ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৬ জুন ২০২৬,২ আষাঢ় ১৪৩৩

ব্রিটিশ উচ্চশিক্ষায় বড় বিপদের পূর্বাভাস

যুক্তরাজ্যের শিল্পকলা, মানবিক ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের জন্য অন্যতম খ্যাতনামা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ের গোল্ডস্মিথসের কর্মীরা আবারো ধর্মঘট শুরু করেছেন। এবারের ধর্মঘটটি অনির্দিষ্টকালের। মূলত ২ কোটি ৯৫ লাখ ডলার সাশ্রয়ের উদ্দেশ্যে বড় ধরনের কর্মী ছাঁটাইসহ কর্তৃপক্ষের আরো একটি পুনর্গঠন পরিকল্পনার প্রতিক্রিয়ায় তারা এই পদক্ষেপ নিয়েছেন। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটির এক-পঞ্চমাংশের বেশি কর্মী চাকরি হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছেন। বিগত পাঁচ বছরে গোল্ডস্মিথস কর্তৃপক্ষের প্রস্তাবিত এটি তৃতীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া।

সর্বশেষ এই পুনর্গঠন প্রচেষ্টার প্রতিবাদে ‘ইউনিভার্সিটি অ্যান্ড কলেজ ইউনিয়ন’ (ইউসিইউ)-এর গোল্ডস্মিথস শাখা গত ২৭ এপ্রিল থেকে প্রথম খাতা মূল্যায়ন ও পরীক্ষা বর্জন শুরু করে। এর উদ্দেশ্য ছিল বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তাদের প্রধান সম্পদ শিক্ষক ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাইয়ের বিকল্প কোনো পথ খুঁজতে চাপ দেওয়া।

এর জবাবে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ বর্জন কর্মসূচিতে অংশ নেওয়া কর্মীদের শতভাগ বেতন কাটার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা সাফ জানিয়ে দেয়, আংশিক কাজ তারা গ্রহণ করবে না এবং এর বাইরে করা যেকোনো কাজ স্বেচ্ছাসেবী হিসেবে গণ্য হবে। এর পরিপ্রেক্ষিতে গত ৮ জুন থেকে অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘটের ডাক দেয় ইউসিইউ।

গোল্ডস্মিথসের বর্তমান এই সংকটের একটি ইতিহাস রয়েছে। পাঁচ বছর আগে অতিমারির পর বিশ্ববিদ্যালয়কে আর্থিক দিক থেকে শক্তিশালী অবস্থানে ফেরানোর কথা বলে ‘রিকভারি প্রোগ্রাম’ নামের একটি পুনর্গঠন কর্মসূচি হাতে নেওয়া হয়েছিল। এর মাধ্যমে ৭ দশমিক ৬ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় হলেও ইতিহাস, ইংরেজি এবং ক্রিয়েটিভ রাইটিং বিভাগকে লক্ষ্য করে ৫২টি পদ বিলুপ্তির উদ্যোগ নেওয়া হয়। পরে ইউসিইউ ধর্মঘট ও প্রচারণার মাধ্যমে তা ১৭টিতে নামিয়ে আনে।

ওই সময় কর্তৃপক্ষ লয়েডস এবং ন্যাটওয়েস্ট ব্যাংকের সঙ্গে চুক্তি করে ৬০ মিলিয়ন পাউন্ডের সমান্তরাল ও ব্যয় সংকোচনের শর্তে একটি ছোট ক্রেডিট সুবিধা নেয়। তারা প্রশাসনকে কেন্দ্রীভূত করে, যা শিক্ষার্থী ও কর্মীদের সহায়তার পথ সংকুচিত করে। এ ছাড়া শিক্ষা কার্যক্রমের আর্থিক মূল্য নির্ধারণে হিসাবরক্ষণ প্রতিষ্ঠান ‘কেপিএমজি’-কে পরামর্শক নিয়োগ করা হয়।

সম্প্রতি ইউনিয়নের তথ্যের অধিকার (এফওআই) আবেদনের মাধ্যমে জানা গেছে, ২০১৯ সাল থেকে বেসরকারি পরামর্শক, আইনি ফি এবং নিয়োগকারী সংস্থাকে ১৪ মিলিয়ন পাউন্ডের বেশি দিয়েছে কর্তৃপক্ষ, যার মধ্যে কেপিএমজি-ই পেয়েছে ২ দশমিক ৭ মিলিয়ন পাউন্ড।

প্রথম পুনর্গঠনের ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষে ‘ট্রান্সফরমেশন প্রোগ্রাম’ নামের দ্বিতীয় পুনর্গঠন চাপিয়ে দেওয়া হয়। এতে ১৮টি একাডেমিক বিভাগের মধ্যে ১১টি বিভাগকে লক্ষ্য করে ১৩০টির বেশি পদ ঝুঁকিতে পড়ে। শেষ পর্যন্ত ৬২ জন কর্মীকে ছাঁটাই করে ১৬ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয় করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি অকার্যকর হয়ে পড়ে। প্রতিটি পুনর্গঠনকে সংকটের সমাধান হিসেবে দেখানো হলেও তা মূলত প্রতিষ্ঠানটিকে আরো দুর্বল করেছে।

