র্যাবের গোয়েন্দা প্রধান থাকার সময় কর্নেল জিয়াউল আহসানের নেতৃত্বে ২০১০ সালে বরগুনার পাথরঘাটায় বলেশ্বরী নদীতে কয়েকজন হাত ও চোখ বাঁধা ব্যক্তিকে নিয়ে বিশেষ অভিযানে যাওয়া হয়। চরদুয়ানি ঘাট থেকে একটি বোটে করে নদীর মোহনার উদ্দেশ্যে আমরা যাত্রা করি। বন্দিদের বোটের ভেতরে রাখা হলে আমি, মেজর সাব্বির ও কর্নেল জিয়াউল আহসানসহ তার সঙ্গে আসা অফিসাররা বোটের ছাদে গিয়ে বসি। ঘণ্টাখানেক চলার পর তারা ছাদ থেকে নিচে নেমে যায়। কিছুক্ষণ পর আমি নিচে কী হচ্ছে দেখার জন্য একটু সামনে গিয়ে দেখি, জিয়াউলের নেতৃত্বে চোখ ও হাত বাঁধা একজনকে বোটের কিনারায় নিয়ে তাঁর শরীরের সঙ্গে ভারী বস্তা বাঁধা হচ্ছে। বস্তা বাঁধার পর তাকে গুলি করে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে পেট ছুরি দিয়ে কেটে নদীতে ফেলে দেওয়া হয়। আমি পেছনে চলে এলে কিছুক্ষণ পর আরও ৪-৫ রাউন্ড গুলির শব্দ শুনি এবং পানিতে লাশ ফেলার মতো শব্দ পাই।
বৃহস্পতিবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জবানবন্দিতে এসব কথা বলেন সেনা কর্মকর্তা ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) মো. মনিরুল হক।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় শতাধিক মানুষকে গুম, নির্যাতন ও খুনের ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বরখাস্ত সেনা কর্মকর্তা মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সপ্তম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন তিনি।
জবানবন্দিতে মনিরুল বলেন, জিয়াউল বলেশ্বরী নদীতে অভিযানের ২-৪ দিন পর শরণখোলা এলাকায় একটি পেট কাটা লাশ নদীতে ভেসে ওঠে, যা স্থানীয় থানার মাধ্যমে প্রয়োজনীয় কার্যক্রম শেষে দাফন করা হয়। কিন্তু এই লাশ ভেসে ওঠার খবর এবং এ ব্যাপারে আরও কী তথ্য পাওয়া যায়, তা জানার জন্য র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং থেকে জিয়াউল মেজর সাব্বিরকে নির্দেশ দেন। সাব্বির তখন ব্যাটালিয়নের নিজস্ব গোয়েন্দা এবং স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় খোঁজখবর নেওয়ার চেষ্টা করেন। এর মাত্র কয়েক দিন পরই আমরা পত্রিকার মাধ্যমে জানতে পারি, ওই ভেসে ওঠা লাশটি তৎকালীন বিডিআর সদস্য নজরুলের। বিডিআরের গোয়েন্দা সংস্থা ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হয়, ওই লাশটি নজরুলের। সংবাদবিশ্লেষণ
জবানবন্দিতে তিনি আরও বলেন, বরিশালে এসে বোট ব্যবহার করে যে অভিযানগুলো ইন্টেলিজেন্স উইং করেছিল, সেখানে একজন মাঝির বোট অনেকবার ব্যবহার করা হয়েছিল। ওই মাঝির নাম ছিল আলকাস। এই আলকাস মাঝির মাধ্যমে অনেক গোপন তথ্য ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল বলে জিয়াউল সাব্বিরকে জানান। এরপর বেশ কিছু দিন আর আলকাস মাঝির বোট ব্যবহার করা হয়নি। একসময় জিয়াউল সাব্বিরকে নির্দেশ দেন, আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট (হত্যা) করতে হবে এবং তা তাকেই করতে হবে। সাব্বির আমাকে জানান, তিনি জিয়াউলের কাছ থেকে আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করার যে নির্দেশ পেয়েছিলেন, তা পালন করতে অপারগতা প্রকাশ করেছেন। এই ঘটনার কয়েক দিন পর আলকাস মাঝির পরিবার আমাদের র্যাব-৮ ব্যাটালিয়নে এসে জানায়, আলকাস মাঝিকে পাওয়া যাচ্ছে না, র্যাব-৮ তার কোনো খবর জানে কি না। আলকাস মাঝির এই নিখোঁজ হওয়ার বিষয়টি জেনে আমি নিশ্চিত হই, যেহেতু মেজর সাব্বির আলকাস মাঝিকে এলিমিনেট করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন, সুতরাং ইন্টেলিজেন্স উইং-ই তাকে নিখোঁজ করেছে।
