ঢাকা | বুধবার, ২৪ জুন ২০২৬,১০ আষাঢ় ১৪৩৩

ফুটবল জাদুকর মেসির জন্মদিন আজ

আজ ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় লিওনেল মেসির জন্মদিন। আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরে জন্ম নেওয়া মেসি দারিদ্র্য, শারীরিক সমস্যাসহ নানা বাধা পেরিয়ে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছেছেন। বার্সেলোনা ও আর্জেন্টিনার হয়ে অসংখ্য শিরোপা জয়ের পাশাপাশি ২০২২ বিশ্বকাপ জিতে তিনি নিজের কিংবদন্তি মর্যাদা আরো সুদৃঢ় করেন। ৩৯ বছর বয়সেও তিনি বিশ্ব ফুটবলে উজ্জ্বল উপস্থিতি রেখে চলেছেন।

ফুটবল ইতিহাসে অনেক কিংবদন্তি আছেন। কেউ অনেক শিরোপা জিতেছেন, কেউ অসংখ্য রেকর্ড ভেঙেছেন, কেউ প্রজন্মের পর প্রজন্মকে মুগ্ধ করেছেন। কিন্তু খুব কম ফুটবলারই আছেন, যারা ‘মেসি’ হতে পেরেছেন।

লিওনেল আন্দ্রেস মেসি। যার পরিচয় ফুটবলার, তবে জাদুকর বললেও ভুল হবে না। মেসি এমন একটা নাম, যা শুনলে হৃদয়ে তৃপ্তি লাগে। চোখ বন্ধ করলে খুলে যায় স্মৃতির দরজা, চোখে ভাসে অমর সব কীর্তি।

আজ ২৪ জুন। ১৯৮৭ সালের এই দিনে আর্জেন্টিনার রোজারিও শহরের এক সাধারণ পরিবারে জন্ম নিয়েছিলেন তিনি। চার ভাইবোনের মাঝে ছিলেন তৃতীয়।

বাবা হোর্হে হোরাসিও মেসি কাজ করতেন একটি স্টিল কারখানায়। মা সেলিয়া মারিয়া কুচ্চিত্তিনি ছিলেন পরিচ্ছন্নতাকর্মী। ফলে বলা যায়, ‘নুন আনতে পান্তা ফুরায়’ ছিল পরিবারের অবস্থা।

অর্থবিত্ত হয়তো ছিল না, ছিল না বিলাসী জীবন। কিন্তু ভালোবাসার কমতি ছিল না। আর ছিল ফুটবল। পরিবারের প্রায় সবাই ছিলেন ফুটবলপ্রেমী। ছোট্ট লিও বাবা ও ভাইদের সাথে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বল পায়ে কাটিয়ে দিতেন।

সেই ফুটবলই হয়ে উঠেছিল তার পৃথিবী। যখন অন্য শিশুরা খেলনা নিয়ে ব্যস্ত, তখন ছোট্ট লিও বল নিয়ে ছুটে বেড়াতেন রোজারিওর অলিগলিতে। বল যেন তার পায়ের সাথে কথা বলত, আর সে সেই ভাষা বুঝত।

খুব অল্প বয়সেই বোঝা গিয়েছিল, ছেলেটি অন্যদের মতো নয়। সবার আগে সেটা বুঝেছিলেন তার দাদি, সেলিয়া। তিনিই হাত ধরে তাকে নিয়ে গিয়েছিলেন স্থানীয় ক্লাব গ্রান্ডোলিতে। তার বিশ্বাস ছিল এই ছেলে একদিন অনেক দূর যাবে।

ফুটবল ইতিহাসে দাদির নাম খুব বেশি লেখা হয় না। অথচ মেসির গল্পে তিনি এক অনিবার্য চরিত্র। দাদি আজ নেই। কিন্তু মেসি ভুলেননি তাকে। প্রতিবার মাঠে নামলেই খুঁজেন দাদিকে।

গোল করার পর আকাশের দিকে তাকিয়ে দুই হাত উঁচু করে যে উদযাপন করেন মেসি, সেটি দাদির প্রতি তার নিবেদন। ভালোবাসার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাবার এর চেয়ে সুন্দর ভাষা আর কী হতে পারে?

অবশ্য ক্লাবে ভর্তি হলেও বয়স কম হওয়ায় প্রথমে তাকে দলে নিতে চাইছিলেন না কোচ। কিন্তু একদিন এক খেলোয়াড় দেরিতে আসায় সুযোগ মেলে ক্ষুদে মেসির। আর সেই সুযোগই বদলে দেয় সবকিছু।

মাঠে নেমেই এমন ফুটবল খেলেছিলেন যে উপস্থিত সবাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল। সেদিনই অনেকের মুখে শোনা গিয়েছিল, ‘এই ছেলে একদিন ম্যারাডোনার মতো হবে।’

কিন্তু সময়ের পরিহাস, পরে পৃথিবী বলেছে, ম্যারাডোনার মতো নয়, সে হয়েছে মেসির মতো। আর পুরো পৃথিবী এখন তার মতো হতে চায়। সর্বকালের সেরা হতে চায়। তবে এই গল্পটা এত সহজ ছিল না।

১৯৯৫ সালে রোজারিওর ঐতিহ্যবাহী ক্লাব নিওয়েলস ওল্ড বয়েজে যোগ দেন মেসি। বয়স বাড়ার সাথে সাথে বাড়তে থাকে তার খ্যাতিও। কিন্তু মাত্র ১১ বছর বয়সে ধরা পড়ে গ্রোথ হরমোন ডেফিসিয়েন্সি। চিকিৎসার খরচ ছিল পরিবারের সামর্থ্যের বাইরে।

ধীরে ধীরে স্বপ্নের আকাশে মেঘ জমতে শুরু কররে। কত প্রতিভা তো এভাবেই হারিয়ে যায়। কত নাম ইতিহাসের পাতায় ওঠার আগেই মুছে যায়। মেসির ক্ষেত্রেও হয়তো তাই হতো। কিন্তু নিয়তি তখনও তার জন্য অন্য কিছু লিখে রেখেছিল।

যখন সব শেষ মনে হচ্ছিল, ঠিক তখনই গল্পে আসে বার্সেলোনা। ক্লাবটির ক্রীড়া পরিচালক কার্লেস রেক্সাচ মেসির খেলা দেখে এতটাই মুগ্ধ হন যে চুক্তির জন্য কাগজ না পেয়ে একটি ন্যাপকিনে লিখেই সমঝোতা করেন।

ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ‘ন্যাপকিন চুক্তি’ জন্ম নেয় সেদিন। পরের গল্প আজ পৃথিবীর মুখস্থ। বার্সা সেদিন শুধু একজন খেলোয়াড় নেয়নি, তারা ফুটবল ইতিহাসের গতিপথটাই বদলে দিয়েছিল।

লা মাসিয়াতেই শুরু হয়েছিল মেসির স্বপ্ন যাত্রা, যা পরে পরিণত হয় কিংবদন্তিতে। মাঝের গল্পটা ইতিহাস। বার্সেলোনার এই মহানুভবতার কৃতজ্ঞতা দারুণভাবে আদায় করেন মেসি।

তাদের জার্সিতে ৭৭৮ ম্যাচে ৬৭২ গোল করেন তিনি। সেই সাথে ১০টি লা লিগা, ৪টি চ্যাম্পিয়ন্স লিগ, ৭টি কোপা দেল রে, ৩টি ক্লাব বিশ্বকাপ- একটির পর একটি শিরোপা জিতে তিনি নিজেকে নিয়ে গেছেন অন্য এক উচ্চতায়।

ব্যক্তিগত অর্জনের তালিকাও বিস্ময় জাগানিয়া। আটবার ব্যালন ডি’অর, একাধিকবার ফিফা দ্য বেস্ট, ইউরোপিয়ান গোল্ডেন শু, বিশ্বকাপ গোল্ডেন বল- ফুটবলারের পক্ষে জেতার মতো প্রায় সব পুরস্কারই তার ট্রফি কেবিনেটে জায়গা পেয়েছে।

এসব সংখ্যা তার মহত্ত্বের প্রমাণ হতে পারে, ব্যাখ্যা নয়। মেসির ব্যাখ্যা লুকিয়ে আছে সেই ড্রিবলে, যেখানে প্রতিপক্ষরা সব এক হয়েও অসহায় হয়ে পড়ে। তার ব্যখ্যা লুকিয়ে আছে সেই পাসে, যা চোখে দেখার আগেই তিনি কল্পনা করে ফেলেন।

তার বিশেষত্ব লুকিয়ে আছে সেই বাঁ-পায়ে, যা দিয়ে তিনি সবুজ ঘাসের ওপর ছবি আঁকেন। ফুটবলের ইতিহাসে অনেক রাজা আছেন। কিন্তু খুব কম শিল্পী আছেন। মেসি সেই বিরল শিল্পীদের একজন। ফুটবলের দ্য ভিঞ্চি তিনি, ফুটবল যেন মোনালিসা।

তবুও একটা আক্ষেপ বারবার তাকে তাড়া করেছিল। আর্জেন্টিনার জার্সিতে বড় কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা নেই। যা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিলো, যন্ত্রণা দিচ্ছিল।

২০১৪ বিশ্বকাপ ফাইনালে হার, ২০১৫ ও ২০১৬ কোপা আমেরিকার ফাইনালে পরাজয়- সবকিছু মিলিয়ে একসময় জাতীয় দল থেকেই অবসরের ঘোষণা দিয়েছিলেন তিনি।

কিন্তু মহানায়কদের গল্প হার মেনে নেয়ার গল্প নয়। তারা ফিরে আসেন। মেসিও ফিরেছিলেন। ২০২১ সালে মারাকানায় ব্রাজিলকে হারিয়ে জেতেন কোপা আমেরিকা। ২৮ বছরের অপেক্ষা শেষ হয় আর্জেন্টিনার।

কিন্তু আরো বড় কিছু তখনও বাকি ছিল। তারপর এলো ২০২২ সালের ১৮ ডিসেম্বরের সেই অবিস্মরণীয় রাত। ফুটবল ইতিহাসের সেরা ফাইনাল উপহার দিয়ে, মহাকাব্যিক এক লড়াইয়ের পর দুই হাতে তুলে নেন বিশ্বকাপ ট্রফি।

লুসাইল স্টেডিয়ামে বিশ্বকাপের ট্রফি দুই হাতে তুলে নেয়ার মুহূর্তটি কেবল একটি ছবি নয়; সেটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্যগুলোর একটি। যা আবেগাপ্লুত করেছিল সমালোচকদেরও, তাদের চোখেও এনে দেয় পানি।

সেই মুহূর্তে শুধু বিশ্বকাপ জেতেননি মেসি, তিনি জিতে নিয়েছিলেন ইতিহাসকে। জিতে নিয়েছিলেন সময়কে। জিতে নিয়েছিলেন সব বিতর্ককে। জিতে যান নিজের সাথে।

বিশ্বকাপের পরও থেমে যাননি তিনি। ২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রে অনুষ্ঠিত কোপা আমেরিকাতেও আর্জেন্টিনাকে শিরোপা জেতান। জাতীয় দলের ইতিহাসে সবচেয়ে সফল অধিনায়কদের একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন।

আর সব গুঞ্জন দূরে ঠেলে ২০২৬ বিশ্বকাপের মঞ্চেও তিনি আছেন। অনেকে ভেবেছিল কাতারেই হয়তো শেষ হয়ে যাবে গল্পটা। কিন্তু ৩৯ বছর বয়সেও তিনি আর্জেন্টিনার জার্সি গায়ে মাঠে নামছেন।

এবারের বিশ্বকাপটাও হয়ে উঠেছে মেসিময়। তিনি আর কেবল একজন ফুটবলার নন। তিনি এক জীবন্ত ইতিহাস। প্রতিটি ম্যাচেই তিনি যেন নতুন নতুন কীর্তিময় অধ্যায় লিখছেন আর পৃথিবী মুগ্ধ হয়ে তা পড়ছে।

ইতোমধ্যেই বিশ্বকাপে পেয়েছেন নিজের প্রথম হ্যাটট্রিক, দখলে নিয়েছেন বিশ্বকাপের সর্বকালের সেরার সিংহাসন। বিশ্বকাপ ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলদাতা এখন তিনি (১৮)। সর্বোচ্চ এসিস্ট আর সবচেয়ে বেশি ম্যাচ খেলার রেকর্ডও দখলে রেখেছেন।

২০২৬ বিশ্বকাপ হয়তো তার শেষ বিশ্বকাপ। কিন্তু এটি বিদায়ের গল্প নয়। কারণ মেসি থেকে যাবেন যুগ থেকে যুগান্তর। ইতিহাসে- গল্পে, পরিসংখ্যানে-অর্জনে। থাকবেন বিস্ময় হয়ে, গর্ব হয়ে।

পৃথিবীতে হয়তো আরো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন আসবে। আরো ব্যালন ডি’অর জয়ী জন্ম নেবে। কিন্তু আরেকজন মেসি? হয়তো না।