এখন ‘ফিউচার গোল্ডস্মিথস’ নামের এই তৃতীয় পুনর্গঠন প্রক্রিয়া প্রতিষ্ঠানটিকে আরো বড় সংকটের দিকে ঠেলে দিতে পারে। অন্তর্বর্তী ভাইস চ্যান্সেলর (যার নিজের বেতন ২ লাখ ৪০ হাজার পাউন্ড) চলমান আর্থিক বাস্তবতা মেনে না নেওয়ার জন্য ধর্মঘটি কর্মীদের দায়ী করেছেন।

ইতোমধ্যে পদোন্নতি বাতিল এবং টিচিং অ্যাসিস্ট্যান্টদের বাজেট কমানো হয়েছে। তবে আগের পুনর্গঠন থেকে সাশ্রয় হওয়া ২৪ মিলিয়ন পাউন্ড কোথায় গেছে, তার কোনো সদুত্তর পাওয়া যায়নি এবং অব্যবস্থাপনার জন্য দায়ী সিনিয়র ম্যানেজারদের উচ্চ বেতন বহাল রাখা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

যুক্তরাজ্যের উচ্চশিক্ষা খাতের সামগ্রিক সংকট

গোল্ডস্মিথসের এই পরিস্থিতি কোনো ব্যতিক্রম নয়, বরং এটি যুক্তরাজ্যের ব্যর্থ জাতীয় অর্থায়ন মডেলের একটি স্পষ্ট উদাহরণ। ব্রিটিশ বিশ্ববিদ্যালয় ব্যবস্থার এই সংকট সরাসরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিকীকরণের সঙ্গে যুক্ত। ১৯৯৮ সালে টিউশন ফি প্রবর্তন, ২০০৬ সালে তা ৩ হাজার পাউন্ড পর্যন্ত বৃদ্ধি এবং ২০১২ সাল থেকে তা সর্বোচ্চ ৯ হাজার পাউন্ড করার মাধ্যমে সরকারের সরাসরি অর্থায়নের জায়গাটি শিক্ষার্থীদের ফির ওপর নির্ভরশীল করা হয়। ২০১৫ সালে শিক্ষার্থী সংখ্যার নিয়ন্ত্রণ তুলে নেওয়ার পর বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতা আরো তীব্র হয়, যার ফলে নামী বিশ্ববিদ্যালয়গুলো বেশি শিক্ষার্থী পেলেও বাকিরা সংকটে পড়ে।

এক দশক পর এই সংকট এখন স্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। সম্প্রতি নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় ২ হাজার ৭০০ কর্মীকে ছাঁটাইয়ের ঝুঁকির নোটিশ দেওয়ায় ইউনিয়ন ৬১ দিনের ধর্মঘটের ডাক দিয়েছে। সাসেক্স ২০০ এবং এসেক্স ৪০০ কর্মী ছাঁটাইয়ের প্রস্তাব করেছে। শেফিল্ড হালাম ২৬ মিলিয়ন পাউন্ড সাশ্রয়ের জন্য ১৩০ জন কর্মী ছাঁটাই করতে চায়। এমনকি আর্থিক সংকটে না থাকা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোও আর্টস ও হিউম্যানিটিজ বিভাগের বাজেট কাটছাঁট করছে। কনজারভেটিভ সরকারের আমলে স্টুডেন্ট ভিসায় পরিবর্তনের কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীদের সংখ্যাও হ্রাস পেয়েছে, যাদের ফি বিশ্ববিদ্যালয়ের টিকে থাকার জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

অফিস ফর স্টুডেন্টস (ওএফএস)-এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ১১৯টি বিশ্ববিদ্যালয় ঘাটতির কথা জানিয়েছে এবং এমপিরা সতর্ক করেছেন যে আগামী ১২ মাসের মধ্যে ২৪টি বিশ্ববিদ্যালয় দেউলিয়া বা বন্ধের সম্মুখীন হতে পারে। ২০১০ সালের লর্ড ব্রাউনের প্রতিবেদনে প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশের কারণে কিছু প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার ঝুঁকির কথা আগেই উল্লেখ করা হয়েছিল, যাকে ওএফএস ‘মার্কেট এক্সিট’ বা বাজার থেকে বিদায় বলে অভিহিত করেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, ২০১০ সালের আগের সরাসরি সরকারি অর্থায়ন ব্যবস্থার মাধ্যমে উচ্চশিক্ষার গুরুত্ব ও অর্থনীতিতে এর অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হতো। কিন্তু বর্তমান সরকারের পুরো মনোযোগ এখন জাতীয় নিরাপত্তা এবং যুদ্ধের প্রস্তুতির দিকে। তা ছাড়া ২০০৮ সালের আর্থিক সংকটের পর থেকে উচ্চশিক্ষা খাতের কর্মীদের প্রকৃত বেতন প্রায় ২৫ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে এবং অস্থায়ী নিয়োগের প্রবণতা বাড়ছে।

তবে এই সংকট অপরিবর্তনীয় নয়। সরকার চাইলে এই খাতে অর্থায়ন করতে পারে এবং গোল্ডস্মিথস কর্তৃপক্ষও তাদের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে পারে। তবে চাপ সৃষ্টি ছাড়া তা সম্ভব নয়। বর্তমানে গোল্ডস্মিথসের কর্মীরা চাকরি, ডিগ্রি প্রোগ্রাম এবং শিক্ষার আদর্শ রক্ষা করতে এই অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট অব্যাহত রেখেছেন।

সূত্র: আলজাজিরা