ঢাকা | রবিবার, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬,২২ ভাদ্র ১৪৩৩

অশালীন প্রতিবাদ গ্রহণযোগ্য নয়, তবে ক্ষোভের কারণও উপেক্ষণীয় নয়

একটি স্বৈরাচারী শাসনের পতনের পর তুলনামূলক গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে নতুন একটি রাজনৈতিক শক্তি দেশের দায়িত্বভার গ্রহণ করেছে। কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে—জনগণের কাছে যে প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশার কথা বলে তারা ক্ষমতায় এসেছে, তার কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পেরেছে?

বর্তমান বাস্তবতায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা নানা কারণে কঠিন হয়ে উঠেছে। রাস্তাঘাট ও ফুটপাত দখল, সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সংকট—এসব নিয়ে মানুষের ক্ষোভ ক্রমেই বাড়ছে। গ্যাসের সংকটে অনেক শিল্পকারখানার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে কিংবা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে। অন্যদিকে বিদ্যুৎ সরবরাহের অনিয়ম এবং বিদ্যুৎ, তেল ও গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি সাধারণ মানুষের ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করছে।

সব মিলিয়ে দেশের সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা ও ক্ষোভ তৈরি হওয়া অস্বাভাবিক নয়।

বিদ্যুৎ বিল নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে সিফাত নামের এক তরুণ ফেসবুক লাইভে এসে তার ক্ষোভ ও হতাশার কথা প্রকাশ করেছে। একপর্যায়ে সে সরকার ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজও করেছে।

প্রথমেই পরিষ্কার করে বলতে চাই—অশালীন গালিগালাজ কোনোভাবেই প্রতিবাদের গ্রহণযোগ্য ভাষা হতে পারে না। একজন নাগরিকের ক্ষোভ, হতাশা কিংবা প্রতিবাদ করার অধিকার অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু সেই প্রতিবাদ হতে হবে শালীন, যুক্তিনির্ভর ও দায়িত্বশীল।

সিফাত হয়তো জানত, তার এমন বক্তব্যের কারণে তাকে গ্রেপ্তার করা হবে। তারপরও সে ভয়ভীতিকে উপেক্ষা করে প্রকাশ্যে তার ক্ষোভ প্রকাশ করেছে। তার এই আচরণকে সমর্থন করার প্রশ্নই আসে না; কিন্তু তার এই কর্মকাণ্ডের পেছনে যে ক্ষোভ ও হতাশা কাজ করেছে, সেটিও রাষ্ট্র ও সরকারের গুরুত্ব দিয়ে অনুধাবন করা প্রয়োজন।

কারণ সিফাত প্রকাশ্যে গালিগালাজ করেছে, কিন্তু দেশের আরও অনেক মানুষ হয়তো মনে মনে তার চেয়েও তীব্র ভাষায় ক্ষোভ প্রকাশ করছে। পার্থক্য শুধু একটাই—তারা সিফাতের মতো প্রকাশ্যে এসে তা বলার সাহস কিংবা সুযোগ পাচ্ছে না।

একজন নাগরিক কেন এমন পর্যায়ে গিয়ে সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করছে—এই প্রশ্নটিই বরং সরকারের গুরুত্ব দিয়ে ভাবা উচিত। শুধু তাকে শাস্তি দিলেই কি মানুষের ক্ষোভের কারণগুলো দূর হয়ে যাবে? নাকি সেই ক্ষোভের পেছনে থাকা বাস্তব সমস্যাগুলোও সমাধান করতে হবে?

এবার প্রশ্ন আসে, প্রতিবাদের ভাষা কেমন হওয়া উচিত?

ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা রয়েছে, যেখানে মানুষের তীব্র ক্ষোভ ও প্রতিবাদ অস্বাভাবিক রূপ নিয়েছে। আমাদের মনে পড়ে যায় ইরাকে এক সাংবাদিকের সেই বহুল আলোচিত ঘটনার কথা, যখন তিনি তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের দিকে জুতো নিক্ষেপ করেছিলেন। তিনি নিশ্চয়ই জানতেন, তাঁর এই কর্মকাণ্ডের পরিণতি কী হতে পারে। তারপরও তীব্র ক্ষোভ থেকেই তিনি এমন দুঃসাহসিক কাজ করেছিলেন।

ইতিহাসে এমন ঘটনা কখনো কখনো প্রতীকে পরিণত হয়। কিন্তু কোনো ঘটনা ইতিহাস সৃষ্টি করেছে বলেই সেটি অনুকরণীয় হয়ে যায় না।

সিফাতের ঘটনাটি আমাদের জন্য অনুকরণীয় নয়। কিন্তু এখানে একটি বিষয় প্রণিধানযোগ্য: একজন মানুষ যখন ক্ষোভে-হতাশায় নিজের নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে এমন ভাষা ব্যবহার করে, তখন শুধু তার অপরাধের দিকে তাকালেই হবে না; বরং তাকে এমন অবস্থায় পৌঁছে দেওয়ার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় কারণগুলোও খুঁজে দেখতে হবে।

একই সঙ্গে এটাও মনে রাখতে হবে—অন্যায়, অপকর্ম, অস্বাভাবিক আচরণ কিংবা অশালীন ভাষা কোনোভাবেই কাম্য নয়। প্রতিবাদ করতে হলে যুক্তি দিয়ে করতে হবে, প্রশ্ন তুলতে হলে তথ্য দিয়ে তুলতে হবে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হলে শালীন ও গণতান্ত্রিক ভাষায় দাঁড়াতে হবে।

কারণ গালিগালাজ কখনো মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার স্থায়ী হাতিয়ার হতে পারে না। বরং একটি সভ্য সমাজে যুক্তি, বিবেক, সত্য এবং গণতান্ত্রিক প্রতিবাদই হওয়া উচিত পরিবর্তনের প্রধান শক্তি।

আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে নাগরিক তার ক্ষোভ প্রকাশ করতে গিয়ে ভয় পাবে না; আবার রাষ্ট্রও নাগরিকের ক্ষোভকে দমন না করে তার কারণ খুঁজে দেখবে। এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে সরকার জনগণের সেবক হিসেবে কাজ করবে এবং জনগণও সরকারের প্রতি তাদের দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করবে।

সুখ, শান্তি ও সমৃদ্ধিতে ভরে উঠুক আমাদের প্রিয় সোনার বাংলা। দেশের প্রতিটি নাগরিক নিরাপদে, সম্মানের সঙ্গে এবং স্বস্তিতে জীবনযাপন করুক। আর কোনো সিফাতকে যেন বিদ্যুৎ বিল, দ্রব্যমূল্য, গ্যাস-বিদ্যুৎ সংকট কিংবা অন্য কোনো নাগরিক দুর্ভোগে অতিষ্ঠ হয়ে রাগে-ক্ষোভে এমন পরিস্থিতিতে পৌঁছাতে না হয়—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক