ঢাকা | সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬,৬ আশ্বিন ১৪৩৩

শ্রীলঙ্কায় গণকবর থেকে ৫৭২ জনের কঙ্কাল উদ্ধার

উত্তর শ্রীলঙ্কার জাফনা অঞ্চলের চেম্মানি এলাকায় একটি শ্মশান সম্প্রসারণের জন্য মাটি খনন করতে গিয়ে শ্রমিকেরা হঠাৎ মানবদেহের অবশিষ্টাংশ দেখতে পান। পরে তদন্ত ও প্রত্নতাত্ত্বিক খনন শুরু হয়। আগস্টের মধ্যে খননের তৃতীয় ধাপ শেষ করে শিশু ও নবজাতকসহ ৫৭২ জনের কঙ্কালাবশেষ উদ্ধার করা হয়। মৃতদের সঙ্গে চুড়ি, স্কুলব্যাগ ও দুধের বোতলের মতো ব্যক্তিগত জিনিসও পাওয়া গেছে। এটিকে শ্রীলঙ্কায় এখন পর্যন্ত আবিষ্কৃত সবচেয়ে বড় গণকবরের স্থান বলে মনে করা হচ্ছে।

চেম্মানিতে গণকবর থাকার কথা অবশ্য আগে থেকেই বলা হয়ে আসছিল। শ্রীলঙ্কার গৃহযুদ্ধের সময় এক তরুণীকে ধর্ষণ ও হত্যার মামলায় দোষী সাব্যস্ত এক সেনাসদস্য আদালতে বলেছিলেন, নব্বইয়ের দশকের মাঝামাঝি সময়ে ৩০০ থেকে ৪০০ নিহত মানুষকে চেম্মানিতে কবর দেওয়া হয়েছিল। অধিকারকর্মীদের ধারণা ছিল, এসব মরদেহের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া বেসামরিক মানুষ থাকতে পারেন। ১৯৯৮ সালে চেম্মানিতে প্রথম খনন করে ১০টির বেশি মানব কঙ্কালও পাওয়া যায়। তবে এসব আবিষ্কার বা অভিযোগের ভিত্তিতে কোনো বিচার হয়নি।

চেম্মানির বর্তমান গণকবরটি এমন একটি এলাকায় পাওয়া গেছে, যেটি গৃহযুদ্ধের সময় কঠোর সামরিক নিয়ন্ত্রণের মধ্যে ছিল। ১৯৯৬ সালে জেয়ারুবি জয়পালানের বাবা কান্দাইয়া জয়পালানকে চেম্মানির কাছে একটি সেনা চেকপয়েন্ট থেকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয়। এরপর তিনি আর ফিরে আসেননি। জেয়ারুবি মনে করেন, নতুন আবিষ্কারের মাধ্যমে তার বাবাসহ নিখোঁজ হাজারো মানুষের ভাগ্য সম্পর্কে উত্তর পাওয়া যেতে পারে। একই এলাকায় ১৮ বছর বয়সী তামিল স্কুলছাত্রী কৃষান্তি কুমারস্বামীকে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনাও ঘটেছিল; পরে ওই ঘটনায় পাঁচ সেনাসদস্যকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং তাদের মরদেহ চেম্মানি এলাকায় পাওয়া যায়।

বর্তমান গণকবর নিয়ে তামিলদের মধ্যে নতুন করে ক্ষোভ ও ন্যায়বিচারের দাবি তৈরি হয়েছে। অনেক তামিলের বিশ্বাস, এখানে গৃহযুদ্ধের সময় বিচারবহির্ভূত হত্যার শিকার মানুষের দেহাবশেষ থাকতে পারে। শ্রীলঙ্কা মানবাধিকার কমিশনের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দাফনগুলো অবৈধ ছিল এবং বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে। দেহাবশেষগুলোর অনেকগুলো কাপড়বিহীন অবস্থায়, ঘনভাবে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে একটির ওপর আরেকটি স্তূপ করে অগভীর গর্তে পাওয়া গেছে। তবে এখনো ডিএনএ পরীক্ষা হয়নি, তাই উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের পরিচয় বা মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত হয়নি।

শ্রীলঙ্কায় ১৯৮৩ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত চলা গৃহযুদ্ধে আনুমানিক এক লাখ মানুষ নিহত এবং প্রায় ২৩ হাজার মানুষ নিখোঁজ হন। নিরাপত্তা বাহিনী ও তামিল টাইগার—উভয়ের বিরুদ্ধেই নৃশংসতা ও অপরাধের অভিযোগ রয়েছে। গত কয়েক দশকে দেশটির বিভিন্ন এলাকায় ২০টির বেশি গণকবর পাওয়া গেলেও কোনো গণকবরকে নিশ্চিতভাবে জোরপূর্বক গুম বা বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা যায়নি এবং কোনো ক্ষেত্রেই বিচার হয়নি। ২০১৮ সালে মান্নারে পাওয়া আরেকটি গণকবরে ৩৫০টির বেশি কঙ্কাল পাওয়া গেলেও তদন্ত চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছায়নি।

এখন চেম্মানির দেহাবশেষগুলো জাফনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরেনসিক বিভাগের কাছে আদালতের হেফাজতে রয়েছে। প্রত্নতত্ত্ববিদেরা অন্তর্বর্তী প্রতিবেদন তৈরি করছেন এবং দেহাবশেষের বয়স ও মৃত্যুর কারণ জানতে আরও পরীক্ষা করা হবে। প্রয়োজনে কিছু নমুনা বিদেশেও পাঠানো হতে পারে। সরকার বলছে, তারা তদন্তে সহযোগিতা করছে এবং ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে মৃতদের পরিচয় শনাক্ত করার চেষ্টা করবে। তবে শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী বেসামরিক মানুষকে হত্যা করে চেম্মানিতে কবর দেওয়ার অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে এবং বলেছে, সব অভিযোগ আদালতে প্রমাণ করতে হবে।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো—এই ৫৭২ জন কারা ছিলেন, কীভাবে তাদের মৃত্যু হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে গৃহযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হওয়া মানুষ কতজন ছিলেন। এখনো এসব প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যায়নি। জাতিসংঘ ও মানবাধিকার সংগঠনগুলো আন্তর্জাতিক সহায়তার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্তকরণ, মৃত্যুর কারণ নির্ধারণ এবং দায়ীদের চিহ্নিত করার আহ্বান জানিয়েছে। নিখোঁজদের পরিবারগুলো বহু বছর ধরে যে উত্তর খুঁজছে, তাদের কাছে এই গণকবরের তদন্ত সেই উত্তর পাওয়ার একটি সম্ভাব্য সুযোগ হয়ে উঠেছে।

সূত্র: বিবিসি