জবানবন্দিতে মনিরুল আরও বলেন, আমার বর্তমান বয়স ৬২ বছর। আমি ২০০৮ সালের অক্টোবর মাসের শেষের দিক থেকে ২০১২ সালের মার্চ মাস পর্যন্ত র্যাব-৮ বরিশালে অধিনায়ক হিসেবে প্রেষণে দায়িত্ব পালন করি। এ সময় আমার সঙ্গে উপ-অধিনায়ক হিসেবে ছিলেন মেজর কুতুব এবং মেজর সাব্বির রহমান ওসমানী। অধিনায়ক হিসেবে প্রতি মাসে র্যাব সদর দপ্তরে সিও’স কনফারেন্সে আমাকে যোগ দিতে হতো। সেই কনফারেন্সে সভাপতিত্ব করতেন র্যাবের মহাপরিচালক। অধিনায়করা বিভিন্ন বিষয়ে দিকনির্দেশনা চাইতেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে অধিনায়কদের কাছে নির্দেশনা চাওয়া হয়, দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসীদের ঝুঁকি নিয়ে র্যাবের সদস্যরা গ্রেপ্তার করে থানায় সোপর্দ করলে হাই-প্রোফাইল সন্ত্রাসীরা আইনের ফাঁকফোকর দিয়ে আবার বেরিয়ে এসে পুনরায় অপরাধের সঙ্গে জড়িত হলে, সে ক্ষেত্রে র্যাবের করণীয় কী? তখন তৎকালীন র্যাব মহাপরিচালক মোখলেছুর রহমান ‘ওয়াজিবাতুল কতল’ শব্দটি ব্যবহার করে বলেন, অপরাধীদের ক্ষেত্রে ওই অনুযায়ী ব্যবস্থা নিতে, অর্থাৎ হত্যা করার নির্দেশ দেন।
জবানবন্দিতে তিনি বলেন, র্যাবে যোগদান করার পর জানতে পারি, র্যাবের কর্মপরিধি হলো—সন্ত্রাস দমন, অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার, মাদক ও চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ। এসব কাজের জন্য অন্যান্য কাজের সঙ্গে আমরা দেশব্যাপী টহল ডিউটি করতাম। র্যাব-৮-এর আওতায় ১১টি জেলা ছিল, যার প্রায় সবগুলোই উপকূলীয়। সুন্দরবনসহ এসব এলাকায় ডাকাতি তৎপরতা ছিল অতিমাত্রায়। তৎকালীন ব্যাটালিয়নের কাছে তেমন কোনো ইন্টেলিজেন্স ইকুইপমেন্ট ছিল না, যার মাধ্যমে অপরাধীদের শনাক্ত করা যায়। এসব কাজে র্যাব সদর দপ্তরের ইন্টেলিজেন্স উইং ব্যাটালিয়নগুলোকে প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত দিয়ে সহযোগিতা করত। জিয়াউল এবং তার উইংয়ের অন্যান্য অফিসার ও সাধারণ সদস্যসহ বেশ কয়েকটি অভিযান পরিচালনা করেছেন। তখন তারা আমাদের সহযোগিতা নিতেন। এসব প্রশাসনিক সহায়তার মধ্যে ছিল—খাবারদাবারের ব্যবস্থা, ভারী বস্তার ব্যবস্থা করা ও পাথরঘাটায় বোট ঠিক করে রাখা ইত্যাদি। এরকম অন্তত তিনটি অপারেশনের কথা আমার মনে পড়ছে, যার একটি ভোলায় এবং অন্য দুটি সুন্দরবন এলাকায়। ভোলার অপারেশনে অপারেশন শেষে দুজন ডাকাতের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার হয়। কিন্তু সার্বিকভাবে আমার কাছে মনে হয়েছে, পুরো ঘটনাটি সাজানো। দুজনকে আগেই টার্গেট এলাকায় নিয়ে হত্যা করা হয়েছে।
জবানবন্দিতে মনিরুল বলেন, সুন্দরবনের অপারেশনগুলোর একটি ছিল কুখ্যাত রাজু ডাকাতকে ধরার জন্য পরিচালিত। সেখানে র্যাব সদর দপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) কর্নেল মুজিব, মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার সোহায়েলসহ ইলেকট্রনিক ও প্রিন্ট মিডিয়ার অনেক সাংবাদিক ছিলেন। ওই অভিযানে ডিরেক্টর ইন্টেলিজেন্স জিয়াউল আহসানও ছিলেন। এই অপারেশনের বিষয়ে পরবর্তীতে বিভিন্ন গণমাধ্যমে একাধিকবার আলোচনা হয়েছে এবং ভিডিওচিত্র প্রদর্শিত হয়েছে। যদিও এটি রাজু ডাকাতকে ধরার পরিকল্পিত অপারেশন ছিল, তবে তাকে সেখানে পাওয়া যায়নি; বরং ২-৩টি লাশ উদ্ধার করা হয়। অপর সুন্দরবনের অপারেশনটি ছিল নিশানখালী এলাকায়। এটি ছিল ত্রিমাত্রিক অপারেশন। এখানেও ২-৩টি লাশসহ অস্ত্র উদ্ধার হয়েছিল। তবে এ দুটি ক্ষেত্রেই আমার কাছে মনে হয়েছে, টার্গেট এলাকায় ডাকাতদের আগেই গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল।




