ঢাকা | শনিবার, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৪ আশ্বিন ১৪৩৩

নতুন স্কেলে আপনার বেতন কত বাড়ল, হিসাব করবেন যেভাবে

দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নতুন বেতনকাঠামোর প্রজ্ঞাপন জারি করেছে সরকার। এতে কোন গ্রেডের বেতন কত হবে, তার হিসাব দেওয়া হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জারি করা জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর প্রজ্ঞাপনে পুরোনো বেতন থেকে নতুন বেতন নির্ধারণ বা ‘পে ফিক্সেশন’-এর বিধানও দেওয়া হয়েছে।

নতুন বেতন কাঠামো কার্যকর হবে চলতি বছরের ১ জুলাই থেকে। প্রজ্ঞাপনে জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫-এর প্রতিটি গ্রেডের বিপরীতে ২০২৬ সালের সংশ্লিষ্ট বেতন স্কেলও দেওয়া হয়েছে। নতুন বেতনকাঠামোয় গ্রেডভেদে সরকারি চাকরিজীবীদের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হয়েছে। এর মধ্যে ১ থেকে ১১ নম্বর গ্রেডে মূল বেতন ১০০ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। গ্রেড ১২ থেকে ২০ পর্যন্ত বাড়ানোর হার ১১৫ থেকে ১৪২ শতাংশ।

বিদ্যমান ২০টি গ্রেড রেখে বেতন বাড়ানো হয়েছে। যেখানে সর্বনিম্ন মূল বেতন ২০ হাজার টাকা (২০তম গ্রেড) এবং গ্রেড ১–এ সর্বোচ্চ ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা (মন্ত্রিপরিষদ, মুখ্য সচিব ও সিনিয়র সচিব বাদে)।

এখন একজন চাকরিজীবীর জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, নতুন বেতন স্কেলে তাঁর বেতন আসলে কত হবে?

নতুন বেতন নির্ধারণের প্রথম ধাপ হলো, পুরোনো মূল বেতন জানা। প্রজ্ঞাপনে ‘বর্তমান বেতন’ বলতে গত ৩০ জুন পর্যন্ত জাতীয় বেতন স্কেল ২০১৫ অনুযায়ী পাওয়া বেতনকে বোঝানো হয়েছে। অর্থাৎ শুধু একজন কর্মচারীর গ্রেড জানলেই নতুন বেতন বের করা যাবে না। ৩০ জুন তাঁর মূল বেতন কত ছিল, সেটিও জানতে হবে।

উদাহরণ হিসেবে একই গ্রেডের দুই কর্মকর্তার কথা ধরা যেতে পারে। একজন ওই গ্রেডে কয়েক বছর ধরে আছেন এবং ইতিমধ্যে একাধিক বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট পেয়েছেন। অন্যজন সম্প্রতি ওই গ্রেডে এসেছেন। দুজন একই গ্রেডের কর্মকর্তা হলেও ৩০ জুন তাঁদের মূল বেতন এক নয়। ফলে নতুন স্কেলেও তাঁদের বেতন একই অঙ্কে নির্ধারিত হবে না।

নতুন বেতন স্কেলের ছকে প্রতিটি গ্রেডের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত একাধিক বেতনের ধাপ রয়েছে। এখানেই একটি সম্ভাব্য ভুল–বোঝাবুঝি তৈরি হতে পারে। কোনো গ্রেডের নতুন প্রারম্ভিক বেতন যে অঙ্কে নির্ধারণ করা হয়েছে, ওই গ্রেডে বর্তমানে কর্মরত প্রত্যেক কর্মকর্তা বা কর্মচারীর নতুন মূল বেতন সেই অঙ্ক হবে, বিষয়টি এমন নয়।

একজন চাকরিজীবীর অবস্থান নতুন বেতনক্রমের কোন ধাপে হবে, সেটি নির্ধারিত হবে ‘পে ফিক্সেশন’ বিধান অনুযায়ী। প্রজ্ঞাপনে এ জন্য পৃথক বিধান রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের বিষয়েও নিয়ম রয়েছে।

নিজের নতুন বেতন জানতে একজন চাকরিজীবীকে কয়েকটি তথ্য সামনে রাখতে হবে। প্রথমত, ৩০ জুন তাঁর মূল বেতন কত ছিল। দ্বিতীয়ত, তিনি কোন গ্রেডে ছিলেন। তৃতীয়ত, ২০২৬ সালের বেতন স্কেলে তাঁর গ্রেডের সংশ্লিষ্ট নতুন বেতনক্রম কোনটি। এরপর প্রজ্ঞাপনে দেওয়া বেতন নির্ধারণের বিধান প্রয়োগ করে নতুন মূল বেতন বের করতে হবে।

দুই পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণ


মূলত দুটি পদ্ধতিতে বেতন নির্ধারণের কথা হয়েছে নতুন প্রজ্ঞাপনে। প্রথম পদ্ধতি বর্তমান বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন আহরণকারী কোনো কর্মচারীর বেতন জাতীয় বেতন স্কেল-২০২৬-এর অনুরূপ স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপেই নির্ধারিত হবে।

এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ৩০ জুন একজন কর্মচারী ৯ হাজার ৩০০ টাকা থেকে ২২ হাজার ৪৯০ টাকা বেতন স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে অর্থাৎ ৯ হাজার ৩০০ টাকা মূল বেতন পেতেন। তিনি ১৬তম গ্রেডের কর্মচারী।

