যারা ঢাকা থেকে সিলেট/নরসিংদী/ব্রাহ্মণবাড়িয়া/ভৈরব/কিশোরগঞ্জ এসব অঞ্চলে সড়কপথে যাতায়াত করেন, বিশেষ করে ৩০০ ফুট রাস্তা দিয়ে আসা-যাওয়া করেন, তারা কমবেশি গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা ছনপাড়া রাস্তাটি চিনে থাকবেন। ঢাকা থেকে যাওয়ার সময় ৩০০ ফুট এবং কাঞ্চন ব্রিজ পার হয়ে অল্প কিছু দূর এগুলেই বাম দিকে গ্রামের বুক চিরে ছনপাড়া রাস্তাটির অবস্থান। এই রাস্তাটির দৈর্ঘ্য ৭ কিলোমিটার এবং উক্ত রাস্তাটি গিয়ে ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের সঙ্গে মিশে গেছে। ছনপাড়া পার হয়ে ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে উঠে বামদিকে কয়েক কিলোমিটার গেলেই মাধবদী বাসস্ট্যান্ডের অবস্থান। ছনপাড়া রাস্তাটি হওয়ার কারণে ভুলতা গাউসিয়া হয়ে ঢাকা-সিলেট হাইওয়েতে ওঠার দরকার পড়ে না। অন্যদিকে ভুলতা গাউসিয়া হয়ে না গিয়ে ছনপাড়া হয়ে গেলে অনেকটা সময়ও সাশ্রয় হয়। তাই ছনপাড়া রাস্তাটি সবার কাছেই জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। আমি নিজেও বহু বছর যাবৎ এই পথ ধরেই আসা-যাওয়া করি। রাস্তাটি চালু হওয়ার শুরুর দিকে ৭ কিলোমিটার রাস্তায় মোট ৩২টি স্পিড ব্রেকার ছিল এবং রাস্তাও এখনকার চেয়ে আরও অনেক সরু ছিল। ফলে, বিশেষ করে রাতের বেলা গাড়ি চালাতে যেমন কষ্ট হতো, সময়ও লাগতো বেশি। যাই হোক, হঠাৎ একদিন দেখলাম রাস্তায় আর একটি স্পিড ব্রেকারও নেই। সেদিন সত্যি সত্যি খুব ভালো লেগেছিল এবং স্পিড ব্রেকারগুলো উঠিয়ে ফেলার কারণে অনেক খুশিও হয়েছিলাম। ৭ কিলোমিটার একটি সরু রাস্তায় ৩২টি স্পিড ব্রেকার—এটা কোনো কথা হতে পারে?
অল্প ক’দিন আগে বাড়ি থেকে রওনা হয়ে আমি যখন ছনপাড়া রাস্তায় ঢুকি, তখন রাত প্রায় ১১:৩০ মিনিট। তবে দুঃখজনক বিষয় হলো, ছনপাড়া রাস্তায় দেখি আবারও স্পিড ব্রেকার বসানো হয়েছে। প্রথম স্পিড ব্রেকারটি দেখে ভেবেছিলাম, বিশেষ কোনো কারণে হয়তোবা একটি স্পিড ব্রেকার বসানো হয়েছে। কিন্তু পরক্ষণেই দেখি ঠিক আগের মতো করেই একটু পর পর স্পিড ব্রেকার স্থাপন করা হয়েছে। তারপর রাস্তা পার হওয়ার পর আমার গাড়িচালক বলল, সে গুনে গুনে দেখেছে ২৯টি স্পিড ব্রেকার নাকি বসানো হয়েছে। যাই হোক, এবার মনে হয় একটু ভদ্রতা করে ৩২টির জায়গায় ২৯টি স্পিড ব্রেকার বসানো হয়েছে। তার মানে ৩টি স্পিড ব্রেকার কম বসানো হয়েছে। একটু পর পর এত উঁচু উঁচু স্পিড ব্রেকার বসানো হয়েছে, যার ফলে ছোট গাড়ি চলাচলে বিঘ্ন ঘটাচ্ছে। অন্যদিকে অনেক রাত হয়ে গেলে অন্ধকার, নির্জন সরু গ্রামের ভেতর দিয়ে বয়ে চলা একটি রাস্তা, যেখানে কোনো পুলিশ বা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অন্য কোনো সদস্য নেই, সেখানে চুরি-ডাকাতির সমূহ সম্ভাবনা তো থেকেই যায়। এমনকি জীবনের ঝুঁকিও থেকে যায় অনেকাংশে। এটা কেমন কথা যে, অল্প একটু রাস্তায় ৩২টি অথবা ২৯টি স্পিড ব্রেকার বসাতে হবে? আমরা আর কীভাবে প্রমাণ করব যে আসলেই আমরা একটি অসভ্য এবং পিছিয়ে পড়া জাতি? তা না হলে কোনো সভ্য দেশে এমন অসভ্য কাজ হতেই পারে না। এমনিতেই বছরের পর বছর রাস্তা প্রশস্ত করার নামে তথাকথিত ঢাকা-সিলেট হাইওয়ের আজ বেহাল দশা। তার ওপর যদি এমন ‘গোদের ওপর বিষফোড়া’ অবস্থা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ চলাচল করবে কী করে? রাস্তাঘাট, এমনকি দেশের সর্বত্র সবকিছুতে এত এত অব্যবস্থাপনা দেখে মনেই হয় না এদেশে কোনো সরকার আছে? পৃথিবী যেখানে সগৌরবে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, সেখানে রাস্তায় স্পিড ব্রেকার বসিয়ে দেশের মানুষের গতিরোধ করা হচ্ছে। কথা হলো, কার সুবিধা আর স্বার্থরক্ষা করার জন্য মাত্র ৭ কিলোমিটার একটি সরু রাস্তায় ২৯টি স্পিড ব্রেকার বসানো হলো, এটা সাধারণ মানুষ জানতে চায়। এসব অব্যবস্থাপনা দেখেও যারা এখনো নাকে তেল দিয়ে ঘুমাচ্ছেন, তাদেরকে মনে করিয়ে দিতে চাই, সাধারণ মানুষ কিন্তু আপনাদেরকে ক্ষমা করবে না। তাই অনুরোধ করছি, জনগণের মৌলিক অধিকার এবং প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করুন, সকল অব্যবস্থাপনা বন্ধ করুন, সেটা যেখানেই সংঘটিত হোক না কেন।
লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক








