সাধারণ শিক্ষার সকল স্তরে ইসলামী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করাসহ দশটি দাবি জানিয়েছে কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদ।
সোমবার (১৮ মে) সকালে রাজধানীর জাতীয় প্রেসক্লাবের তোফাজ্জল হোসেন মানিক মিয়া হলে এক সংবাদ সম্মেলনে এই দাবি জানায় সংগঠনটি। লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন কওমি মাদরাসা শিক্ষক পরিষদের সভাপতি অধ্যক্ষ মুহাম্মদ মিজানুর রহমান চৌধুরী।
লিখিত বক্তব্যে তিনি বলেন, বাংলাদেশ একটি স্বাধীন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র। সংবিধানের ভিত্তিতে আইন প্রণীত হয় আইনের আলোকেই নীতিমালা প্রণীত হয়। সংবিধান ও আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের অভিপ্রায়, তাদের ঐতিহ্য, ধর্মীয় মূল্যবোধ, শিক্ষা, সভ্যতা-সংস্কৃতি বিবেচনায় রেখেই সংবিধান রচনা করতে হয়। ৯২ শতাংশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে মুসলমানদের দ্বীনি শিক্ষা সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে স্বাধীনতার এক বছর পর ১৯৭২ সালের শেষের দিকে সংবিধান প্রণয়ন সমাপ্ত হয়েছে। প্রণীত সংবিধানে রাষ্ট্রের মূলনীতি সমূহের মধ্যে সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা সন্নিবেশিত করা হয়েছে। যারা স্বাধীনতার জন্য আন্দোলন করেছে, মুক্তিযুদ্ধে সক্রিয় অংশগ্রহণ করেছে তারা সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টি জানতে পেরেছে স্বাধীনতার এক বছর পর। আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রাম ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য হয়েছে তার কোন ঐতিহাসিক দলিল প্রমাণ নেই।
তিনি আরও বলেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানের ঘোষিত ঐতিহাসিক ৭ দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান ও ৭০ এর ঐতিহাসিক নির্বাচনের নির্বাচনী ইশতেহারের মধ্যে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা উল্লেখ নেই। মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রালয়ের ওয়েবসাইটে; সেখানেও ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়টা কোথাও উল্লেখ নেই। খুব সম্ভবত ধর্মনিরপেক্ষতার কথা সংবিধানে যোগ হয়েছে প্রতিবেশী রাষ্ট্র ভারতের কারণে। আমাদের সংবিধান প্রণেতাগণ বিশেষ করে ড. কামাল হোসেন তিনি আদ্যোপান্ত সেক্যুলার শিক্ষায় শিক্ষিত, তিনি ভারতের আদলে সংবিধানের খসড়া প্রণয়ন করেছেন। বহু জাতির দেশ ভারতের জন্য ধর্মনিরপেক্ষতার নীতি প্রয়োগ হলেও ৯২ শতাংশ মুসলমানের দেশের জন্য তা কখনো যুক্তিযুক্ত হতে পারে না।
এসময় তিনি ১০ দফা দাবি দাবি তুলে ধরেন।
দাবিগুলো হলো- ১. সংবিধান থেকে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশের ৮(১) নং অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সমাজতন্ত্র ও ধর্ম নিরপেক্ষতা অনুচ্ছেদ বাতিল করে ইসলামী প্রজাতন্ত্র প্রতিস্থাপিত করতে হবে।
২. সংবিধানের ১৭ নং অনুচ্ছেদ সংশোধন করে সাধারণ শিক্ষার সকল স্তরে প্রাথমিক শিক্ষা এবং মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক সব শাখায় ইসলামী শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করতে হবে।
৩. শিক্ষার সব পর্যায়ে ইসলাম ধর্মীয় শিক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে ও বাধ্যতামূলক করে ইসলামের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ শিক্ষা আইন পাস করা।
৪. সংবিধানের ২৩ নং অনুচ্ছেদ সংশোধন করে ইসলামী সভ্যতা ও সংস্কৃতিকে প্রধান্য দিয়ে সকল ক্ষেত্রে তা প্রয়োগ করতে হবে।
৫. আল্লাহ, রাসুল ও ইসলাম অবমাননা ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুৎসারোধে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে অবিলম্বে জাতীয় সংসদে (ব্লাসফেমি) Blasphemy (ধর্ম অবমাননা) আইন পাস করা। নবী-রাসুলগণের কল্পিত ছবি, বানোয়াট ইতিহাস বিকৃত ছায়াছবি সামাজিক মাধ্যমে প্রচার বন্ধ করতে হবে।
৬. ওয়াকফ আইন সংশোধন করে এমনভাবে আইনটি প্রণয়ন করা যাতে ওয়াকফ প্রশাসক কোনভাবেই ব্যাপক ভিত্তিক গণ শুনানি ব্যতিত ওয়াকিফ, মুতাওয়াল্লী ও ওয়াকফ সম্পত্তির বিষয়ে কোনভাবেই হস্তক্ষেপ করিতে না পারে। এবং ওয়াকফ দলিলের রেজিস্ট্রেশন খরচ হেবা বিষয়ক ঘোষণাপত্র দলিল রেজিষ্ট্রেশন খরচের মতোই নির্ধারণ করা।
৭. মুসলমানদের ব্যক্তিগত বিষয়াদি যথা- বিবাহ, তালাক, দেন মোহর, ভরণ-পোষণ, অভিভাবকত্ব, মিরাছ, ওয়াকফ সম্পত্তির ব্যবস্থাপনাসহ যাবতীয় বিষয়াদির জন্য জেলায় জেলায় শরীয়াহ আদালত প্রতিষ্ঠা করা, উক্ত আদালতে দেশের বিজ্ঞ ও মুহাক্কিক উলামায়ে কেরামগণকে নিয়োগ দিতে হবে।
৮. সরকারি-বেসরকারি সকল চাকরি নিয়োগ ক্ষেত্রে মুসলিম প্রার্থীদের জন্য নির্ধারিত পরিমাণ সহীহ কুরআন তিলাওয়াত, হালাল-হারাম সম্পর্কে জরূরি মাসআলা জানা প্রার্থীতার পূর্ব শর্ত এবং নিয়োগ বোর্ডে দক্ষ আলেমদের সম্পৃক্ত করে এবং ধর্মীয় বিষয়টি সঠিক ভাবে যাচাই বাছাই করতে হবে।
৯. কওমি মাদরাসা বিশেষায়িত শিক্ষার মর্যাদা সুরক্ষার আইন সিদ্ধ করতে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের ৪৮নং আইনটির আলোকে জাতীয় শিক্ষার সকল কারিকুলাম প্রণয়ন করতে হবে।
১০. মাদরাসা-মসজিদ দাতব্য প্রতিষ্ঠানসমূহে দাতাদের দান সম্পূর্ণভাবে আয়করমুক্ত রাখার পূর্ববৎ আইন চালু অথবা নতুন বিধি-বিধান প্রণয়ন ও কার্যকর করা।
সংবাদ সম্মেলনে আরো উপস্থিত ছিলেন, সংগঠনের মহাসচিব মোস্তাকিম বিল্লাহ হামিদি, সাংগঠনিক মাওলানা দ্বীন মোহাম্মদ আশরাফ, মিডিয়া সম্পাদক মাওলানা ইমরানুল বারী সিরাজী, অর্থ সম্পাদক মুফতি নজরুল ইসলাম রহমানীসহ অন্যান্য নেতারা।