এ ক্ষেত্রে নতুন বেতন কাঠামোয় ১ জুলাই থেকে ১৬তম গ্রেডের বেতন স্কেল ২১ হাজার ৯০০ টাকা থেকে ৫২ হাজার ৯০০ টাকা। প্রারম্ভিক ধাপ অর্থাৎ ২১ হাজার ৯০০ টাকা তাঁর মূল বেতন নির্ধারণ করা হবে।

অর্থাৎ পুরোনো স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপে বেতন থাকলে নতুন স্কেলেরও প্রারম্ভিক ধাপে বেতন নির্ধারিত হবে।

দ্বিতীয় পদ্ধতিতে কোনো কর্মচারীর মূল বেতন যদি বর্তমান বেতন স্কেলের সংশ্লিষ্ট স্কেলের সর্বনিম্ন ধাপের চেয়ে বেশি হয়, তাহলে প্রথমে বর্তমান বেতন ও ওই স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের মধ্যকার পার্থক্য নির্ণয় করতে হবে। এরপর সেই পার্থক্য অনুরূপ স্কেলের অর্থাৎ জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে যোগ করতে হবে।

যোগফল যদি নতুন স্কেলের কোনো ধাপের সমান হয়, তাহলে ওই ধাপেই বেতন নির্ধারিত হবে। আর যদি অনুরূপ স্কেলে ওই অঙ্কের সমান কোনো ধাপ না থাকে, তাহলে পরবর্তী উচ্চতর ধাপে তাঁর বেতন নির্ধারণ করতে হবে।

এ ক্ষেত্রে উদাহরণ হিসেবে ধরা যাক, ৩০ জুন পর্যন্ত একজন কর্মচারীর ইনক্রিমেন্টসহ মূল বেতন ছিল ১৩ হাজার ৭৯০ টাকা। তাঁর বর্তমান বেতন স্কেলের ধাপ হলো ১২,৫০০-১৩, ১৩০-১৩, ৭৯০…৩০, ২৩০ টাকা।

এখন ১ জুলাই থেকে ওই কর্মচারীর জন্য অনুরূপ নতুন বেতন স্কেল হলো ২৫,০০০-২৬,৩০০…৬০,৫০০ টাকা।

এখন হিসাবটি হবে এভাবে—


বর্তমান বেতন স্কেলে প্রাপ্ত মূল বেতন থেকে একই স্কেলের প্রারম্ভিক ধাপের বেতন বিয়োগ দিলে পার্থক্য হবে: ১৩,৭৯০-১২,৫০০ = ১,২৯০ টাকা।

অতএব জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬-এর প্রারম্ভিক ধাপের সঙ্গে এই ১২৯০ টাকা যোগ করতে হবে। হিসাবটি হবে ২৫,০০০ + ১,২৯০ = ২৬,২৯০ টাকা। কিন্তু অনুরূপ স্কেলে ২৬ হাজার ২৯০ টাকা নামে কোনো ধাপ নেই। তাই পরবর্তী উচ্চতর ধাপে অর্থাৎ ২৬ হাজার ৩০০ টাকা বেতন নির্ধারিত হবে।

অবশ্য মন্ত্রিপরিষদ সচিব ও প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিবের মূল নির্ধারিত বেতন ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা, সিনিয়র সচিবের ১ লাখ ৬৪ হাজার টাকা এবং গ্রেড ১-এর ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা ও সমমর্যাদার পদের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে এ দুই পদ্ধতি প্রযোজ্য হবে না। কারণ, তাঁদের মূল বেতন নির্ধারিত; আর বাড়বে না।

অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকা ব্যক্তিদের হিসাব যেভাবে


যে কর্মচারী প্রেষণে (নিজ দপ্তরের পরিবর্তে অন্য দপ্তরে চাকরি) কর্মরত আছেন, প্রেষণে কর্মরত না থাকলে তিনি তাঁর মূল অফিস বা প্রতিষ্ঠানে যে বেতন পাওয়ার অধিকারী হতেন, সেই ভিত্তিতে তাঁর বেতন নির্ধারণ করা হবে।

এভাবে ছুটিতে, সাময়িক বরখাস্ত, অবসর-উত্তর ছুটিতে থাকলে কীভাবে বেতন নির্ধারণ করা হবে, তার নিয়মও বলা হয়েছে নতুন প্রজ্ঞাপনে।

প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যে কর্মচারীর অবসর-উত্তর ছুটি ৩০ জুন শেষ হয়েছে এবং ১ জুলাই অবসরে গেছেন, তিনি ১ জুলাই থেকে কার্যকর হওয়া জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬ অনুযায়ী বেতন নির্ধারণের সুবিধা পাবেন না।

কোনো স্থায়ী কর্মচারী পদোন্নতি ছাড়াই একই পদে আট বছর পূর্ণ করলে এবং চাকরি সন্তোষজনক হলে, স্বয়ংক্রিয়ভাবে নবম বছরে তাঁর পদের মূল স্কেলের পরবর্তী উচ্চতর গ্রেডে বেতন পাবেন। তবে উচ্চতর গ্রেড পাওয়া পদোন্নতি হিসেবে বিবেচিত হবে না।

এভাবে বেতন নির্ধারণ করার বিভিন্ন নিয়মকানুন বলা হয়েছে প্রজ্ঞাপনে।