং বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (8৭ জন)। তবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ২০১৮ সালের পর থেকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিদেশি শিক্ষার্থীর সংখ্যা ক্রমান্বয়ে কমছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ফার্মেসি বিভাগের ২০২০-২১ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী আব্দুর রহমান সাদী জানান, বর্তমানে উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিকীকরণ একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক। বিদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা, সাংস্কৃতিক বিনিময় এবং বৈশ্বিক র্যাংকিংয়ে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। কিন্তু কুবিতে এ বিষয়ে দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর কোনো উদ্যোগ চোখে পড়েনি।
তিনি আরও বলেন, দেশের পূর্বাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান হওয়া সত্ত্বেও কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থিতি এখনও সীমিত। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে আগামী দিনেও বিদেশি শিক্ষার্থীশূন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের তালিকায়ই থেকে যাবে কুবি।
আন্তর্জাতিক বিষয়াবলি দপ্তরের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মশিউর রহমান বলেন, বিদেশি শিক্ষার্থীদের আগ্রহী করার জন্য আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে কাজ করতে হবে। প্রথমত, বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটকে আরও আধুনিক, ব্যবহারবান্ধব ও তথ্যসমৃদ্ধ করতে হবে, যাতে শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও আগ্রহী ভর্তিচ্ছুরা সহজেই প্রয়োজনীয় তথ্য পেতে পারেন। দ্বিতীয়ত, একাডেমিক কার্যক্রমের গতি বাড়িয়ে সেশনজটমুক্ত শিক্ষা নিশ্চিত করতে হবে এবং পরীক্ষা শেষ হওয়ার পর নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই ফলাফল প্রকাশের ব্যবস্থা করতে হবে।৷ তৃতীয়ত, শিক্ষার্থীদের জন্য সুযোগ-সুবিধা বৃদ্ধি করতে হবে। বিশেষ করে আবাসন সংকট নিরসন, লাইব্রেরির আধুনিকায়ন, গবেষণা ও প্রযুক্তিগত সুবিধা সম্প্রসারণ, উন্নত পাঠাগার পরিবেশ এবং অন্যান্য শিক্ষার্থীসেবামূলক সুবিধা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নিতে হবে। এসব পদক্ষেপ বাস্তবায়িত হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও সেবার মান আরও উন্নত হবে।
২০১৯ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন কর্মকর্তারা স্বীকার করেছিলেন যে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত সুবিধা নিশ্চিত করতে না পারা এবং পর্যাপ্ত প্রচারণার অভাব বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একই সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইট ও আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থার দুর্বলতাকেও কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছিল।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষকদের মতে, বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে হলে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী সেল গঠন, ইংরেজি মাধ্যমে তথ্যপ্রদান, আবাসন ও বৃত্তি সুবিধা বৃদ্ধি এবং বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা জোরদার করতে হবে।
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র উপদেষ্টা ও বাংলা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. নাহিদা বেগম বলেন,
“বর্তমান বিশ্বে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের মান নির্ধারণে আন্তর্জাতিকীকরণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিদেশি শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি শুধু সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যই বৃদ্ধি করে না, বরং শিক্ষা ও গবেষণার পরিবেশকেও সমৃদ্ধ করে। কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের জন্য একাডেমিক পরিবেশ উন্নয়ন, শিক্ষার্থীসেবা বৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিচিতি বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে প্রশাসন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. মো. সোলাইমান বলেন,
“বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণ করতে হলে অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। আবাসন, গবেষণা সুবিধা, লাইব্রেরি ও তথ্যপ্রযুক্তি সেবার উন্নয়ন জরুরি। একই সঙ্গে বিদেশি শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তি, সহজ ভর্তি প্রক্রিয়া এবং আন্তর্জাতিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সঙ্গে একাডেমিক সহযোগিতা বৃদ্ধির উদ্যোগ নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, “আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় এখনো সি ক্যাটাগরির একটা বিশ্ববিদ্যালয় সে সেক্ষেত্র কে চাইবে এরকম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করতে আগ্রহ দেখাতে? সুতরাং আমাদের আমাদের পড়াশোনা, বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রোফইল আপডেট এবং প্রমোশন করতে হবে।”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, “বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি দৃশ্যমান হতে হবে। বর্তমানে অনেক শিক্ষক গবেষণা ও একাডেমিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকলেও সেগুলো যথাযথভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপিত হচ্ছে না। শিক্ষকদের গবেষণা, প্রকাশনা ও একাডেমিক অর্জনের তথ্য নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রমের প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে বলে আমি মনে করি।”
কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মাসুদা কামাল বলেন, “বিদেশি শিক্ষার্থী আকর্ষণের ক্ষেত্রে আমাদের শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আরও বেশি দৃশ্যমান হতে হবে। বর্তমানে অনেক শিক্ষক গবেষণা ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রমে সম্পৃক্ত থাকলেও সেগুলো যথাযথভাবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উপস্থাপিত হচ্ছে না। শিক্ষকদের গবেষণা, প্রকাশনা ও একাডেমিক অর্জনের তথ্য নিয়মিতভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে হালনাগাদ করতে হবে। পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও গবেষণা কার্যক্রমের প্রচার-প্রচারণা বাড়াতে হবে। এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে বিদেশি শিক্ষার্থীদের মধ্যে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সম্পর্কে আগ্রহ বৃদ্ধি পাবে বলে আমি মনে করি।”






