বিশ্ব ফুটবলে নতুন ইতিহাস রচনা করে জাতীয় দল থেকে বিদায় নিলেন ফুটবলের ‘কিং’ লিওনেল মেসি। মঙ্গলবার দলকে বিদায় জানানোর সময় তিনি বলেছেন, আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ ও গর্বিত। এদিন আলবিসেলেস্তের হয়ে জীবনের শেষ ম্যাচ খেলেন তিনি। প্রীতি ম্যাচে বেনিনকে ৩-০ গোলে হারিয়েছে আর্জেন্টিনা। এর একটিতে তার অ্যাসিস্ট দর্শনীয়। আর তিনি পেনাল্টিতে যে গোলটি করেন, সেটাও অন্যমাত্রার চমক। কারণ, প্রতিপক্ষের গোলকিপারকে বুঝতেই দেননি বল কোন কোণায় ছুটবে। মনুমেন্তাল স্টেডিয়ামে এই গোল করার পাশাপাশি আরেকটি গোলে সহায়তা করেছেন আর্জেন্টিনার ফুটবল কিংবদন্তি। এর মধ্য দিয়ে মেসি প্রমাণ করেছেন, জাতীয় দলের হয়ে খেলার সামর্থ্য এখনো তার যথেষ্ট রয়েছে। তবে ম্যাচ শেষে বিদায়ের সিদ্ধান্তের কিছু কারণও জানিয়েছেন কিংবদন্তি এই ফরোয়ার্ড।
মেসি তার বিদায়ী ভাষণে বলেন, আজ কিছু বলা খুব কঠিন। তিনি জানান, এ মুহূর্তে তার ‘প্রথম ভাবনাটা’ তার বাবা সম্পর্কে। গত ৮ই আগস্ট মারা গেছেন তিনি।

আর্জেন্টাইন এই তারকাকে মাইক্রোফোন দেয়া হয় ড্রোন লাইট শোর পর। ওই আয়োজনে মেসির বর্ণাঢ্য ক্যারিয়ারের বিভিন্ন মুহূর্ত ফুটিয়ে তোলা হয়, যা দর্শকদের মুগ্ধ করে। এরপর লোকগানের শিল্পী সোলেদাদ পাস্তোরুত্তি মেসির উদ্দেশে একটি গান উৎসর্গ করেন। মেসি বলেন, আর্জেন্টিনার হয়ে আর খেলতে না পারাটা খুব কষ্টের হবে। আমি আপনাদের শপথ করে বলছি, সারা জীবন এখানে আসতে চাই। আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা ছিল আমার জীবনে ঘটে যাওয়া সবচেয়ে সুন্দর ঘটনা। মেসি বলেন, ২০২৬ বিশ্বকাপে অংশ নেয়া তার জন্য ‘অনেক বেশি’ হয়ে গেছে। বিশেষ করে তাকে ‘যেসব কিছুর মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে’ সেগুলোর পরও।
তিনি বলেন, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ম্যাচটি আমাদের ওপর অনেক বেশি চাপ ফেলেছিল। তার এই মন্তব্যের পর গ্যালারিতে ‘তুমি লাফ না দিলে তুমি একজন ইংরেজ’-এমন স্লোগান শুরু হয়। এমনকি মেসির পেছনে থাকা আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রাও লাফাতে শুরু করেন। আর্জেন্টিনার এই কিংবদন্তি বলেন, ফাইনালেও দল ‘সব সময়ের মতোই লড়াই করেছে’। তবে আলবিসেলেস্তে স্পেনের কাছে হেরে যাওয়ায় টানা দ্বিতীয়বার বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হতে না পারার আক্ষেপও প্রকাশ করেন তিনি। মেসি বলেন, আমি আমার সতীর্থদের ধন্যবাদ জানাতে চাই। তারা আমাকে বিশ্বকাপ জয়ের স্বপ্ন পূরণ করতে সহায়তা করেছেন। আমরা যেকোনো দলের বিপক্ষে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছি, কারণ আমরা মাঠে নিজেদের জীবন উজাড় করে দিয়েছি।

সমর্থকদের উদ্দেশে মেসি বলেন, তিনি তাদের অনেক মিস করবেন। তিনি বলেন, আমি সৌভাগ্যবান যে পুরো বিশ্বে ঘুরে বেড়াতে পেরেছি। কারণ আমরা দেশের বিভিন্ন জায়গায় খেলেছি এবং সর্বত্রই মানুষ আমাকে অনেক উষ্ণতা দিয়ে স্বাগত জানিয়েছে। আমি যা কিছু পেয়েছি ও যেসব অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গিয়েছি, সেসবের জন্য আমি ভীষণ কৃতজ্ঞ।
এরপর সমর্থকদেরও ধন্যবাদ জানান তিনি। বিপুল খরচের পরও তারা সব সময় স্টেডিয়ামগুলো পূর্ণ করে রেখেছেন বলে প্রশংসা করেন মেসি। তিনি বলেন, আর্জেন্টিনার হয়ে খেলতে গিয়ে তার সব সময়ই মনে হয়েছে, যেখানেই খেলি না কেন, আমরা যেন নিজেদের ঘরের মাঠেই খেলছি। এই স্টেডিয়ামেই আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে আনন্দের মুহূর্তগুলোর একটি পেয়েছি, বিশ্বকাপ জয়ের পর এখানে ফিরে আসার সময়। আর আজ আমার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বেদনার দিন। আর্জেন্টিনার জার্সি পরা আমি খুব মিস করব। এখন আমি গ্যালারিতে বসে এই দল এবং আমার পরে যারা আসবে, তাদের সমর্থন করব।
মেসি বলেন, আর্জেন্টিনা ঐক্যবদ্ধ থাকলে সবার চেয়ে শক্তিশালী। একই সঙ্গে তিনি স্বীকার করেন, কঠিন সময় আসবে। কারণ কোনো দলই সব সময় জিততে পারে না। তবে সমর্থকদের আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি ঐক্যবদ্ধ থাকতে হবে। কারণ, কিছু মানুষ আছে যারা জাতীয় দলকে সমস্যায় পড়তে দেখতে চায়। আমি তোমাদের ভালোবাসি এবং তোমাদের মিস করব। আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি কৃতজ্ঞ, আর্জেন্টাইন হতে পেরে আমি গর্বিত। আর আমরা একসঙ্গে যে স্বপ্ন দেখেছিলাম, তা পূরণ করতে পেরেছি। এটাই আমার সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি।
এরপর মেসি পুরো স্টেডিয়াম প্রদক্ষিণ করেন। তার তিন ছেলে সঙ্গে ছিল। মাঠ ছাড়ার সময় আর্জেন্টিনা দলের খেলোয়াড়রা তাকে গার্ড অব অনার দেন।







