পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে(পাবিপ্রবি) লোক প্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী রিয়াদ।রিয়াদের জন্ম ২০০৩ সালে, পাবনার আটঘরিয়ার এক প্রত্যন্ত গ্রাম রামচন্দ্রপুরে। জন্মের পর থেকেই জীবন তার কাছে সহজ ছিল না। সাধারণ শিশুরা যেখানে এক বছর বয়সের আগেই হাঁটতে শেখে, সেখানে রিয়াদের হাঁটতে সময় লেগেছিল আড়াই বছর। ছোটবেলায় বেড়ে উঠেছেন নানাবাড়িতে, যেখানে প্রতিনিয়ত শুনতে হতো বিদ্রুপের কথা। শারীরিক প্রতিবন্ধকতা তাকে ছোট করে দেয়নি, বরং গড়েছে এক দৃঢ়চেতা মানসিকতা।
রিয়াদের কন্ঠে প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণ শুনতে গেলে বলেন,
অদৃশ্য দেয়াল ভাঙার গল্প! প্রতিবন্ধী জীবনের বাস্তবতা ও পরিবর্তনের পথ। সমাজে অনেক দেয়াল চোখে দেখা যায় না, তবু সেগুলোই সবচেয়ে শক্ত। এই দেয়ালগুলো তৈরি হয় দৃষ্টিভঙ্গি, ভুল ধারণা আর করুণ দৃষ্টির ইট-পাথরে। প্রতিবন্ধী মানুষদের জন্য এই অদৃশ্য দেয়ালগুলোই সবচেয়ে বড় বাধা—যা শরীর নয়, মনকে বন্দি করে রাখে।
আমরা প্রায়ই ভাবি, প্রতিবন্ধী মানেই অসহায়। অথচ তারা কেউ করুণা চায় না, চায় সমান সুযোগ। একজন হুইলচেয়ার ব্যবহারকারী মানুষ যখন অফিসে যেতে গিয়ে রাস্তার সিঁড়ি পেরোতে পারে না—এটা তার অক্ষমতা নয়, আমাদের সমাজের ব্যর্থতা। একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছাত্র যদি বই না পায়, সেটা তার সীমাবদ্ধতা নয়, আমাদের অবহেলার ফল।
অদৃশ্য এই দেয়াল শুধু অবকাঠামোয় নয়, আমাদের মনেও। স্কুলে ভর্তি হতে, চাকরিতে আবেদন দিতে, বা সামাজিক অনুষ্ঠানে অংশ নিতে এখনও অনেক প্রতিবন্ধী মানুষকে বারবার “না” শুনতে হয়। এই “না” শব্দটাই তাদের সবচেয়ে বড় শত্রু। কিন্তু প্রতিবার তারা প্রমাণ করে—তাদের শরীর হয়তো ভিন্ন, কিন্তু মনের শক্তি অটুট।
“সহমর্মিতা মানে দয়া নয়, অধিকার”
এই দেয়াল ভাঙতে দরকার সচেতনতা। দরকার এমন একটি সমাজ যেখানে সহমর্মিতা মানে দয়া নয়, বরং অধিকার। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কর্মক্ষেত্র ও সরকারি দপ্তরে প্রতিবন্ধীবান্ধব পরিবেশ তৈরি করা শুধু মানবিক নয়, নাগরিক দায়িত্বও।
আজ বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে কিছু ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে—প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে অনলাইন ক্লাসে যুক্ত করা হচ্ছে, অফিসে র্যাম্প ও এলিভেটর বানানো হচ্ছে, আর তরুণ উদ্যোক্তারা তাদের সঙ্গে কাজের সুযোগ তৈরি করছেন। এই ছোট ছোট পদক্ষেপই একদিন বড় পরিবর্তনের দিকে নিয়ে যাবে।
প্রতিবন্ধী মানুষেরা সমাজের বোঝা নয়; তারা সম্ভাবনার অমিত উৎস। শুধু একটুখানি সহযোগিতা, একটুখানি দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তনই পারে সেই অদৃশ্য দেয়াল ভেঙে ফেলতে।
“আমরা অক্ষম নই, তোমাদের দৃষ্টিই সীমাবদ্ধ।”
সত্যিই, সমাজ যদি চোখ খুলে দেখে, তবে বুঝবে—
সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা শরীরে নয়, আমাদের মানসিকতায়।
উল্লেখ্য,রিয়াদ শুধু একটি নাম নয়, একটি প্রেরণার প্রতীক। তিনি প্রমাণ করেছেন, ইচ্ছাশক্তি থাকলে পাহাড়ও নত হতে পারে। তার মতো তরুণদের হাত ধরেই গড়ে উঠবে এক মানবিক, সহানুভূতিশীল বাংলাদেশ—যেখানে প্রতিবন্ধকতা কোনো অভিশাপ নয়, বরং এক নতুন শক্তির নাম।





