একজন শিক্ষক যখন যোগ্য হবেন সেটা তার চলনে, বলনে, আচারে, ব্যবহারে, কথায়, ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের কতজন শিক্ষক এমন আছেন যাদের দেখলে এমন ব্যক্তিত্ববান মনে হবে বলে প্রশ্ন রেখেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে তার ভেরিফায়েড ফেসবুকে তিনি এসব কথা বলেন।
অধ্যাপক মামুনের ফেসবুক পোস্টটি নিচে হুবহু তুলে ধরা হলো-
বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের যেখানে যেই মানের শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া উচিত ছিল তা দেওয়া হয়নি, যেই সম্মান দেওয়া উচিত ছিল তা দেওয়া হয়নি। ফলে শিক্ষার্থীরা স্কুল থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত গড়ে কোথাও যোগ্য পায়নি। ধরুন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের ন্যূনতম শুধু পিএইচডি না সাথে অধিকাংশের পোস্ট-ডক অভিজ্ঞতা থাকা উচিত ছিল। অথচ ১৫০ এর অধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে মোট ১৬৮০০ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মাঝে মাত্র ৬৪০০ শিক্ষকের পিএইচডি আছে। বাকি ১০২০০ শিক্ষকের পিএইচডি নাই। তারপরেও কি আমরা এইসব প্রতিষ্ঠানকে বিশ্ববিদ্যালয় বলব? এর মানে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে অন্তত ১০ হাজার শিক্ষকের ঘাটতি আছে। আমরা যদি ১০ হাজার যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ দিতে পারি দেশের উচ্চ শিক্ষার মান কেমন হবে ভাবতে পারছেন। সংখ্যা নয় আমাদের এখন মান বৃদ্ধিতে মনোযোগ দেওয়া উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসে কোন বয়সের ছেলেমেয়েরা? ন্যূনতম ১৯ বছরের বেশি বয়স বা তার বেশি বয়সের। আর মাস্টার্সের একজন ছাত্রের বয়স প্রায় ২৪-৩০ বছর। সুতরাং এই ছাত্রদের পড়াতে হলে শিক্ষকদের শিক্ষা, গবেষণা ও বয়সে ২৪ থেকে ৩০-৩২ বছরের শিক্ষার্থীর বয়স থেকে বেশি হতে অন্তত ৪-৫ বছর বেশি হতে হয়। শিক্ষা, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও বয়সে যখন বড় হয় তখন শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর মাঝে একটা ঢাল তৈরি হয়। পানির প্রবাহের জন্য যেমন ঢাল লাগে তেমনি জ্ঞানের প্রবাহের জন্যও শিক্ষা, গবেষণা, অভিজ্ঞতা ও বয়সের ঢাল লাগে। একজন শিক্ষক যখন যোগ্য হবে সেটা তার চলনে, বলনে, আচারে, ব্যবহারে, কথায়, ব্যক্তিত্ব প্রকাশিত হয়। বাংলাদেশের কতজন শিক্ষক এমন আছে যাদের দেখলে এমন ব্যক্তিত্ববান মনে হবে। আমাদের শিক্ষার্থীরা কি এমন মানের শিক্ষক পাচ্ছে?
আরেকটা সমস্যা হলো বাংলাদেশের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরিবেশটাই এমন যেখানে কেউ একবার পিএইচডি করে ফেলতে পারলে ভাবে মঞ্জিলে মকসুদ পুরো হয়ে গেছে। নিজেকে আর উন্নত করার কোন তাগিদ অনুভব করে না। লেখাপড়ার দিক থেকে অবসরে চলে যাওয়ার মত হয়ে যান। এরপর থেকে কেবল প্রশাসনিক পদ পাওয়ার জন্য মুখিয়ে থাকে। এই মুহূর্তে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অনেক ভিসি, প্রোভিসি, ডিন, প্রভোস্ট আছেন যারা পিএইচডি করেছেন ৫-৮ বছর হয়েছে। এই সময়টা নিজে গবেষণা করা ও ছাত্রছাত্রীদের গবেষণা করানোর বয়স। এই সময়টা মাত্র শিক্ষক হয়ে উঠার সময়। আর সেই সময়েই প্রশাসনিক পদ পেতে মরিয়া। এমনিতেই আমাদের খবুই কম সংখ্যক পিএইচডি ডিগ্রিধারী যোগ্য শিক্ষক আছেন। তাদের একটা অংশ যারা একটু অধিকতর ভালো তারা প্রশাসনিক পদে চলে যায় তাহলে গবেষণা করানো ও শ্রেণিকক্ষে পড়ানোর মত যোগ্য ভালো শিক্ষকের অভাবটা আরও বেড়ে যায়।
আমি লক্ষ করেছি আমাদের বিসিএস শিক্ষা ক্যাডার হউক আর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক অধিকাংশের মধ্যে প্রশাসনিক পদের জন্য মুখিয়ে থাকে। প্রশাসনিক পদ পেতে তোষামোদি থেকে শুরু করে যা করা লাগে অনেকেই সেটা করতেও একটুও কার্পণ্য করে না। যেমন ধরেন আবাসিক হলের প্রভোস্ট। এইটা কোন পদ? এইটা হলো হোটেলের ম্যানেজারের দায়িত্বের চেয়েও খারাপ। আবাসিক হল শিক্ষকরা চালাবে কেন? কারণ আমাদের ছাত্ররা প্রকৃত ছাত্র না। আমরা মনে করি শিক্ষকরা ছাড়া কর্মকর্তাদের কথা আমাদের ছাত্ররা মানবে না। শুধু এই কারণে আমাদের কত শিক্ষকের কত কর্মঘন্টার অপচয় হচ্ছে বুঝতে পারছেন। আমাদের শিক্ষার্থীরা যদি সত্যিকারের সিসোভিয় ছাত্র হতো তাহলে কয়েকজন কর্মকর্তা এবং ছাত্ররা নিজেরাই দায়িত্ব নিয়ে আবাসিক হল চালাতে পারতো। তাহলে আমাদের বিরাট অংশের শিক্ষকদের সময়ের অপচয় থেকে রক্ষা করে তাদের দিয়ে শ্রেণিকক্ষের পাঠদান ও গবেষণায় ব্যয় করাতে পারতাম।
আমাদের শিক্ষকদের আরেকটা বড় অপচয় হলো অন্যত্র পার্টটাইম পড়ানো বা রাজনীতিতে ব্যস্ত থাকা। এইটা আমাদের শিক্ষকদের নৈতিকতাকেও আঘাত করেছে। ছাত্ররা দেখে যেই শিক্ষক তার নিজের প্রতিষ্ঠানের শ্রেণিকক্ষে এত নিরামিষ সেই একই শিক্ষক প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পার্ট-টাইম পড়াতে গিয়ে এত আমিষ কিভাবে হয়? যেই শিক্ষার্থী এইটা বুঝে ফেলবে সেই শিক্ষার্থী কি আর সেই শিক্ষককে সম্মান শ্রদ্ধা করবে? এইসব সমস্যা যতদিন না আমরা সমাধান করব বাংলাদেশের উচ্চশিক্ষার মান ততদিন ভাগাড়েই পড়ে থাকবে। ভাবুন কোন এক জাদুবলে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছয় মাসের মধ্যে ১০ হাজার পিএইচডি ডিগ্রিধারী শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া হলো যার মধ্যে ৩০০০ শিক্ষক উচ্চমানের বিদেশি। তখন কি আমাদের ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য আর বিদেশে যাওয়া লাগবে? কত লাখ কোটি টাকা সাশ্রয় হবে? এক লাফে ব্রেইন ড্রেইন অনেক কমে যাবে। দেশের চেহারা পাল্টে যাবে।







