ঢাকা | মঙ্গলবার, ২৭ অক্টোবর ২০২৬,১১ কার্তিক ১৪৩৩

ধর্মীয় পোশাক নয়, চাই চরিত্রের পবিত্রতা: শিশু নির্যাতন, অপরাধীর পক্ষাবলম্বন ও আমাদের সামাজিক দ্বিচারিতা

ইদানীং দেশের বিভিন্ন মাদ্রাসায় শিশুদের যৌন নিপীড়ন ও বলাৎকারের অভিযোগে একের পর এক ঘটনা সামনে আসছে। ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব পালন করা কিছু শিক্ষকের বিরুদ্ধে ছোট ছোট শিশুদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করা কিংবা এমন অপকর্মের চেষ্টা করার অভিযোগ উঠছে। এমনকি সিসি ক্যামেরার আওতায় থাকা সত্ত্বেও কেউ কেউ এ ধরনের অপরাধে জড়ানোর সাহস দেখাচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, যাঁদের কাছ থেকে মানুষ নৈতিকতা, মানবিকতা ও ধর্মীয় মূল্যবোধের শিক্ষা প্রত্যাশা করে, তাঁদের মধ্য থেকেই এমন অভিযোগ উঠবে কেন?

এখানে প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন। এসব ঘটনা নিয়ে আলোচনা করার অর্থ এই নয় যে, সব মাদ্রাসা বা সব মাদ্রাসাশিক্ষককে একই পাল্লায় মাপা হচ্ছে। বরং যাঁরা নিষ্ঠার সঙ্গে ধর্মীয় শিক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই বলতে চাই—কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা কোনো ধর্মীয় পরিচয় অপরাধের দায় থেকে কাউকে মুক্তি দিতে পারে না। অপরাধী যে-ই হোন, তাঁর পরিচয়ের চেয়ে তাঁর অপরাধই বড়।

১. অপরাধ কি শুধু মাদ্রাসায় ঘটে?
অনেকেই প্রশ্ন তুলতে পারেন, শিশুদের যৌন নিপীড়ন বা নির্যাতনের ঘটনা কি শুধু মাদ্রাসাতেই ঘটে? স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে কি এমন ঘটনা ঘটে না?

অবশ্যই ঘটে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়, সমাজের বিভিন্ন স্তরেই শিশুদের প্রতি যৌন নিপীড়ন ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটতে পারে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ ধরনের অপরাধ নতুন কিছু নয়। যুগে যুগে কিছু বিকৃত মানসিকতার মানুষ শিশুদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে তাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে।

আবার বলেন, তাঁদের সময়ে তো এমন ঘটনা শোনা যেত না। তাঁদের প্রতি প্রশ্ন, ঘটনা কি সত্যিই ঘটত না, নাকি ঘটলেও আমরা জানতে পারতাম না?

আগে যোগাযোগব্যবস্থা, সংবাদ প্রচার ও তথ্যপ্রাপ্তির সুযোগ আজকের মতো বিস্তৃত ছিল না। অনেক ঘটনা পারিবারিক বা প্রাতিষ্ঠানিক গণ্ডির মধ্যে চাপা পড়ে যেত। সামাজিক লজ্জা, লোকলজ্জার ভয়, প্রভাবশালীদের চাপ কিংবা বিচার না পাওয়ার আশঙ্কায় অনেক ভুক্তভোগী ও তাঁদের পরিবার মুখ খুলতেন না। এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তারের কারণে কোনো ঘটনা সামনে এলে তা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। ফলে আগে যা অনেকের অজানাই থেকে যেত, এখন তা মুহূর্তেই জনসমক্ষে চলে আসে।

তবে এটাও মনে রাখতে হবে, কোনো ঘটনা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হলেই তার সব বিবরণ সত্য প্রমাণিত হয়ে যায় না। অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন, ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন এবং প্রমাণের ভিত্তিতে অপরাধীর বিচার হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু তদন্তের প্রয়োজনীয়তা কখনোই অভিযোগকারী শিশুকে অবিশ্বাস করার অজুহাত হতে পারে না।

২. টঙ্গীর ঘটনা: ক্ষোভের কারণ বুঝতে হবে, আইনের সীমাও মানতে হবে কয়েক দিন আগে টঙ্গীতে ছয় বছর বয়সী একটি শিশুকে চুমু দেওয়ার ঘটনাকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা সৃষ্টি হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিশুটির বাবা মাদ্রাসায় গিয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষকের গালে চড় মারেন। এরপর তাঁর সঙ্গে থাকা অন্য ব্যক্তিরাও কয়েকজনকে মারধর করেন বলে জানা যায়।

