ঢাকা | শনিবার, ২৭ জুন ২০২৬,১৩ আষাঢ় ১৪৩৩

দেশীয় অস্ত্র ও বাঁশ নিয়ে সাংবাদিকের ওপর হামলার অভিযোগ, অস্বীকার অর্ঘ্য ও চন্দনের

জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের (জবি) কেন্দ্রীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভাকে কেন্দ্র করে সাংবাদিক ও সমাজকর্ম বিভাগের ২০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অপূর্ব রায়ের ওপর হামলার অভিযোগকে ঘিরে পাল্টাপাল্টি বক্তব্য সামনে এসেছে। একদিকে অপূর্ব রায় অভিযোগ করেছেন, নাট্যকলা বিভাগের ১৬তম ব্যাচের শিক্ষার্থী অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ দাস এবং মাইক্রোবায়োলজি বিভাগের ১৭তম ব্যাচের শিক্ষার্থী চন্দন কুমার দাসের নেতৃত্বে বহিরাগত ও কয়েকজন শিক্ষার্থী দেশীয় অস্ত্র ও বাঁশ নিয়ে হামলা চালায়। অন্যদিকে অভিযুক্ত শিক্ষার্থীরা তা অস্বীকার করে দাবি করেছেন, এটি কোনো পরিকল্পিত হামলা নয়; বরং সভা শেষে দুই পক্ষের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটেছে।

শুক্রবার (২৬ জুন) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মন্দিরে অনুষ্ঠিত সাধারণ সভা শেষে এ ঘটনা ঘটে।

প্রত্যক্ষদর্শী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় মন্দিরের ভবিষ্যৎ গঠনতন্ত্র, সাংগঠনিক কার্যক্রম ও কমিটির কাঠামো নিয়ে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় সনাতনী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সংগঠনের নেতাকর্মীরা উপস্থিত ছিলেন। সভা শেষে আলোচনা চলাকালে কয়েকজন শিক্ষার্থীর মধ্যে বাকবিতণ্ডা শুরু হয়, যা একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি ও হাতাহাতিতে রূপ নেয়।

আহত সাংবাদিক অপূর্ব রায়ের অভিযোগ, সভার একপর্যায়ে অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ দাস একটি অপ্রাসঙ্গিক বিষয় উত্থাপন করলে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়। পরে অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ দাস ও চন্দন কুমার দাস তাদের সঙ্গে থাকা কয়েকজন বহিরাগত এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রত্যয় চৌধুরী, শুভ নাথ ও প্রান্তকে তার ওপর হামলার নির্দেশ দেন।

তার দাবি, প্রথমে প্রত্যয় চৌধুরী তাকে চড় মারেন। পরে শুভ নাথ ও প্রান্ত দেশীয় অস্ত্র ও বাঁশ নিয়ে হামলার চেষ্টা করেন। বাধা দিতে গেলে আরও কয়েকজন শিক্ষার্থী মারধরের শিকার হন। এতে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী ছাত্র ফোরামের সদস্য সচিব জয় সাহাসহ কয়েকজন আহত হন। ঘটনার পর প্রক্টরিয়াল বডি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এনে তাকে নিরাপদে বাসায় পৌঁছে দেয়।

হামলার পেছনে দীর্ঘদিনের বিরোধের কথা তুলে ধরেন আহত সাংবাদিক অপূর্ব রায় বলেন, “গত ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৫ রোজ রবিবার রাত ৯টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের রফিক ভবনের নিচে আমি পানি খেতে গেলে শুভ নাথ আমাকে রফিক ভবনের ৪র্থ তলায় ডাকে। পরে সে আমাকে বিড়ি, চা ও বিস্কুট নিয়ে আসতে বলে। আমি চা-বিস্কুট কিনলেও টাকা শেষ হয়ে যাওয়ায় পাশের বিকাশের দোকানে টাকা তুলতে যাই, কিন্তু দোকানটি বন্ধ পাই। তখন শারীরিক অসুস্থতার কারণে আমার পক্ষে চারতলায় ওঠা সম্ভব হয়নি। তাই আমার সঙ্গে থাকা একজনকে দিয়ে চা ও বিস্কুট পাঠিয়ে দিই। কয়েকদিন পর শুভ নাথ তার বিভাগের সৌভিক নামে একজনকে আমাকে মারধরের জন্য পাঠায়। কাটালতলায় সৌভিক আমাকে মারধরের চেষ্টা করলে বিভাগের সিনিয়র ও সমাজবিজ্ঞান বিভাগের প্রক্টর ফেরদৌস স্যার আমাকে উদ্ধার করে প্রক্টর অফিসে নিয়ে যান। পরে আমাকে আশ্বস্ত করে প্রক্টর স্যার বাড়ি পাঠিয়ে দেন এবং সৌভিককে আটকে রেখে শুভ নাথকে ডাকা হয়।”

তিনি আরও বলেন, “জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সংগীত বিভাগের শিক্ষার্থী তূর্ণা নিশিতার ওপর হামলার ঘটনায় চন্দনদের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছিল। সেই সংবাদ এবং আগের ঘটনার জের ধরে গতকাল কেন্দ্রীয় মন্দিরের সভা চলাকালে ছাত্রলীগের চন্দন ও শুভ আমার ওপর হামলা চালায়। পরে তারা চিৎকার করে বলে, সাংবাদিকদের দেখে নেওয়া হবে।”

তবে এসব অভিযোগ নাকচ করে চন্দন কুমার দাস বলেন, সভার আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শান্তিপূর্ণভাবেই শেষ হয়েছিল। পরে সাধারণ আলাপচারিতার সময় অপূর্ব রায় ১৯তম ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রত্যয়ের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। এরপর উভয় পক্ষের মধ্যে হাতাহাতি হয়।

চন্দনের দাবি, তিনি নিজে একজনকে বাঁশ হাতে এগিয়ে আসতে এবং অপর পক্ষের দুজনকে হাতে ইট নিয়ে আসতে দেখেন। তখন উপস্থিত সবাই মিলে দুই পক্ষকে সরিয়ে দেন, ফলে বড় ধরনের সংঘর্ষ ঘটেনি।

তিনি আরও বলেন, ঘটনার প্রায় আধা ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ দাসের নেতৃত্বে হামলার অভিযোগ তুলে পোস্ট দেওয়া হয়। পরে বিভিন্ন গণমাধ্যমে তার নামসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তার অভিযোগ, যাদের আহত বা হাসপাতালে ভর্তি বলা হয়েছে, তাদের কয়েকজন ঘটনার সঙ্গে সরাসরি জড়িতই ছিলেন না।

ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেন চন্দন। তিনি বলেন, অতীতে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় অনুষ্ঠানে ছাত্রলীগ নেতাদের সঙ্গে ছবি থাকলেও তিনি কখনো ছাত্রলীগের কোনো কমিটি বা পদে ছিলেন না। সাংগঠনিক প্রতিযোগিতা ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব থেকেই তার বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ আনা হচ্ছে বলেও দাবি করেন তিনি।

অন্যদিকে অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ দাস বলেন, সভাটি মূলত কেন্দ্রীয় মন্দিরের গঠনতন্ত্র, ভবিষ্যৎ সাংগঠনিক কাঠামো, পুরোহিত নিয়োগসহ বিভিন্ন বিষয়ে মতামত নেওয়ার জন্য আয়োজন করা হয়েছিল। সেখানে কোনো কমিটি গঠন করা হয়নি।

তার দাবি, সভা চলাকালে কমিটির একটি বিষয় নিয়ে কয়েকজন জুনিয়র শিক্ষার্থীর সঙ্গে সিনিয়রদের কথা কাটাকাটি হয়। পরে অপূর্ব রায় কয়েকজন সিনিয়রের সঙ্গে তর্কে জড়িয়ে পড়েন এবং একপর্যায়ে শুভ, প্রত্যয়সহ কয়েকজনের সঙ্গে হাতাহাতি শুরু হয়।

অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ বলেন, এটি কোনো পরিকল্পিত হামলা ছিল না এবং কোনো সংগঠনের নির্দেশনায়ও ঘটেনি। তিনি দাবি করেন, তিনি কাউকে মারধর করেননি বা কারও গায়ে হাত তোলেননি। বিশ্ববিদ্যালয়ের সিসিটিভি ফুটেজ ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য যাচাই করলে প্রকৃত ঘটনা বেরিয়ে আসবে।

তার অভিযোগ, ঘটনার কিছুক্ষণের মধ্যেই একপক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে সংবাদ প্রকাশ করা হয়েছে। সেখানে তাকে মাদকাসক্ত, বহিরাগত এনে হামলাকারী এবং দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারের সঙ্গে জড়িত হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে, যা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন তিনি।

অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ আরও বলেন, বর্তমানে কেন্দ্রীয় মন্দিরের গঠনতন্ত্র ও ভবিষ্যৎ কমিটি নিয়ে বিভিন্ন মতপার্থক্য ও সাংগঠনিক প্রতিযোগিতা চলছে। সেই অভ্যন্তরীণ বিরোধ থেকেই ঘটনাটি অতিরঞ্জিত করে তাকে এবং অন্যদের জড়ানো হয়েছে বলে তার ধারণা।

এদিকে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীরা হামলার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন। অপরদিকে অর্ঘ্যশ্রেষ্ঠ দাস ও চন্দন কুমার দাসও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটনের আহ্বান জানিয়েছেন এবং তদন্তে সব ধরনের সহযোগিতা করার কথা জানিয়েছেন।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী প্রক্টর ড. নঈম সিদ্দিকী বলেন, “আহত শিক্ষার্থীকে তিনি নিজ দায়িত্বে বাসায় পৌঁছে দিয়েছেন। লিখিত অভিযোগ পেলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিধি অনুযায়ী তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”

জবি প্রক্টর অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন বলেন, “ঘটনার পর ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী আমাকে ফোন দিয়ে নিরাপত্তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করলে আমরা তাকে বাসায় পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করি। এ ঘটনায় এখনো কোনো লিখিত অভিযোগ পাওয়া যায়নি। তবে তিনি রবিবার অভিযোগ করার কথা বলেছেন। অভিযোগ পেলে তদন্ত স্বাপেক্ষে আমরা প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবো।”