ঢাকা | বুধবার, ১২ আগস্ট ২০২৬,২৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

১২০ শিক্ষার্থীর স্কুলে উপস্থিত ৭, শিক্ষকের দাবি ‘জন্মনিয়ন্ত্রণে’ কমেছে শিক্ষার্থী

পিরোজপুরের নেছারাবাদ উপজেলার মৈশানী মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে কাগজে-কলমে শিক্ষার্থী ১২০ জন। তবে গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে বিদ্যালয়ে গিয়ে পাওয়া গেছে মাত্র সাতজন শিক্ষার্থী। ষষ্ঠ শ্রেণিতে একজন, নবম ও দশম শ্রেণিতে তিনজন করে উপস্থিত থাকলেও সপ্তম ও অষ্টম শ্রেণিতে ছিল না কোনো শিক্ষার্থী। এদিকে শিক্ষার্থী সংকটের কারণ হিসেবে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়াকে দায়ী করেছেন বিদ্যালয়ের এক শিক্ষক। পাশাপাশি এসএসসিতে ১১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে মাত্র একজন পাস, বইয়ের চাহিদা ও শিক্ষার্থী সংখ্যায় অসঙ্গতিসহ নানা প্রশ্নে বিদ্যালয়টি এখন আলোচনায়।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পঙ্কজ কুমার মণ্ডল বলেন, ‘শিক্ষার্থী সংকটের পেছনে জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতির ফলে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমে যাওয়া, স্বল্প সন্তান পরিবার এবং এলাকার ভৌগোলিক পরিবেশ দায়ী।’

এদিকে বিদ্যালয়টির ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের এসএসসি ফল নিয়েও রয়েছে হতাশাজনক চিত্র। এ বছর ১১ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র একজন। এর আগে ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দে আট পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল একজন। অর্থাৎ দুই বছরে ১৯ পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছে মাত্র দুজন।

এতে প্রশ্ন উঠেছে, কাগজে থাকা বাকি ১১৩ শিক্ষার্থী কোথায়? নিয়মিত শ্রেণিকক্ষে যদি সাত-আটজনের বেশি শিক্ষার্থী উপস্থিত না থাকে, তাহলে বিদ্যালয়ের নথিতে ১২০ শিক্ষার্থীর হিসাব কীভাবে রয়েছে এ নিয়েও দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন।

বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পঙ্কজ কুমার মণ্ডল ১১ জন শিক্ষক থাকার পরও এসএসসিতে ১১ জনের মধ্যে মাত্র একজন পাস করার বিষয়ে বিদ্যালয়ের ঝুঁকিপূর্ণ ভবনের সমস্যার কথা উল্লেখ করেন।

ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা পর্ষিয়া রানী হালদারও শিক্ষার্থী সংকটের পেছনে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন, ওয়াশরুমের সমস্যা এবং শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে ধরে রাখতে না পারার বিষয়টি উল্লেখ করেন।

তিনি বলেন, ‘এসএসসি পরীক্ষায় অন্তত ১০ থেকে ১২ পরীক্ষার্থী দেখাতে হয়। এ কারণে পাশের সপ্তগ্রাম সম্মিলনী বিদ্যালয়ের টেস্ট পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে না পারা কয়েকজন শিক্ষার্থীকে ফরম পূরণ করিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে।’

অভিযোগ রয়েছে, চলতি বছর পাশের বিদ্যালয়ের ছয়জন শিক্ষার্থীকে এনে ফরম পূরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রমের জন্য মোট ৩৪ হাজার টাকা নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা বলেন, ‘টাকার পরিমাণ এত নয়।’

শিক্ষার্থী সংখ্যার সঙ্গে পাঠ্যবইয়ের হিসাবেও দেখা দিয়েছে অসঙ্গতির প্রশ্ন। জানা গেছে, বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কার্যালয়ে ৬০ শিক্ষার্থীর চাহিদা দেখিয়ে ৬০ সেট বই নেওয়া হয়েছে। অথচ সরেজমিনে নিয়মিত উপস্থিত শিক্ষার্থীর সংখ্যা তার তুলনায়ও অনেক কম।

স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত শিক্ষক-কর্মচারী থাকার পরও তাদের একটি অংশ নিয়মিত বিদ্যালয়ে উপস্থিত থাকেন না। এতে পাঠদান ব্যাহত হচ্ছে এবং শিক্ষার্থীদের উপস্থিতিও দিন দিন কমছে।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষিকা পর্ষিয়া রানী হালদার বলেন, ‘কোনো শিক্ষক শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকলে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকতে পারেন। এছাড়া শিক্ষকরা নিয়মিত বিদ্যালয়ে আসেন।’

এ অবস্থায় বিদ্যালয়ের প্রকৃত শিক্ষার্থী সংখ্যা, উপস্থিতির হার, শিক্ষক-কর্মচারীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠ্যবইয়ের চাহিদা এবং অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণের পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখতে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিভাবক ও সচেতন নাগরিকরা।

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. জহিরুল আলম বলেন, ‘বিদ্যালয় থেকে ১১ শিক্ষার্থী এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়ে একজন পাস করেছে। অন্য বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী এনে পরীক্ষায় অংশগ্রহণের বিষয়টিও তার জানা আছে। এ বিষয়ে বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিতভাবে তথ্য চাওয়া হবে।’