ঘটনাটি সামনে আসার পরপরই মানুষের মধ্যে মতভেদ দেখা দেয়। কেউ শিশুটির বাবার প্রতিক্রিয়াকে সমর্থন করছেন, আবার কেউ মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের পক্ষ নিচ্ছেন। এ ঘটনায় সংশ্লিষ্ট শিক্ষককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে সংবাদে এসেছে। পাশাপাশি শিশুটির বাবার বিরুদ্ধে মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ মামলা করেছে বলেও আলোচনা রয়েছে। এসব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই নির্ভর করবে নির্ভরযোগ্য তথ্য, তদন্ত ও বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর।

এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি।

প্রথমত, ছয় বছরের একটি শিশু অত্যন্ত সংবেদনশীল ও সুরক্ষার অধিকারী। তার শরীর, ব্যক্তিগত সীমানা ও নিরাপত্তার প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়া প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের দায়িত্ব। কোনো শিক্ষক শিশুর প্রতি অনুপযুক্ত আচরণ করলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখতে হবে। শিশুটির বাবা ক্ষুব্ধ হয়েছেন—এমন প্রতিক्रিয়ার পেছনে সন্তানের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থাকা অস্বাভাবিক নয়।

দ্বিতীয়ত, ক্ষোভের কারণ যতই যৌক্তিক হোক, আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া কিংবা দলবদ্ধভাবে কাউকে মারধর করাকে সমর্থন করা যায় না। অভিযোগের বিচার হবে আইনের মাধ্যমে। কাউকে অপমান করা, হুমকি দেওয়া কিংবা পিটিয়ে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর নেই।

অতএব, শিশুর প্রতি অনুপযুক্ত আচরণের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত যেমন জরুরি, তেমনি মারধর বা অন্য কোনো বেআইনি কর্মকাণ্ডের অভিযোগ থাকলেও তার বিচার হওয়া উচিত। এক পক্ষের সম্ভাব্য অন্যায় দিয়ে অন্য পক্ষের অন্যায়কে বৈধতা দেওয়া যায় না।

ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কিছু ধর্মীয় বক্তাকে প্রতিবাদ করতে এবং শিশুটির বাবাকে হুমকি দিতে দেখা গেছে বলেও আলোচনা হয়েছে। যদি কেউ সত্যিই এমন হুমকি দিয়ে থাকেন, তাহলে সেটিও নিন্দনীয়। কোনো অভিযোগের বিচার চাওয়া এক বিষয়, আর বিচার চাওয়ার কারণে কাউকে ভয় দেখানো সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।

৩. একটি ঘটনা সামনে এলে আরও ঘটনা প্রকাশ্যে আসে কেন?
টঙ্গীর ঘটনাকে কেন্দ্র করে আলোচনা শুরু হওয়ার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে মাদ্রাসা কিংবা মাদ্রাসাশিক্ষকদের বিরুদ্ধে আরও কিছু অনৈতিক আচরণ ও শিশু নির্যাতনের অভিযোগ সামনে এসেছে। এসব অভিযোগের প্রতিটির সত্যতা আলাদাভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। তবে একটি ঘটনা অন্যদেরও কথা বলার সাহস জোগাতে পারে—এটি অস্বাভাবিক নয়।

দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতনের শিকার হওয়া কোনো শিশু কিংবা তার পরিবার হয়তো ভয়ে, সামাজিক চাপে অথবা প্রতিষ্ঠানের সম্মানহানির আশঙ্কায় নীরব থেকেছে। অন্য একটি ঘটনা প্রকাশ্যে আসার পর তারা বুঝতে পারে যে, তাদের অভিজ্ঞতাও জানানো সম্ভব। ফলে আগে চাপা পড়ে থাকা অভিযোগ সামনে আসতে পারে।

এ অবস্থায় আমাদের দায়িত্ব হলো, প্রতিটি অভিযোগকে গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, শিশুর পরিচয় ও মর্যাদা রক্ষা করা এবং যথাযথ তদন্তের ব্যবস্থা করা। কোনো প্রতিষ্ঠানের সুনাম রক্ষার জন্য অভিযোগ চাপা দেওয়া যেমন অনৈতিক, তেমনি প্রমাণ ছাড়াই কাউকে অপরাধী ঘোষণা করাও ন্যায়সংগত নয়।

