শিক্ষক ও ব্যবস্থাপনা কমিটির যোগসাজশে প্রায় ৬০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মণিপুর উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে বড় ধরনের অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে। সরকারের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতরের (ডিআইএ) তদন্তে উঠে এসেছে, প্রতিষ্ঠানটিতে অবৈধ প্রক্রিয়ায় সাড়ে ছয় শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ দেয়া হয়েছে এবং মেরামত খাতে ৪৩৬ কোটি টাকার ব্যয়ের কোনো সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি। এছাড়া অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন খাতে প্রায় ৮৫ কোটি টাকা আত্মসাৎ, বিজ্ঞাপনে ৪ কোটি এবং মুদ্রণে সাড়ে ১১ কোটি টাকার ব্যয়ের অসংগতির তথ্যও উঠে এসেছে। তবে প্রতিষ্ঠান প্রধান দাবি করেছেন, এসব অনিয়ম ঘটেছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে।
ঢাকার নামকরা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর একটি মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজ। প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি শাখায় প্রায় ত্রিশ হাজার শিক্ষার্থী পড়ালেখা করছেন। পড়ালেখার আড়ালে যেন দুর্নীতির স্বর্গরাজ্য হয়ে উঠেছিলো প্রতিষ্ঠানটি। এমন তথ্য উঠে এসেছে, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে। প্রতিষ্ঠানটির কর্তাব্যক্তিরা প্রায় ৬০০ কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন। তদন্তে ভয়াবহ আর্থিক অনিয়ম, অবৈধ নিয়োগ ও বিধিবহির্ভূত ভাতা প্রদানের প্রমাণ পেয়েছে সংস্থাটি।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সাল থেকে ২০২৫ পর্যন্ত মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের ছয়টি শাখার কেনাকাটা, বেতন-ভাতা, উন্নয়ন ব্যয়, বিল্ডিং নির্মাণ, শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ, ঋণ জটিলতা, কর ফাঁকিসহ নানা অনিয়ম হয়েছে প্রতিষ্ঠানটিতে।
প্রতি বছরের শুরুতে জানুয়ারি মাসের টিউশন ফি, ভর্তি ও সেশন চার্জ বাবদ প্রতিষ্ঠানটিতে এককালীন আয় হয় প্রায় ৪০ কোটি টাকা। এর বাইরে প্রতি মাসে টিউশন ফি বাবদ ওঠে প্রায় ৭ কোটি টাকা। সেই হিসাবে প্রতি বছর প্রতিষ্ঠানটির আয় প্রায় ১২০ কোটি টাকা।
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের ছয়টি ক্যাম্পাসে ১২টি শিফট চালু আছে। এরমধ্যে মাত্র ৪টি শিফটের অনুমোদন আছে। বাকি ৮টি শিফটের অনুমোদন নেই। অথচ বছরের পর বছর এই শাখা ক্যাম্পাসগুলোতে শিক্ষার্থী ভর্তি, ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনা এবং টিউশন ফি আদায় করা হচ্ছে।
বিধি লঙ্ঘন করে এসব ক্যাম্পাসে প্রায় দেড় শতাধিক শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তা নিয়োগ দেয়া হয়েছে। এসব শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের বেতন-ভাতা পরিশোধে বিপুল পরিমাণ আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
আরও পড়ুন: অনিয়ম ও দুর্নীতি: কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিচ্ছে মনিপুর ও সিদ্ধেশ্বরী গার্লস কলেজ
প্রতিষ্ঠানটিতে বিধি বহির্ভূতভাবে শিক্ষক-কর্মচারী ও কর্মকর্তাদের অ্যাকাডেমিক উন্নয়ন ভাতা ও নগর ভাতা দেয়া হয়। এ দুই খাতে প্রায় ৮৮ কোটি টাকা দেয়া হয়েছে। এই অর্থ ফেরত এনে প্রতিষ্ঠানটির তহবিলে জমার সুপারিশ করতে যাচ্ছে ডিআইএ।
মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় ও কলেজের নামে ২৩০ কোটি টাকার ব্যাংক ঋণ নেয়া হয়েছে। তবে সেই অর্থ কী কারণে নেয়া হয়েছে বা কোন কোন খাতে ব্যয় করা হয়েছে তার পূর্ণাঙ্গ হিসাব দিতে পারেনি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।
এসব বিষয়ে মনিপুর উচ্চ বিদ্যালয় অ্যান্ড কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. সিরাজুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি ক্যামেরার সামনে কথা বলতে রাজি হননি। পরে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, এসব দুর্নীতির সবই হয়েছে আওয়ামী লীগের শাসনামলে।
তিনি বলেন, ‘দুর্নীতি আমাদের সময়ে হয়নি, আমি তো নতুন এসেছি আট মাস। এটা আগের সময়, আওয়ামী লীগ আমলে হয়েছে। আগস্টের আগ পর্যন্ত এগুলো হয়েছে।’
পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদফতর জানিয়েছে, প্রতিবেদন প্রায় চূড়ান্ত পর্যায়ে। শিগগিরই তা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে।
ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘মনিপুরের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা সংক্রান্ত কাজ প্রায় শেষ। খুব শিগগিরই রিপোর্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হবে। এটি কনফিডেনশিয়াল, রিপোর্ট প্রকাশের পর সব জানা যাবে।’
তবে অনিয়ম ঠেকাতে প্রতিষ্ঠানটির ছয়টি শাখাকে ছয়টি আলাদা স্কুলে রূপান্তরের সুপারিশ করতে পারে ডিআইএ; এমন তথ্যও জানা গেছে।





