ঢাকা | শুক্রবার, ১ মে ২০২৬,১৮ বৈশাখ ১৪৩৩

দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক সম্পন্নের হার কম

ঢাকায় পড়াশোনার খরচ বহন করতে না পেরে মেয়েকে নরসিংদীতে ক্লাস সিক্স পর্যন্ত পড়াতে পেরেছিলেন জুলেখা আক্তার। কিন্তু মাধ্যমিকে ভর্তি, পরীক্ষার ফি, প্রাইভেট টিউশনসহ নানা খরচের চাপ সামলাতে না পেরে শেষ পর্যন্ত মেয়ের পড়াশোনা থেমে যায়। জুলেখার মতো দেশের অনেক নিম্ন আয়ের পরিবারের শিক্ষার্থীরাই প্রাথমিক শেষ করলেও মাধ্যমিকের গণ্ডি পার হতে পারছে না—যার পেছনে প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে বাড়তে থাকা শিক্ষা ব্যয় ও আর্থিক সীমাবদ্ধতা।

শ্রেণি কক্ষে যথাযথ পাঠদানের অভাবে মেয়ে প্রাইভেট পড়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিল উল্লেখ করে জুলেখা আক্তার বলেন, ‘স্কুলে (মাধ্যমিক) ভর্তির পর থেকেই মেয়ে বলত, সে ক্লাসে পড়া বোঝে না। সবাই প্রাইভেট পড়ে, সেও প্রাইভেট পড়তে চায়। কিন্তু আমাদের সামর্থ্য ছিল না।’ শুক্রবার (১ মে) বণিক বার্তা পত্রিকায় প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা যায়।

প্রতিবেদনে আরো জানা, দেশে প্রাথমিক স্তর সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর হার গত কয়েক বছরে বাড়লেও এক্ষেত্রে এখনো পিছিয়ে মাধ্যমিক স্তর। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) ‘মাল্টিপল ইন্ডিকেটর ক্লাস্টার সার্ভে-২০২৫’-এর তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তর সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে ৬৯ দশমিক ৩ ও ৪৩ দশমিক ৮ শতাংশ। অর্থাৎ দেশে অর্ধেকের বেশি শিক্ষার্থী মাধ্যমিক স্তর শেষ করতে পারছে না।

মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার বড় কারণ পরিবারের আর্থিক সামর্থ্যের অভাব। শিক্ষার্থীর পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য যত কমে, তাদের মাধ্যমিক পর্যায় থেকে ঝরে পড়ার হার সে অনুপাতে বাড়ে। ইউনেস্কোর তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, প্রাথমিকের তুলনায় মাধ্যমিক স্তরে শিক্ষার্থীদের পরিবারের আর্থিক সামর্থ্য তাদের অধ্যয়নের ধারাবাহিকতা রক্ষায় বেশি প্রভাব রাখছে। আর্থিকভাবে পিছিয়ে থাকা পরিবারের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক স্তর সম্পন্ন করার হারও কম।

শিক্ষা ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের বৈষম্য নিয়ে ইউনেস্কো প্রকাশিত (২০২২) পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাথমিক, নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীর হার যথাক্রমে ৮৮, ৭১ ও ৩১ শতাংশ। প্রাথমিক স্তরে ধনী ও দরিদ্র পরিবারের সংশ্লিষ্ট স্তর সম্পন্নকারী শিক্ষার্থীদের হার কাছাকাছি। প্রাথমিকে অতি দরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী ও অতি ধনী পরিবারের শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক সম্পন্ন করার হার ছিল যথাক্রমে ৮২, ৮৭, ৮৮, ৯২ ও ৯৩ শতাংশ। এ স্তরে অতি দরিদ্র ও অতি ধনীদের মধ্যে সংশ্লিষ্ট স্তর সম্পন্নকারীর হারে পার্থক্য ছিল ১১ শতাংশীয় পয়েন্ট। কিন্তু নিম্ন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে গিয়ে এ পার্থক্য বেড়ে দাঁড়ায় যথাক্রমে ৩৬ ও ৪৮ শতাংশীয় পয়েন্টে।

ইউনেস্কোর তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিকে অতিদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, অতিধনীদের মধ্যে নিম্ন মাধ্যমিক সম্পন্ন করার হার যথাক্রমে ৫২, ৬৬, ৭৩, ৭৭ ও ৮৮ শতাংশ। আর উচ্চ মাধ্যমিকে অতিদরিদ্র, দরিদ্র, মধ্যবিত্ত, ধনী, অতিধনীদের মধ্যে এ স্তর সম্পন্ন করার হার যথাক্রমে ১২, ২১, ২৭, ৩৪ ও ৬০ শতাংশ।

শিক্ষাসংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাধ্যমিক স্তরে দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার হার বেশি হওয়ার কারণ এ স্তরে ক্রমবর্ধমান উচ্চ শিক্ষা ব্যয়। দেশে শিক্ষা খাত নিয়ে কাজ করা বেসরকারি সংস্থাগুলোর মোর্চা গণসাক্ষরতা অভিযানের উদ্যোগে করা এডুকেশন ওয়াচ-২০২৩ গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ২০২২ সালে মাধ্যমিক স্তরের একজন শিক্ষার্থীর জন্য পরিবারের বার্ষিক গড় ব্যয় ছিল ২৭ হাজার ৩৪০ টাকা। মফস্বল এলাকায় এ খরচ ২২ হাজার ৯০৯ ও শহরাঞ্চলে ৩৫ হাজার ৬৬২ টাকা। কিন্তু ২০২৩ সালে বছরের প্রথম ছয় মাসেই এ গড় খরচ ৫১ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছিল ২০ হাজার ৭১২ টাকায়।

সারা দেশের আট বিভাগের ১৬ জেলার ২৬টি উপজেলা ও পাঁচটি সিটি করপোরেশন এলাকা থেকে তথ্য সংগ্রহ করে গবেষণাটি করা হয়। এ কাজে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থী, শিক্ষক, অভিভাবক, শিক্ষা কর্মকর্তা ও জেলা-উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তা মিলিয়ে মোট ৭ হাজার ২২৫ জনের কাছ থেকে তথ্য নেয়া হয়েছে। ওই প্রতিবেদনে দেখা যায়, মাধ্যমিকে শিক্ষা ব্যয় বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ছিল কোচিং-প্রাইভেটনির্ভরতা। প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, মাধ্যমিক স্তরের ৯৩ শতাংশ শিক্ষার্থীই গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল।

এ বিষয়ে গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক ও সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত অন্তর্ভুক্তিমূলক ও সমতাভিত্তিক গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতে বাংলাদেশ অনেক পিছিয়ে আছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে অভিভাবক যত বেশি অর্থ ব্যয় করতে পারবেন, তার সন্তান তত মানসম্মত শিক্ষা পাবে। শিক্ষায় এ বৈষম্য দূর করা জরুরি। দেশে অবৈতনিক শিক্ষা এখনো প্রাথমিক স্তরে সীমাবদ্ধ। ছেলে-মেয়ে সবার জন্য অন্তত অষ্টম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা অবৈতনিক করা উচিত।’

কোচিং ও গাইড বইনির্ভরতা এবং এ কারণে শিক্ষার ব্যয় বৃদ্ধি মাধ্যমিকে শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ায় ভূমিকা রাখছে কিনা সে বিষয়ে জানতে চাইলে রাশেদা কে চৌধুরী বলেন, ‘মাধ্যমিক স্তরে গাইড বই ও কোচিং বাণিজ্যও একটি বড় সমস্যা। এ ব্যয়ের কারণে অনেক শিক্ষার্থী ঝরে পড়ে। এছাড়া কোচিং বাণিজ্যে জড়িত শিক্ষকরা বেশির ভাগ সময়ই ক্লাসে পাঠদানে গুরুত্ব দেন না, ফলে শিক্ষার্থীরা কোচিংয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। গাইড বই ও কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে বেশ আগেই হাইকোর্ট থেকে নির্দেশনা দেয়া হলেও বিভিন্ন সময় সরকারগুলোর পক্ষ থেকে তা কার্যকর করতে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। নোট বই ও কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে কঠোর নীতি এবং যথাযথ মনিটরিং নিশ্চিত করা জরুরি। এছাড়া বর্তমানে যে অর্থ উপবৃত্তি হিসেবে দেয়া হচ্ছে তা মূল্যস্ফীতির কারণে খুবই অপর্যাপ্ত হয়ে পড়েছে। মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এটি অবিলম্বে বাড়ানো উচিত।’

দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের মাধ্যমিক স্তরে পিছিয়ে থাকার আরেকটি কারণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের অভাব। প্রাথমিক স্তরে প্রায় ৫৫ শতাংশ প্রতিষ্ঠান সরকারি হলেও মাধ্যমিক স্তরে এ হার খুবই কম। বাংলাদেশ শিক্ষা তথ্য ও পরিসংখ্যান ব্যুরোর (ব্যানবেইস) তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশের ২১ হাজার ২৩২টি মাধ্যমিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের মধ্যে ১৯ হাজার ৯৩৭টি বেসরকারি, যা মোট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রায় ৯৩ দশমিক ৯ শতাংশ। বাকিগুলোর মধ্যে ৬৯৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় আর ৬০১টি আপগ্রেডেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে ২০২৫ সালের ১২ মার্চ প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এসব আপগ্রেডেড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে নিম্ন মাধ্যমিক পর্যায়ে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধ রাখার আদেশ জারি করেছে।

ব্যানবেইসের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মাধ্যমিক স্তরে মোট শিক্ষার্থী সংখ্যা ৯০ লাখ ৬৩ হাজার ৪২২। এর মধ্যে শহরাঞ্চলে শিক্ষার্থী সংখ্যা ২৮ লাখ ৮৮ হাজার ৩৮০ আর গ্রামাঞ্চলে ৬১ লাখ ৭৫ হাজার ৪২। গ্রামাঞ্চলে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলেও সরকারি প্রতিষ্ঠান বেশি শহরাঞ্চলে। ৬৯৪টি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের মাত্র ৫৩টি গ্রাম পর্যায়ে আর বাকি ৬৪১টি শহরাঞ্চলে। মাধ্যমিক স্তরের মোট শিক্ষার্থীর মধ্যে বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৮৪ লাখ ৩৬ হাজার ৪৫২ জন আর সরকারি মাধ্যমিকে পড়ছে ৫ লাখ ৪২ হাজার ৫৫৭ জন। এছাড়া আপগ্রেডেড প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পড়ছে ৮৪ হাজার ৪১৩ জন। সে হিসেবে ৯৩ দশমিক শূন্য ৮ শতাংশ শিক্ষার্থীই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে পড়ছে।

এছাড়া, গত ৫০ বছরে দেশের বেসরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা দ্রুতগতিতে বাড়লেও সে তুলনায় সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সংখ্যা বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হয়নি। এ সময়ে মোট বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে ১২ হাজার ২৬৮টি। একই সময়ে সরকারি প্রতিষ্ঠান বেড়েছে ৪৯৬টি।

সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময় মাধ্যমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে শিক্ষা মন্ত্রণালয় গঠিত ১০ সদস্যের পরামর্শক কমিটিতে সভাপতি হিসেবে ছিলেন ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক মনজুর আহমদ। তিনি বলেন, ‘দেশে মাধ্যমিক স্তরের এ বৈষম্য দীর্ঘদিনের। এর বড় কারণ সরকার প্রাথমিক স্তরের শিক্ষার দায় কাগজে-কলমে গ্রহণ করলেও মাধ্যমিকের ক্ষেত্রে তা করেনি। এমপিওভুক্তির মাধ্যমে কিছু বিদ্যালয়কে সরকারি সহযোগিতা দেয়া হয়, কিন্তু তা পর্যাপ্ত নয়। বর্তমানে মাধ্যমিকে শিক্ষার ব্যয় মূলত পরিবারই বহন করছে। যদি মাধ্যমিক স্তরের শিক্ষাকে পুরোপুরি অবৈতনিক করা হয়। তবে এ ব্যয় হয়তো কিছুটা কমবে, কিন্তু যে বৈষম্যটা বর্তমানে রয়েছে তা পুরোপুরি যাবে না। এর জন্য একটি সুনির্দিষ্ট ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার। গাইড বই-কোচিং বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে। শিক্ষার্থীরা যেন পাঠ্যবই পড়ে এবং শ্রেণিকক্ষের পাঠদান থেকেই শ্রেণি উপযোগী প্রয়োজনীয় শিক্ষা পায় সেটি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোয় বিশেষ সহায়তা দেয়া দরকার।’

জানতে চাইলে মাধ্যমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক প্রফেসর ড. খান মইনুদ্দিন আল মাহমুদ সোহেল বলেন, ‘দরিদ্র শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়ার সঙ্গে আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটের বড় সম্পর্ক রয়েছে। দেখা যায় আর্থিক টানাপড়েনের কারণে মাধ্যমিক স্তরের অনেক শিক্ষার্থী লেখাপড়া ছেড়ে কাজ খুঁজতে বাধ্য হয়। এ সমস্যা কীভাবে সমাধান করা যায় সে বিষয়ে সরকার আন্তরিক। নির্বাচনের ইশতাহারে শিক্ষায় জিডিপির ৫ শতাংশ বরাদ্দ প্রদান, অবৈতনিক শিক্ষার স্তর বৃদ্ধিসহ এ-সংক্রান্ত বিষয়গুলো সুস্পষ্ট করা হয়েছে এবং এরই মধ্যে সরকার এসব বিষয়ে কাজ শুরু করেছে। আশা করছি এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন সম্পন্ন হলে এ ধরনের বৈষম্য কমে আসবে।’