প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত সম্মান রক্ষা পায় অপরাধ গোপন করার মাধ্যমে নয়; বরং অপরাধের অভিযোগ উঠলে স্বচ্ছ তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার মাধ্যমে।

৪. মাদ্রাসার ঘটনায় মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলনামূলক বেশি হয় কেন?
একই ধরনের অনৈতিক ঘটনা স্কুল, কলেজ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটলে যেমন আলোচনা হয়, মাদ্রাসায় ঘটলে অনেক সময় তার চেয়ে বেশি প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। এর পেছনে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ রয়েছে—মাদ্রাসা শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নয়; অনেক মানুষের কাছে এটি ধর্মীয় জ্ঞান, নৈতিকতা ও আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের প্রতীক।

সাধারণ মানুষ একজন ধর্মীয় শিক্ষকের কাছে শুধু পাঠদানের দায়িত্বই প্রত্যাশা করেন না; তাঁর কাছ থেকে সততা, সংযম, মানবিকতা ও নৈতিক আদর্শেরও প্রত্যাশা করেন। ইসলামে অনৈতিকতা, জুলুম ও অন্যের অধিকার হরণের বিরুদ্ধে যে শিক্ষা রয়েছে, তা মানুষ ধর্মীয় শিক্ষকদের কাছ থেকেই বিশেষভাবে শুনে থাকে।
সেই শিক্ষকের বিরুদ্ধেই যখন কোনো শিশুর প্রতি অনৈতিক আচরণের অভিযোগ ওঠে, তখন মানুষের মনে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—যিনি অন্যকে নৈতিকতার শিক্ষা দেন, তিনি নিজেই সেই নৈতিকতা অনুসরণ করছেন কি না?

এখানে ক্ষোভের বিষয়টি কেবল একটি অপরাধের অভিযোগ নয়; বরং ধর্মীয় পরিচয় ও নৈতিক আচরণের মধ্যে অসংগতিও মানুষের প্রতিক্রিয়াকে তীব্র করে তোলে।

তবে এ কারণে মাদ্রাসার সব শিক্ষককে সন্দেহের চোখে দেখা কিংবা সব ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে কলঙ্কিত করা উচিত নয়। অপরাধের দায় অপরাধীর, কোনো পুরো সম্প্রদায় বা পেশার নয়। একই সঙ্গে ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে অপরাধের অভিযোগকে হালকাভাবে দেখারও কোনো সুযোগ নেই।

৫. ধর্মীয় পরিচয় কি কাউকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখে?
আমাদের সমাজে একটি দুঃখজনক প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কেউ ধর্মীয় পোশাক পরেন, বক্তৃতায় ধর্মীয় উদ্ধৃতি দেন কিংবা নিজেকে বড় আলেম হিসেবে পরিচিত করেন—তাঁর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলেই একদল মানুষ সত্যতা যাচাইয়ের আগেই তাঁকে নির্দোষ ঘোষণা করতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।

অথচ ধর্মীয় পরিচয় কোনো ব্যক্তির চরিত্রের অকাট্য প্রমাণ নয়। একজন মানুষ ধর্মীয় জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, ধর্মীয় বক্তব্য দিতে পারেন, মানুষের কাছ থেকে সম্মানও পেতে পারেন; কিন্তু তাঁর ব্যক্তিগত আচরণে নৈতিকতার ঘাটতি থাকতে পারে। তাই ব্যক্তির পরিচয় নয়, তাঁর কাজ ও আচরণ দিয়েই তাঁকে মূল্যায়ন করতে হবে।

একইভাবে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলেই তাঁকে অপরাধী ধরে নেওয়াও ঠিক নয়। অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণ করবে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনসম্মত বিচারপ্রক্রিয়া।

আমাদের নীতিটি হওয়া উচিত খুবই সহজ—নির্দোষ হলে তাঁর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে, আর অপরাধী হলে তাঁর পরিচয়, পদমর্যাদা কিংবা ধর্মীয় প্রভাব বিবেচনা না করে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে হবে।

কিন্তু সমস্যা দেখা দেয় তখন, যখন অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্তের আগেই অভিযুক্ত ব্যক্তির সহকর্মীরা তাঁর পক্ষে সাফাই গাইতে শুরু করেন, অভিযোগকারীকে দোষারোপ করেন কিংবা ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র বলে প্রচার করেন। তখন প্রশ্ন ওঠে, তাঁরা কি সত্য উদ্‌ঘাটনে আগ্রহী, নাকি নিজেদের গোষ্ঠীর একজনকে যেকোনো মূল্যে রক্ষা করতে চান?

যদি কেউ সত্যিই নির্দোষ হন, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্তই তাঁর পক্ষে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রমাণ হতে পারে। সে ক্ষেত্রে আগেভাগে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ করার প্রয়োজন কোথায়?

৬. মামুনুল হককে ঘিরে বিতর্ক এবং জনআস্থার সংকট
একসময় নারায়ণগঞ্জের একটি রিসোর্টে মাওলানা মামুনুল হককে ঘিরে যে ঘটনা ও বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছিল, তা দেশের রাজনীতি ও ধর্মীয় অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ওই ঘটনার পর তাঁর ব্যক্তিগত জীবন, বক্তব্য ও অবস্থান নিয়ে জনপরিসরে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। পরবর্তী সময়ে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয় এবং কারাবাসের পর তিনি মুক্তি পান। ঘটনাটি নিয়ে তাঁর বক্তব্য এবং সমালোচকদের বক্তব্যের মধ্যেও বিস্তর মতপার্থক্য ছিল।

আমার কাছে ওই বিতর্কের বড় শিক্ষা হলো, কোনো ব্যক্তির ধর্মীয় পরিচিতি বা জনপ্রিয়তা যত বড়ই হোক, তাঁর বক্তব্য ও আচরণ নিয়ে প্রশ্ন তোলার অধিকার মানুষের রয়েছে। একইভাবে, কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে চূড়ান্ত সত্য ধরে নেওয়ার আগে প্রমাণ ও বিচারিক অবস্থান বিবেচনা করাও জরুরি।

জনগণের আস্থা অর্জন করা কঠিন, কিন্তু তা হারানো খুব সহজ। একজন পরিচিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বের আচরণ নিয়ে যখন গুরুতর বিতর্ক সৃষ্টি হয়, তখন তার প্রভাব শুধু সেই ব্যক্তির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক সময় সাধারণ মানুষের চোখে পুরো ধর্মীয় নেতৃত্বের বিশ্বাসযোগ্যতাও প্রশ্নের মুখে পড়ে।

এ কারণে ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের দায়িত্ব অন্যদের তুলনায় কম নয়, বরং তাঁদের কাছ থেকে মানুষের প্রত্যাশা বেশি। তাঁদের কথার সঙ্গে কাজের মিল থাকা প্রয়োজন। ধর্মীয় উপদেশের পাশাপাশি নিজেদের জীবনেও সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানো জরুরি।

৭. অপরাধীর পক্ষে দাঁড়ানো কি ধর্মের প্রতি আনুগত্য?
আরেকটি বিষয় আমাকে গভীরভাবে ভাবায়। কোনো মাদ্রাসায় একজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে অনৈতিক কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উঠলে কখনো কখনো তাঁর সহকর্মী কিংবা অন্য ধর্মীয় বক্তাদের একাংশকে অভিযুক্ত ব্যক্তির পক্ষে অবস্থান নিতে দেখা যায়। অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের আগেই তাঁরা প্রতিষ্ঠানের সম্মান, ধর্মীয় অনুভূতি কিংবা ষড়যন্ত্রের কথা সামনে নিয়ে আসেন।

প্রশ্ন হলো, কোনো ব্যক্তির সম্ভাব্য অপরাধকে আড়াল করে কি ধর্মের সম্মান রক্ষা করা সম্ভব?

আমার মতে, মোটেই নয়।

কেউ অপরাধ করে থাকলে তাঁর অপরাধের দায় তাঁকেই বহন করতে হবে। সেই অপরাধকে ধর্মের দোহাই দিয়ে আড়াল করার চেষ্টা করলে ধর্মের সম্মান রক্ষা হয় না; বরং মানুষের কাছে ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়।

ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের কোনো শিক্ষক যদি অপরাধের অভিযোগে অভিযুক্ত হন, তাহলে প্রতিষ্ঠানের উচিত হবে অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে নেওয়া, শিশুর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, প্রমাণ নষ্ট হওয়া রোধ করা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে তদন্তে সহযোগিতা করা। অভিযোগ প্রমাণিত হলে তাঁর বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। আর অভিযোগ প্রমাণিত না হলে তাঁর সম্মান ও অধিকারও রক্ষা করতে হবে।

এখানে ব্যক্তির প্রতি অন্ধ আনুগত্যের চেয়ে ন্যায়বিচারের প্রতি আনুগত্য অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। একজন সহকর্মীকে ভালোবাসা বা সম্মান করার অর্থ তাঁর সব কাজকে সমর্থন করা নয়। বরং তিনি ভুল করলে তাঁকে ভুলের পরিণতি সম্পর্কে সচেতন করা এবং ন্যায়সংগত প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে যাওয়া প্রকৃত দায়িত্বশীলতার পরিচয়।

অন্যায়কে অন্যায় বলতে না পারলে নৈতিকতার কথা বলার অধিকারও দুর্বল হয়ে পড়ে।

৮. শিশুর নিরাপত্তা সবার আগে
এই পুরো আলোচনার কেন্দ্রে থাকা উচিত শিশুর নিরাপত্তা, মর্যাদা ও ন্যায়বিচার। কোনো ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা পরিবারের সম্মান শিশুর নিরাপত্তার চেয়ে বড় হতে পারে না।

শিশুরা অনেক সময় বুঝতে পারে না কোন আচরণ অনুপযুক্ত, কীভাবে নিজেদের সুরক্ষিত রাখতে হয় কিংবা বিপদের মুখে কার কাছে যেতে হয়। আবার ভয়, লজ্জা ও প্রভাবশালী ব্যক্তির চাপের কারণে তারা অনেক সময় মুখও খুলতে পারে না। তাই অভিভাবক, শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো এমন পরিবেশ তৈরি করা, যেখানে শিশুরা নির্ভয়ে নিজেদের কথা বলতে পারে।

প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু সুরক্ষার সুস্পষ্ট নীতিমালা থাকা প্রয়োজন। অভিযোগ জানানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির জবাবদিহি, উপযুক্ত তদারকি এবং অভিযোগ উঠলে দ্রুত ও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা গ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। সিসি ক্যামেরা সহায়ক হতে পারে, কিন্তু শুধু ক্যামেরা বসালেই শিশু নির্যাতন বন্ধ হবে না। প্রয়োজন দায়িত্বশীল তদারকি, কার্যকর অভিযোগব্যবস্থা এবং অপরাধের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান।

অভিভাবকদেরও সন্তানদের সঙ্গে এমন সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে, যাতে কোনো অনুপযুক্ত আচরণের শিকার হলে তারা ভয় না পেয়ে তা জানাতে পারে। শিশুকে বোঝাতে হবে, তার শরীরের ব্যক্তিগত সীমানা রয়েছে এবং কোনো প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির আচরণে অস্বস্তি বোধ করলে সে বিশ্বস্ত অভিভাবককে জানাতে পারে। শিশুর কথা মনোযোগ দিয়ে শুনতে হবে, তাকে দোষারোপ করা যাবে না এবং প্রয়োজন হলে যথাযথ কর্তৃপক্ষের সহায়তা নিতে হবে।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো অভিযোগ সামনে এলে শিশুর পরিচয় প্রকাশ করে তাকে সামাজিকভাবে বিব্রত করা কিংবা তার পরিবারকে হেয় করা থেকে বিরত থাকতে হবে। বিচার চাইতে গিয়ে যেন ভুক্তভোগী শিশুকে দ্বিতীয়বার মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে না হয়।

৯. ধর্মকে কলঙ্কিত করে কারা?
ইসলামসহ পৃথিবীর প্রধান ধর্মগুলোর নৈতিক শিক্ষায় সততা, সংযম, মানবিকতা ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। অথচ কেউ যদি ধর্মীয় পরিচয়কে নিজের অপকর্ম আড়াল করার ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন, তবে তা ধর্মীয় শিক্ষার সঙ্গে স্পষ্ট বিরোধ সৃষ্টি করে।

আমরা যখন অন্যকে নৈতিকতার শিক্ষা দিই, তখন নিজেদের আচরণের প্রতিও দায়িত্বশীল হতে হয়। মুখে ধর্মের কথা বলা সহজ; কিন্তু বাস্তব জীবনে সেই শিক্ষার প্রতিফলন ঘটানোই আসল পরীক্ষা।

