ঢাকা | রবিবার, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

বাঁচার মতো বাঁচতে হলে গাধার মতো খাটতে হবে!

রিজিকের মালিক আল্লাহ—এই সত্যকে অস্বীকার করার দুঃসাহসই বা কার আছে? নিঃসন্দেহে আমাদের জীবিকার ব্যবস্থা তিনিই করেন। কিন্তু তাই বলে কি বসে থাকলেই ঘরে খাবার চলে আসবে? নিশ্চয়ই নয়। রিজিকের মালিক আল্লাহ হলেও সেই রিজিক অর্জনের জন্য মানুষকে চেষ্টা করতে হয়, পরিশ্রম করতে হয় এবং নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ করে যেতে হয়।

আমি এখানে সোনার চামচ মুখে নিয়ে জন্ম নেওয়া রাজকুমার-রাজকুমারীদের কথা বলছি না। বলছি আমার মতো শূন্য হাতে ঘর থেকে বের হওয়া মানুষদের কথা—যাদের জীবনে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পেছনে ছিল পরিশ্রম, সংগ্রাম, ত্যাগ আর নিরন্তর ছুটে চলা।

কতদিন পর্যন্ত কাজ করে যেতে হবে—এর কোনো নির্দিষ্ট সীমা আছে বলে আমার জানা নেই। চাকরির ক্ষেত্রে হয়তো একটি নির্দিষ্ট বয়সে অবসরের নিয়ম রয়েছে। কিন্তু চাকরি থেকে অবসর নেওয়া মানেই হাত-পা গুটিয়ে ঘরে বসে থাকা কিংবা সারাদিন চায়ের দোকানে আড্ডা দেওয়া—এমনটা কখনোই হওয়া উচিত নয়। বরং অবসরের পরও নিজের সামর্থ্য ও শারীরিক সক্ষমতা অনুযায়ী কোনো না কোনো সৃজনশীল কাজে যুক্ত থাকা উচিত।

কারণ, যতদিন বেঁচে আছি, ততদিন তো আমাকে খেতে হবে, চলতে হবে, নিজের ও পরিবারের প্রয়োজন মেটাতে হবে। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত পরিবারের জন্য কিছু করার প্রয়োজনও হতে পারে। তাই শরীর যতদিন সায় দেয়, ততদিন কাজ করে যাওয়াই আমার কাছে জীবনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দর্শন।

তবে কাজ করতে হলে সবার আগে নিজের শরীর ও মনের যত্ন নিতে হবে। কারণ—শরীর ও মন ঠিক তো সব ঠিক। সুস্থ শরীর এবং প্রফুল্ল মন থাকলে মানুষ অনেক বেশি কর্মক্ষম, আত্মবিশ্বাসী ও ইতিবাচক থাকে।

লক্ষ্য করলে দেখা যাবে, কাজপাগল মানুষগুলো সাধারণত এমনিতেই বসে থাকতে পারে না। তারা কিছু না কিছু করতে চায়, ব্যস্ত থাকতে চায়, নতুন কিছু শিখতে চায়। অন্যদিকে যারা দীর্ঘদিন কর্মহীন ও অলস জীবনযাপন করে, তাদের অনেকেই অল্প বয়সেই যেন বুড়িয়ে যায়। অর্থাৎ কর্মের সঙ্গে সুস্থতারও একটি গভীর যোগসূত্র রয়েছে।

মো. কাওছার আলম চৌধুরী

কাজের মধ্যে থাকলে শরীরের পাশাপাশি মনও সক্রিয় থাকে। নিয়মিত চলাফেরা, চিন্তাভাবনা, দায়িত্ব পালন এবং মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ—সবকিছুই মানুষকে সচল রাখে। আর কর্মব্যস্ত মানুষের জীবনে অন্যায়, অপকর্ম, পরনিন্দা ও পরচর্চার সময়ও তুলনামূলকভাবে কম থাকে।

একটি বহুল প্রচলিত কথা আছে—“অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।” কথাটি কে, কতকাল আগে বলেছিলেন, তা আমার জানা নেই। তবে কথাটির বাস্তব মূল্য যে অপরিসীম, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমরা বাস্তব জীবনেই এর প্রতিফলন দেখতে পাই। যাদের কোনো কাজ নেই, দায়িত্ব নেই, লক্ষ্য নেই—তাদের অনেকেই এখানে-সেখানে আড্ডা দিয়ে সময় কাটায়। ধীরে ধীরে তারা পরনিন্দা, পরচর্চা, অন্যের সমালোচনা কিংবা অন্যের ক্ষতি করার চিন্তায় জড়িয়ে পড়ে। অথচ একজন কর্মব্যস্ত মানুষ তার সময়, মেধা ও শক্তিকে নিজের এবং সমাজের কল্যাণে কাজে লাগানোর সুযোগ পায়।

তাই হায়াত ও রিজিকে বেঁচে থাকলে এবং বড় কোনো শারীরিক অসুস্থতা জীবনকে থামিয়ে না দিলে, শরীর যতদিন অনুমতি দেয় ততদিন কোনো না কোনো ভালো কাজে নিজেকে যুক্ত রাখা উচিত। কাজ শুধু অর্থ উপার্জনের মাধ্যম নয়; কাজ মানুষকে বাঁচিয়ে রাখে, আত্মমর্যাদা দেয়, মানসিকভাবে শক্ত রাখে এবং জীবনের প্রতি আগ্রহ ধরে রাখে।

এর পাশাপাশি আরেকটি অভ্যাস জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেওয়া উচিত—প্রচুর বই পড়া। একবার বইয়ের সঙ্গে প্রেম করে দেখুন, দেখবেন সেই প্রেম কতটা গভীর এবং আনন্দময় হতে পারে। বই মানুষের চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করে, জ্ঞান বাড়ায়, মনকে পরিশীলিত করে এবং একাকিত্বের সবচেয়ে ভালো সঙ্গী হয়ে ওঠে।

আর যার যার ধর্মবিশ্বাস অনুযায়ী ধর্মীয় অনুশাসন ও উপাসনাও চালিয়ে যেতে হবে। কারণ, আমি যদি বিশ্বাস করি এই বিশাল বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের একজন সৃষ্টিকর্তা ও মালিক আছেন, যিনি সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করেন এবং একদিন আমাদের সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে—তাহলে তাঁর নির্দেশিত পথে চলার চেষ্টাও আমাদের জীবনের অপরিহার্য অংশ হওয়া উচিত।

জীবন আসলে থেমে থাকার নাম নয়। জীবন মানেই চলা, শেখা, কাজ করা, নিজেকে ভালো রাখা, অন্যের উপকার করা এবং সৃষ্টিকর্তার প্রতি দায়িত্বশীল থাকা।

তাই বাঁচার মতো বাঁচতে হলে শুধু বেঁচে থাকলেই হবে না—কর্মের মধ্যে থাকতে হবে, শরীর ও মনকে সচল রাখতে হবে, বই পড়তে হবে, ভালো কাজ করতে হবে এবং নিজের বিশ্বাস অনুযায়ী সৃষ্টিকর্তার স্মরণে থাকতে হবে।

পৃথিবীর প্রতিটি মানুষ সুস্থ থাকুক, কর্মের সঙ্গে যুক্ত থাকুক, সৎ ও সুন্দর জীবনযাপন করুক—এই হোক আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক