ঢাকা | বৃহস্পতিবার, ২৩ এপ্রিল ২০২৬,১০ বৈশাখ ১৪৩৩

স্বাধীনতার ৫৬ বছর: জ্বালানি সার্বভৌমত্ব বিসর্জন আর এস আলম সিন্ডিকেটের লুণ্ঠনের মহাকাব্য

এআই (AI) জেনারেটেড প্রতিকী ছবি
এআই (AI) জেনারেটেড প্রতিকী ছবি

একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক মেরুদণ্ড হলো তার জ্বালানি নিরাপত্তা। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই নিরাপত্তা এখন বিদেশের মর্জির ওপর নির্ভরশীল। যে জাতি ৫৬ বছর আগে স্বাধীনতা ছিনিয়ে এনেছিল, সেই জাতি আজও জ্বালানি তেলের জন্য অন্যের মুখাপেক্ষী। এই দীর্ঘ স্থবিরতা কোনো দুর্ঘটনা নয়, বরং এটি পরিকল্পিত দুর্নীতি, ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ এবং বিশেষ কিছু ‘অলিগার্ক’ বা অসাধু ব্যবসায়ীর পকেট ভারী করার এক অশুভ আঁতাত।

পাকিস্তান আমলের ৫ বছর বনাম বাংলাদেশের ৫৬ বছর:
ইতিহাসের দিকে তাকালে এক চরম সত্য বেরিয়ে আসে। ১৯৬৩ সালে তৎকালীন সরকার চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেড (ইআরএল) নির্মাণের কাজ শুরু করে। মাত্র ১৫ কোটি ১৭ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৯৬৮ সালে এটি উৎপাদনে যায়। পাকিস্তান তার ২৩ বছরের শাসনামলে পূর্ব পাকিস্তানে একটি হলেও রিফাইনারি করে দিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো, স্বাধীনতার ৫৬ বছর পরও বাংলাদেশ রাষ্ট্র তার দ্বিতীয় একটি ইউনিট সফলভাবে চালু করতে পারেনি। গত দেড় দশকে কেবল ‘ফাইল চালাচালি’ আর ‘বাজেট বৃদ্ধির’ মহড়া চলেছে।

এস আলম সিন্ডিকেট ও ৩৫ হাজার কোটি টাকার খেলা:
২০১০-১২ সালের দিকে যখন ইআরএল-২ প্রকল্পের প্রাথমিক পরিকল্পনা হয়, তখন এর প্রাক্কলিত ব্যয় ছিল মাত্র ১১,০০০ কোটি টাকা। কিন্তু বিগত হাসিনা সরকার এই প্রকল্পটিকে সুপরিকল্পিতভাবে ঝুলিয়ে রাখে বিতর্কিত ব্যবসায়ী গোষ্ঠী এস আলম-কে লাভবান করার জন্য। শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ঠিক আগ মুহূর্তে প্রকাশ পায় যে, দরপত্র ছাড়াই এই বিশাল প্রকল্পটি এস আলম গ্রুপকে দেওয়ার চূড়ান্ত পায়তারা চলছিল। তারা খরচ বাড়িয়ে প্রকল্পটিকে প্রথমে ২৫ হাজার কোটি এবং সরকারি হিসাবে পরে তা ৩৫,৪৬৫ কোটি টাকায় নিয়ে যায়।

ব্যাংকিং খাত দখল ও অর্থায়নের অন্তরালে লুটপাট:
এস আলমের এই ‘নিজস্ব অর্থায়ন’-এর রহস্য ছিল আরও ভয়ংকর। তারা বাংলাদেশের ব্যাংকিং খাতের ওপর একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ইসলামী ব্যাংকসহ দেশের ডজনখানেক ব্যাংক দখল করে সেখান থেকে নামে-বেনামে কয়েক লক্ষ কোটি টাকা বের করে নিয়েছিল এই গোষ্ঠী। তাদের পরিকল্পনা ছিল—জনগণের আমানতের টাকা ব্যাংক থেকে সরিয়ে তা এই রিফাইনারি প্রকল্পে বিনিয়োগ দেখানো। অর্থাৎ, দেশের মানুষের টাকা দিয়েই তারা প্রকল্প করবে, আবার সেই প্রকল্পের ব্যয় কয়েকগুণ বাড়িয়ে দেখিয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা বিদেশে পাচার করবে।

ভারতের ‘অদৃশ্য হাত’ ও পাইপলাইন রাজনীতি:
প্রকল্পটি দেরিতে হওয়ার পেছনে কেবল এস আলমের দুর্নীতি নয়, বরং গভীর ভূ-রাজনৈতিক সমীকরণ ছিল। বাংলাদেশের নিজস্ব শোধনাগার না থাকায় প্রতি বছর প্রায় ৫০-৬০ লাখ টন পরিশোধিত তেল উচ্চমূল্যে বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এই বিপুল আমদানির একটি বড় অংশ এখন আসে ভারতের বিভিন্ন শোধনাগার থেকে। বিশেষ করে ভারত থেকে ডিজেল আমদানির জন্য নির্মিত পাইপলাইনটি বাংলাদেশের জন্য আশীর্বাদ নয়, বরং একটি ‘কৌশলগত শৃঙ্খল’। যদি সময়মতো ইআরএল-২ নির্মিত হতো, তবে আমরা সস্তায় অপরিশোধিত তেল এনে দেশেই ডিজেল, অকটেন ও জেট ফুয়েল তৈরি করতে পারতাম। এতে ভারতের রিফাইনারিগুলোর বিশাল ব্যবসা হারানোর ভয় ছিল।

আন্তর্জাতিক তুলনা ও বাই-প্রোডাক্টের লোকসান:
ভারতের আসামে নুমানীগড় রিফাইনারি সম্প্রসারণে ৬০ লাখ টন সক্ষমতা যোগ করতে খরচ হচ্ছে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। অথচ বাংলাদেশে তার অর্ধেক সক্ষমতার জন্য ব্যয় ধরা হয়েছিল ৩৫ হাজার কোটি টাকা। এছাড়া নিজস্ব আধুনিক শোধনাগার না থাকায় সামান্য পরিশোধনেই যেখানে কেরোসিন থেকে জেট ফুয়েল (বিমানের জ্বালানি) তৈরি সম্ভব, সেখানে আমরা চড়া দামে তা আমদানি করছি। এলপিজি, বিটুমিন এবং সালফারের মতো উপজাত পণ্য আমদানিতেও দেশ হারাচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকা।

গত ১৫ বছরে যারা এস আলমের মতো গোষ্ঠীকে অনৈতিক সুবিধা দিতে এই প্রকল্পটিকে বারবার বাধাগ্রস্ত করেছে এবং দেশের জ্বালানি নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলেছে, তাদের প্রত্যেককে জবাবদিহিতার আওতায় আনতে হবে।