একজন ধর্মীয় শিক্ষক যদি শিশুদের সঙ্গে অনৈতিক আচরণ করেন বলে অভিযোগ ওঠে, আর অন্যরা সত্য যাচাইয়ের পরিবর্তে তাঁর পরিচয় রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন, তাহলে মানুষের মনে ধর্মীয় নেতৃত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন সৃষ্টি হওয়া স্বাভাবিক। এই প্রশ্নকে শুধু ধর্মবিদ্বেষ বলে উড়িয়ে দিলে সমস্যার সমাধান হবে না। বরং দেখতে হবে, মানুষের আস্থা কেন ক্ষুণ্ন হচ্ছে এবং তা পুনরুদ্ধারের জন্য কী করা প্রয়োজন।

অন্য ধর্মের মানুষের সামনে নিজেদের ভালো প্রমাণ করার জন্য নয়, বরং নিজেদের ধর্মীয় ও নৈতিক দায়িত্ববোধ থেকেই অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো উচিত। সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়া কোনো ধর্মের অবমাননা নয়; বরং ন্যায়বিচার ও মানবিকতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন।

আমাদের মনে রাখতে হবে, একজন অপরাধীর পরিচয় ধর্মীয় হতে পারে, কিন্তু তাঁর অপরাধকে ধর্মের শিক্ষা হিসেবে চালিয়ে দেওয়া যায় না। একজন ব্যক্তির অপকর্ম দিয়ে পুরো ধর্মকে বিচার করা যেমন অন্যায়, তেমনি ধর্মের দোহাই দিয়ে একজন অপরাধীকে রক্ষা করাও অন্যায়।

১০. শেষ কথা: ধর্মের মর্যাদা রক্ষার প্রথম শর্ত ন্যায়বিচার
আমার প্রশ্ন সেই সব মানুষের কাছে, যাঁরা ধর্মীয় পরিচয়ের কারণে কোনো অভিযুক্ত ব্যক্তিকে প্রশ্নের ঊর্ধ্বে রাখতে চান। আপনারা কি সত্যিই ধর্মের সম্মান রক্ষা করছেন, নাকি নিজেদের গোষ্ঠীর একজনকে রক্ষা করতে গিয়ে ধর্মের নৈতিক শিক্ষাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন?

কোনো ব্যক্তি যদি সত্যিই নির্দোষ হন, তাহলে নিরপেক্ষ তদন্ত ও ন্যায়বিচারের মাধ্যমে তা প্রমাণিত হোক। আর যদি তিনি অপরাধী হন, তাহলে তাঁর ধর্মীয় পরিচয়, সামাজিক মর্যাদা কিংবা অনুসারীর সংখ্যা যেন বিচারের পথে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়।

আমরা চাই না, কোনো মাদ্রাসা কিংবা ধর্মীয় শিক্ষককে অন্যায়ভাবে অপবাদ দেওয়া হোক। একই সঙ্গে এটাও চাই না, ধর্মীয় পরিচয়ের আড়ালে কোনো শিশু নির্যাতিত হোক, কোনো অপরাধী পার পেয়ে যাক কিংবা ভুক্তভোগী ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হোক।

আমরা চাই, মাদ্রাসা হোক প্রকৃত ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষার কেন্দ্র; স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় হোক নিরাপদ শিক্ষার পরিবেশ; আর প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশুরা বেড়ে উঠুক ভয়, নির্যাতন ও শোষণমুক্ত পরিবেশে।

ধর্মীয় পোশাক পরলেই মানুষ চরিত্রবান হয়ে যায় না। ধর্মীয় বক্তব্য দিলেই কেউ নৈতিকতার পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন না। প্রকৃত পরিচয় প্রকাশ পায় তাঁর আচরণে, অন্যের প্রতি তাঁর সম্মানে এবং অন্যায়ের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানে।

মন যদি কলুষিত থাকে, তাহলে শুধু ধর্মীয় পরিচয় ধারণ করে লাভ কী? মুখে ন্যায়বিচারের কথা বলে কাজে অন্যায়কে প্রশ্রয় দিলে সেই কথার মূল্যই বা কোথায়?

ধর্মের মর্যাদা রক্ষার জন্য অপরাধীকে আড়াল করার প্রয়োজন নেই। বরং অপরাধীর বিরুদ্ধে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণ, ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়ানো এবং সত্যের পক্ষে অবস্থান নেওয়াই ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের প্রকৃত পরিচয়।

আমাদের অবস্থান হওয়া উচিত একটাই—অপরাধীর কোনো ধর্মীয় পরিচয় নেই, ন্যায়বিচারের কোনো পক্ষপাত নেই, আর শিশুর নিরাপত্তার প্রশ্নে কোনো আপস নেই।

লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক