জাল শিক্ষা সনদ জমা দেওয়ার অভিযোগে চাকরিচ্যুত এক কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে পুনরায় বহাল করার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশের বিরুদ্ধে। একই সঙ্গে বরখাস্তের সময়কালকে ‘বিনা বেতন ও ভাতায় সাধারণ ছুটি’ হিসেবে গণ্য করে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তাকে ব্যাংকিং খাতের সুশাসনের চরম পরিপন্থি হিসেবে দেখছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
২০২৪ খ্রিষ্টাব্দের ৫ আগস্টে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ এক অভিনব ও বিতর্কিত সিদ্ধান্তের মাধ্যমে অন্তত ১০ হাজার কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে। এর পর থেকে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে একটি বিশেষ রাজনৈতিক দলের অনুসারীদের নিয়োগ দিয়েছে ব্যাংকটি। যার মধ্যে সনদ জালিয়াতির অভিযোগে চাকরি হারানোর ব্যক্তিও রয়েছেন।
ইসলামী ব্যাংকের বিভিন্ন চিঠিতে দেখা গেছে, ব্যাংকটিতে যোগদানের সময় মো. মহিবুল আলম চৌধুরী চট্টগ্রামের সাদার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি ভুয়া ও জাল সনদ জমা দেন। ব্যাংকের নিজস্ব অভ্যন্তরীণ তদন্তে জালিয়াতির বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ায় দুই বছর আগে তাকে চাকরি থেকে বরখাস্ত করা হয়। চব্বিশের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ২০২৫ খ্রিষ্টাব্দের ২৫ নভেম্বর তিনি পুনর্বহালের জন্য আবেদন করেন। ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দের ৭ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের সভায় তার আপিলটি উপস্থাপন করা হয়। পর্যদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে চাকরিতে স্থায়ী নিয়োগ মঞ্জুর করা হয়। নামমাত্র শাস্তি হিসেবে আগামী দুই বছরের জন্য তার পদোন্নতি স্থগিত রাখা হয়েছে। বর্তমানে তিনি কোনো বড় শাস্তি ছাড়াই পূর্বের মর্যাদা ফিরে পেয়ে ইসলামী ব্যাংকের রাঙ্গুনিয়া শাখার ম্যানেজার (অপারেশনস) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে মহিবুল আলম চৌধুরী জানান, তিনি সনদ জমা দিয়েছিলেন ২০১৭ খ্রিষ্টাব্দে। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ যাচাই করেছে ২০২৪ খ্রিষ্টাব্দে। তারা যাচাই করার সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের আগের ম্যানেজমেন্ট ছিল না। সেখানে সবকিছু ঠিক থাকলেও আমার জমা দেওয়া থিসিস পেপারটি ছিল না। এটা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভুল। তবে আগের ম্যানেজমেন্ট না থাকার কারণে আমাকে নতুন করে থিসিস পেপার তৈরি করে জমা দিতে হয়েছে। তারপর তারা আমাকে নতুন করে সনদ দেয়। ওই সনদ দিয়ে ব্যাংকে চাকরি পুনর্বহালের আবেদন করলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ সন্তুষ্ট হয়ে আমাকে চাকরি ফেরত দেয়।
এদিকে ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট শাখার সিনিয়র অফিসার মোহাম্মদ ওয়ালী উল্যাহ যখন মিরপুর-১ শাখায় জুনিয়র অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন, তখন তিনি ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির একটি এমবিএ সনদ জমা দেন। সনদটিতে কোনো ছাত্র আইডি ছিল না। পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের যাচাইয়ে সনদটি ভুয়া প্রমাণিত হয়। ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামাল উদ্দিন জসিম স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে তার বিরুদ্ধে ব্যাংকের স্থায়ী নির্দেশাবলি, নিয়মকানুন লঙ্ঘন এবং বিশ্বাসের অবমাননার অভিযোগ আনা হয়। ব্যাংকের মানবসম্পদ নীতির ষষ্ঠ অধ্যায় অনুযায়ী এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও তাকে চূড়ান্ত বরখাস্ত না করে সাদা কাগজে ১৫ দিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়া হয়েছে।
বিতর্কিত দারুল ইহসানের সনদে শত শত নিয়োগ সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০১৬ খ্রিষ্টাব্দে সনদ জালিয়াতি ও নানা অনিয়মের কারণে সরকার কর্তৃক বন্ধ হয়ে যাওয়া ‘দারুল ইহসান বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদধারী শত শত ব্যক্তি ইসলামী ব্যাংকে বহাল তবিয়তে চাকরি করছেন।
অভিযোগ উঠেছে, একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের প্রভাব খাটিয়ে এবং নিষিদ্ধ ঘোষিত বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিতর্কিত সনদ ব্যবহার করে অভিযুক্তরা ব্যাংকটিতে নিয়োগ পেয়েছিলেন, যা তারা এখনও টিকিয়ে রেখেছেন। জাল সনদের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার পরও রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় শাস্তির বদলে পুনর্বহাল কিংবা নামমাত্র কারণ দর্শানোর নোটিশ দেওয়ার এই সংস্কৃতি ইসলামী ব্যাংকের সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিয়েছে। ভুক্তভোগীদের মতে, ব্যাংকিং খাতের এমন অনিয়ম ও আপসকামিতা সাধারণ আমানতকারী ও জনগণের মধ্যে চরম আস্থা সংকটের কারণ হতে পারে।





