ঢাকা | সোমবার, ১৮ মে ২০২৬,৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩

ফের উত্তপ্ত দেশের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়

দেশের কয়েকটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন ইস্যুতে শিক্ষার্থীরা আন্দোলন করছেন। ভিসি নিয়োগ, হল নিয়ন্ত্রণ, গ্রাফিতি বিতর্কে শিক্ষার্থীরা সংঘর্ষে জড়িয়েছেন। ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। আহত হয়েছেন অনেক শিক্ষার্থী।

গাজীপুর: ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে (ডুয়েট) উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে আন্দোলন তীব্র রূপ নিয়েছে। নবনিযুক্ত উপাচার্যকে প্রত্যাখ্যান করে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত ‘ডুয়েট ব্লকেড’ কর্মসূচির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ও অ্যাকাডেমিক কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

সোমবার (১৮ মে) সকাল থেকে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে অবস্থান নেন। এর ফলে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ক্যাম্পাসে প্রবেশের চেষ্টা করেও ব্যর্থ হন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে ক্যাম্পাস ও আশপাশের এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে।

গত বৃহস্পতিবার সরকার শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক মোহাম্মদ ইকবালকে ডুয়েটের নতুন উপাচার্য হিসেবে নিয়োগ দিয়ে প্রজ্ঞাপন জারি করে। এর পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ এই নিয়োগের বিরোধিতা করে আন্দোলনে নামেন।

রোববার সংঘর্ষে রূপ নিয়েছে। এতে অন্তত ১৫ জন আহত হয়েছেন বলে জানা গেছে। সংঘর্ষের সময় উপাচার্য নিয়োগের পক্ষে ও বিপক্ষে অবস্থান নেওয়া দুই পক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি ধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আজ সকাল থেকে ডুয়েট ক্যাম্পাসে এ উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।

চট্টগ্রাম: চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) পক্ষ থেকে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিবিজড়িত গ্রাফিতি মুছে ফেলার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, এমন অভিযোগ তুলেছে জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) চট্টগ্রাম মহানগর শাখা। এর প্রতিবাদে ‘জুলাই গ্রাফিতি অঙ্কন’ কর্মসূচি পালন করেছে দলটি।

এ সময় বিএনপি ও এনসিপির নেতাকর্মীদের মধ্যে উত্তেজনা দেখা গেছে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে জিইসি মোড় থেকে দেওয়ানহাট পর্যন্ত সব ধরনের সভা-সমাবেশ নিষিদ্ধ করেছে স্থানীয় প্রশাসন।

সোমবার (১৮ মে) সকালে এক গণবিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, ১৮ মে থেকে পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত এ নিষেধাজ্ঞা বহাল থাকবে। চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ অধ্যাদেশ, ১৯৭৮-এর ৩০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে এ আদেশ জারি করেন সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী।

আদেশে বলা হয়েছে, শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষা ও জননিরাপত্তার স্বার্থে উক্ত এলাকায় কোনো ধরনের জনসমাবেশ ও মিছিল-মিটিং করা যাবে না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

সাভার: জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে (জাবি) বহিরাগত কর্তৃক ধর্ষণচেষ্টার ঘটনার পর এবার নারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্য করে অশালীন অঙ্গভঙ্গি, হেনস্তাসহ পৃথক তিনটি ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনার প্রতিবাদে রাতে বিক্ষোভ মিছিল করেছেন শিক্ষার্থীরা।

রোববার রাত ১১টার দিকে প্রক্টরের কার্যালয় থেকে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন তারা। মিছিলটি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবহন চত্বর হয়ে কয়েকটি সড়ক ঘুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা এলাকায় এসে শেষ হয়। পরে সেখানে এক সংক্ষিপ্ত সমাবেশ করেন শিক্ষার্থীরা।

সমাবেশে অর্থনীতি বিভাগের শিক্ষার্থী নাজিয়া বিনতে শামসুদ্দিন বলেন, প্রশাসনিক ভবনের সামনে আমাদের কর্মসূচি শেষ করার পর আমরা খবর পাই যে, ক্যাম্পাসের ইসলামনগর এলাকায় এক ছাত্রী হেনস্তার শিকার হয়েছেন। পরবর্তীতে আমরা যখন প্রক্টর অফিসে যাই, তখন সেখানে আরও দুজন হেনস্তাকারীকে দেখতে পাই। তখনই আমরা ক্ষোভে ফেটে পড়ি এবং বিক্ষোভে নামি। একই সময়ে ক্যাম্পাসের একটি দোকানের কর্মচারী বিক্ষোভকারী ছাত্রীদের আপত্তিকরভাবে ভিডিও করার একটি ঘটনাও ঘটে।

তিনি আরও যোগ করেন, ক্যাম্পাসে যেহেতু একের পর এক হেনস্তার ঘটনা ঘটেই চলেছে, তাই আমরা আমাদের দাবি নিয়ে আবারও রাস্তায় নামতে বাধ্য হয়েছি।

এর আগে, রাত ৯টা ২০ মিনিটের দিকে পৃথক ৩ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয়ের নিরাপত্তা শাখা থেকে তিনজনকে আটক করে পুলিশ। বিষয়টি নিশ্চিত করেন আশুলিয়া থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শফিউল আলম সোহাগ।

তিনি জানান, ক্যাম্পাসের ইসলামনগর গেট এলাকায় নারী শিক্ষার্থী ও অন্যান্য নারীদের উত্যক্ত ও অশালীন কথা বলার অভিযোগে একজনকে আটক করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সন্ধ্যায় প্রক্টর অফিসের সামনে আন্দোলনরত নারী শিক্ষার্থীদের অনুমতি ছাড়া ভিডিও ধারণের অভিযোগে ক্যাম্পাসের এক দোকান কর্মচারীকেও আটক করা হয়েছে।

এছাড়া, নতুন কলা ভবন এলাকার কাছে নারী শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে অশালীন অঙ্গভঙ্গি করার অভিযোগে আরও একজনকে আটক করা হয়েছে বলে জানান এই পুলিশ কর্মকর্তা।

এদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে এক শিক্ষার্থীকে ধর্ষণচেষ্টা ও প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনায় সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন। কমিটিকে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। শনিবার রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ কার্যালয় থেকে ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মোহাম্মদ মহিউদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।

বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, ১২ মে রাতে ক্যাম্পাসে এক নারী শিক্ষার্থীর ওপর বহিরাগত ব্যক্তির ধর্ষণচেষ্টা ও প্রাণনাশের চেষ্টার ঘটনায় নিরাপত্তাসংশ্লিষ্ট দায় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা ব্যক্তিদের দায়িত্ব নিরূপণ করে সুপারিশসহ প্রতিবেদন দিতে এই কমিটি গঠন করা হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মোহাম্মদ কামরুল আহসানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জরুরি প্রশাসনিক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানায়, গঠিত কমিটিতে ফার্মেসি বিভাগের অধ্যাপক মো. সোহেল রানাকে সভাপতি করা হয়েছে। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক নাহিদ আখতার, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. জাকির হোসেন, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধ্যাপক নাসরীন সুলতানা, প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক মো. কামরুজ্জামান, দর্শন বিভাগের অধ্যাপক মো. জহির রায়হান এবং সদস্যসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন উচ্চশিক্ষা ও বৃত্তি শাখার ডেপুটি রেজিস্ট্রার লুৎফর রহমান আরিফ।

পটুয়াখালী: পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (পবিপ্রবি) উপাচার্যের (ভিসি) পদত্যাগ দাবিতে শাটডাউন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। উপাচার্য ড. কাজী রফিকুল ইসলামের পদত্যাগ এবং ছাত্র-শিক্ষক ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর হামলার প্রতিবাদে এ কর্মসূচি পালন করা হয়।

এ ছাড়া উপাচার্যের কার্যালয় ও বাসভবনে তালা লাগিয়ে কমপ্লিট শাটডাউন কর্মসূচি ঘোষণা করায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অচল এবং ক্যাম্পাসে অচলাবস্থা বিরাজ করছে। ফলে শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ।

বিশ্লেষকরা বলছেন, দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দীর্ঘদিন ধরেই জমে থাকা প্রশাসনিক অস্বচ্ছতা, দলীয় প্রভাব, শিক্ষার্থী রাজনীতি এবং নিরাপত্তা সংকট এখন একসঙ্গে বিস্ফোরিত হচ্ছে। বিশেষ করে উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রায় প্রতিটি বিশ্ববিদ্যালয়েই এখন বিরোধ ও বিভক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবির সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তির হিসাব-নিকাশও মিশে যাচ্ছে।

কুষ্টিয়া: ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) বাসে জুনিয়র শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে দুই বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে দফায় দফায় সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় কয়েকজন শিক্ষার্থী আহত হয়েছেন। সংঘর্ষ থামাতে গিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টরও আঘাতপ্রাপ্ত হন।

রোববার (১৭ মে) বিকেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বাসে মারধরের ঘটনার সূত্রপাত হয়। পরে রাত সাড়ে ৮টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক, ডায়না চত্বর ও প্রযুক্তি অনুষদ এলাকায় লোকপ্রশাসন বিভাগ এবং বায়োটেকনোলজি অ্যান্ড জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়ে।

এর আগে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল ও ইসলামী ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষের ঘটনায় গুপ্ত রাজনীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে দেয়াল লিখন ও বিক্ষোভ মিছিল করেছে ছাত্রদল। বিক্ষোভ এবং প্রতিবাদ মিছিল করেছে ছাত্রশিবিরও।