ঢাকা | শুক্রবার, ২৪ জুলাই ২০২৬,৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

এবারও এসএসসিতে গ্রেস নেই, ‘যা লিখেছে, তাই নম্বর’ নীতিতে মূল্যায়ন

চলতি বছরের মাধ্যমিক স্কুল সার্টিফিকেট (এসএসসি) ও সমমান পরীক্ষার ফল প্রস্তুতের কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে। উত্তরপত্র মূল্যায়ন, প্রধান পরীক্ষকদের মাধ্যমে পুনঃযাচাই, বোর্ডে নম্বর পাঠানো, নম্বর ইনপুট, জিপিএ নির্ধারণসহ ফল তৈরির প্রায় সব কার্যক্রম শেষ হয়েছে। বর্তমানে চলছে চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই। সবকিছু পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলে আগামী ২৭ বা ২৮ জুলাইয়ের মধ্যেই ফল শতভাগ প্রস্তুত হবে। এরপর শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন সাপেক্ষে নির্ধারণ করা হবে ফল প্রকাশের তারিখ।

বাংলাদেশ আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান জানিয়েছেন, ২৭ অথবা ২৮ জুলাইয়ের মধ্যে রেজাল্ট শতভাগ প্রস্তুত হবে। এরপর বিষয়টি মন্ত্রণালয়ের ওপর নির্ভর করবে। অর্থাৎ বোর্ডের প্রস্তুতি শেষ হলেও ফল প্রকাশের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে শিক্ষা মন্ত্রণালয়।

তবে এবারের ফল নিয়ে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, গত বছরের মতো এবারও উত্তরপত্র মূল্যায়নে কোনো ধরনের ‘গ্রেস মার্ক’, অতিরিক্ত নম্বর কিংবা সহানুভূতিশীল মূল্যায়নের সুযোগ রাখা হয়নি।

শিক্ষা বোর্ড সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্র জানিয়েছে, পরীক্ষার্থী উত্তরপত্রে যা লিখেছে, কেবল সেই উত্তর এবং নির্ধারিত নম্বর বণ্টনের ভিত্তিতেই মূল্যায়ন করা হয়েছে। সীমার কাছাকাছি নম্বর পাওয়া কোনো পরীক্ষার্থীকে অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে পাস করিয়ে দেওয়া কিংবা গ্রেড পরিবর্তনের সুযোগ এবারও রাখা হয়নি।

বোর্ড কর্মকর্তারা বলছেন, কয়েক বছর ধরে অস্বাভাবিক উচ্চ পাসের হার এবং বিপুলসংখ্যক জিপিএ-৫ পাওয়া নিয়ে নানা প্রশ্ন উঠেছিল। বিশেষ করে উত্তরপত্র মূল্যায়নে অতিরিক্ত নম্বর, সহানুভূতিশীল মূল্যায়ন ও তথাকথিত ‘গ্রেস মার্ক’ দেওয়ার অভিযোগও ছিল। সেই প্রেক্ষাপটে গত বছর থেকে মূল্যায়ন ব্যবস্থায় বড় ধরনের পরিবর্তন আনা হয়। উদ্দেশ্য ছিল, ফলাফলে যেন শিক্ষার্থীর প্রকৃত শেখার সক্ষমতা প্রতিফলিত হয়, কৃত্রিমভাবে সাফল্যের হার বাড়ানো নয়। এবারও সেই নীতিতেই অনড় থেকেছে শিক্ষা বোর্ডগুলো।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের এক কর্মকর্তা বলেন, আমরা এবারও ‘যা লিখেছে, তাই নম্বর’ নীতিতেই খাতা মূল্যায়ন করেছি। কোথাও গ্রেস মার্ক বা অতিরিক্ত নম্বর দেওয়ার সুযোগ রাখা হয়নি। পরীক্ষার্থী যে উত্তর লিখেছে, তার ভিত্তিতেই নম্বর দেওয়া হয়েছে। ফলে ফলাফলেও তার সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাবে।

আরেক কর্মকর্তা জানান, ফল প্রস্তুতের অধিকাংশ কাজ শেষ হলেও এখনো চূড়ান্ত যাচাই-বাছাই বাকি রয়েছে। তাই সামগ্রিক ফলাফল নিয়ে এখনই কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। ফলের সব তথ্য চূড়ান্ত হওয়ার পরই শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের জন্য পাঠানো হবে।

এদিকে বিভিন্ন মহলে এবারের সম্ভাব্য পাসের হার ও জিপিএ-৫ নিয়ে নানা আলোচনা চলছে। শিক্ষা বোর্ডের একাধিক সূত্রের দাবি, প্রাথমিকভাবে যে চিত্র পাওয়া যাচ্ছে, তাতে ফল গত বছরের তুলনায় আরও কিছুটা দুর্বল হতে পারে। তবে তারা বলছেন, এটি কেবল অভ্যন্তরীণ পর্যায়ের একটি প্রাথমিক ধারণা। কোনোভাবেই চূড়ান্ত পরিসংখ্যান নয়।

এ বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে বোর্ড চেয়ারম্যান অধ্যাপক সৈয়দ আক্তারুজ্জামান বলেন, এই তথ্যটি সঠিক নয়। এই বিষয়টি এখন আমরা নিজেরাও বলতে পারি না। ফল প্রকাশের হয়তো দুই ঘণ্টা আগে নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব হবে। এর আগে চেয়ারম্যানরাও জানি না কত শতাংশ পাস হবে।

তবে কঠোর মূল্যায়নের প্রভাবে ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় পাসের হার নেমে আসে ৬৮ দশমিক ৪৫ শতাংশে, যা আগের বছরের তুলনায় ১৪ দশমিক ৫৯ শতাংশ কম এবং টানা ১৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন ছিল। ওই বছর ১৯ লাখ ২৮ হাজার ১৮১ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে পাস করেছিল ১৩ লাখ ৩ হাজার ৪২৬ জন। একই সঙ্গে জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১ লাখ ৩৯ হাজার ৩২ জনে, যা আগের বছরের তুলনায় ৪৩ হাজারেরও কম ছিল।

তখন বোর্ড কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, বিশেষ করে ইংরেজি ও গণিত বিষয়ে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হওয়ায় সামগ্রিক ফলের ওপর বড় প্রভাব পড়ে। একই সঙ্গে কঠোর মূল্যায়ন নীতিও পাসের হার ও জিপিএ-৫ কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ হিসেবে সামনে আসে।

অন্যদিকে আগের ফলের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০১১ সালে পাসের হার ছিল ৮২ দশমিক ১৬ শতাংশ, ২০১২ সালে ৮৬ দশমিক ৩৭ শতাংশ, ২০১৩ সালে ৮৯ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১৪ সালে ৯১ দশমিক ৩৪ শতাংশ, ২০১৫ সালে ৮৭ দশমিক ০৪ শতাংশ, ২০১৬ সালে ৮৮ দশমিক ৭০ শতাংশ, ২০১৭ সাল ৮০ দশমিক ৩৫ শতাংশ, ২০১৮ সালে ৭৭ দশমিক ৭৭ সাল, ২০১৯ সালে ৮২ দশমিক ২০ শতাংশ, ২০২০ সালে ৮২ দশমিক ৮৭ শতাংশ, ২০২১ সালে ৯৩ দশমিক ৫৮ শতাংশ (করোনার বছরে অটোপাস), ২০২২ সালে ৮৭ দশমিক ৪৪ শতাংশ, ২০২৩ সালে ৮০ দশমিক ৩৯ শতাংশ এবং ২০২৪ সালে পাসের হার ছিল ৮৩ দশমিক ০৪ শতাংশ। সে অনুযায়ী বিগত বছরের তুলনায় ২০২৫ সালের এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় পাসের হার ঠেকেছিল তলানিতে।

এছাড়া ২০২৫ সালে পরীক্ষায় অংশ নেওয়া ৯ লাখ ৬৭ হাজার ৭৩৯ জন ছাত্রী আর ৯ লাখ ৬১ হাজার ২৩১ জন ছাত্রের মধ্যে ছাত্রীদেরই সাফল্য বেশি। ছাত্রীদের পাসের হার ৭০ দশমিক ৬৭ শতাংশ, ছেলেদের ৬৫ দশমিক ১১ শতাংশ। জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭৩ হাজার ৬১৬ জন ছাত্রী, ছেলেদের চেয়ে ৮ হাজার ২০০ জন বেশি।

তার ধারাবাহিকতায় এবারও সংশ্লিষ্টদের ধারণা, যেহেতু একই মূল্যায়ন নীতি অনুসরণ করা হয়েছে, তাই ফলেও সেই ধারাবাহিকতার প্রতিফলন দেখা যেতে পারে। তবে চূড়ান্ত পরিসংখ্যান প্রকাশের আগে এ বিষয়ে নিশ্চিত কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি বোর্ড কর্মকর্তারা।

উল্লেখ্য, এবার দেশের ১১টি শিক্ষা বোর্ডের অধীনে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় নিবন্ধন করেছিল ১৮ লাখ ৫৭ হাজার ৩৪৪ জন শিক্ষার্থী। এর মধ্যে ছাত্র ৯ লাখ ৩০ হাজার ৩০৫ জন এবং ছাত্রী ৯ লাখ ২৭ হাজার ৩৯ জন। পরীক্ষা চলাকালে নকল ও অসদুপায় অবলম্বনের অভিযোগে ২০৮ জন পরীক্ষার্থীকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

সুত্র:ঢাকা পোস্ট