ঢাকা | মঙ্গলবার, ২১ জুলাই ২০২৬,৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

তদন্ত কমিটির সুপারিশ তোয়াক্কা না করেই মাইলস্টোন নির্মাণ করছে নতুন ভবন

স্কুলের ছুটির ঘণ্টা বাজার আগেই জীবন থেকে চিরবিদায় নিতে হয়েছিল উত্তরার মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের সেই কোমলমতি শিক্ষার্থীদের। সেদিন স্কুলের আঙিনায় আছড়ে পড়েছিল এক অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুঘণ্টা। একটি যুদ্ধবিমান বিধ্বস্ত হয়ে পাইলটসহ প্রাণ হারিয়েছিলেন মোট ৩৬ জন মানুষ—যাদের মধ্যে ২৮ জনই ছিল খুদে শিক্ষার্থী।

সেই ভয়াবহ দুর্ঘটনার গভীর ক্ষতচিহ্ন এখনো বহন করে চলেছে প্রতিষ্ঠানটির ‘হায়দার আলী ভবন’। আজ এত বছর পরও ভবনটির দিকে তাকালেই নিমিষে ভেসে ওঠে সেই বিভীষিকাময় দিনের স্মৃতি, ভারী হয়ে ওঠে বাতাস।

মাইলস্টোন দুর্ঘটনার তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ভবনটির যথাযথ অনুমোদন ছিল না। এমনকি দোতলা ভবনটি ভেঙে ফেলার অঙ্গীকারও রাজউকের কাছে করেছিল কর্তৃপক্ষ।

তবে দেশজুড়ে আলোড়ন তোলা সেই ঘটনার পরও মাইলস্টোন কর্তৃপক্ষ নতুন একটি সাততলা ভবনের নির্মাণকাজ শুরু করেছে। পাশাপাশি চলছে আরও একটি ভবন নির্মাণের প্রস্তুতি। যদিও প্রতিষ্ঠানটির দাবি, সংশ্লিষ্ট সব কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়েই নির্মাণকাজ হচ্ছে।

মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের প্রতিষ্ঠাতা ও উপদেষ্টা কর্নেল (অব.) নুরুন নবী বলেন, এই ভবনের নকশা দুই বছর আগেই অনুমোদন হয়েছে। সেই অনুমোদনের ভিত্তিতেই কাজ চলছে। এখানে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থাকবে না—এমন কোনো নির্দেশনা আমরা পাইনি।

প্রতিষ্ঠানটির অধ্যক্ষ ক্যাপ্টেন জাহাঙ্গীর খান বলেন, এখানে ভবন হবে কি হবে না, সেটি অবান্তর প্রশ্ন। এটি বেবিচকের অনুমোদিত আবাসিক এলাকা। আশপাশে ১১-১২ তলা বহু ভবন রয়েছে। তার চাইতে আমাদের ভবনগুলো নিচু।

বিমানবন্দরের আশেপাশে ১৫ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে কোনো ভবনের উচ্চতা কতটুকু হবে তা নির্ধারণের দায়িত্ব সিভিল এভিয়েশন কর্তৃপক্ষের। তাদের ছাড়পত্র নিয়েই পরবর্তীতে আবেদন করতে হয় রাজউকে।

মাইলস্টোনের দুর্ঘটনার পর যে তদন্ত কমিশন গঠন করা হয় সেখানে স্পষ্ট করে বলা হয়েছিল, বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ পাথের নিচে নতুন করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল কিংবা জনসমাগম হয়—এমন কোনো স্থাপনার অনুমোদন দেয়া উচিত নয়। বরং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার মাধ্যমে বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলো ধীরে ধীরে অন্যত্র সরিয়ে নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। একই সঙ্গে দেশের সব বিমানবন্দরের অ্যাপ্রোচ সারফেস এলাকায় এ নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়নের পরামর্শ দেয়া হয়।

রাজউক উত্তরা অঞ্চলের অথরাইজড অফিসার এস. এম. এহসানুল ইমাম বলেন, ২০২২ সালে একটি ভবনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল। সেখানে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থাকবে কি থাকবে না, কিংবা বিমানবন্দর থাকবে কি থাকবে না—এসব একটি বৃহৎ মাস্টারপ্ল্যানের বিষয়। এ ধরনের সিদ্ধান্ত উচ্চপর্যায়ে নিতে হয়। সরকার বা কর্তৃপক্ষ যে সিদ্ধান্ত দেবে, সেটিই বাস্তবায়ন হবে।

সিভিল এভিয়েশনের এটিসি সদস্য এয়ার কমডোর (অব.) মো. নূর-ই-আলম বলেন, “কোনো স্থানে ভবনের সর্বোচ্চ উচ্চতা কত হবে, সে বিষয়ে মতামত দেয়ার এখতিয়ার আমাদের রয়েছে। কিন্তু সেখানে কী ধরনের ভবন হবে বা কী কাজে ব্যবহার হবে, সে সিদ্ধান্ত আমাদের নয়।”

তাদের দাবি, শুধু মাইলস্টোন নয়, উত্তরা এলাকায় অন্তত শতাধিক ভবন উচ্চতার বিধিনিষেধ লঙ্ঘন করে নির্মিত হয়েছে, যা ভবিষ্যতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

এয়ার কমডোর (অব.) নূর-ই-আলম বলেন, আইসিএওর অ্যানেক্স-১৪-এ সুপারিশ রয়েছে, বিমানবন্দরের খুব কাছাকাছি শব্দ-সংবেদনশীল বা অধিক জনসমাগম হয়—এমন স্থাপনা এড়িয়ে চলা উচিত।

এস. এম. এহসানুল ইমাম বলেন, শুধু মাইলস্টোন নয়, উত্তরা এলাকায় পরিদর্শনে আরও কিছু ভবন পেয়েছি, যেগুলো উচ্চতার সীমা লঙ্ঘন করেছে। সেগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করা হচ্ছে।

দুর্ঘটনা তদন্ত প্রতিবেদনের ৩০টি সুপারিশের অন্যতম ছিল, বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর সামরিক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম নির্বিঘ্নে পরিচালনার জন্য ঢাকার বাইরে স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া।

সিভিল এভিয়েশন বিশেষজ্ঞ উইং কমান্ডার (অব.) এ. টি. এম. নজরুল ইসলামের মতে, এত বড় দুদুর্ঘটনার পর মাইলস্টোন কতৃপক্ষকে নতুন ভবন নির্মানের অনুমতি দেয়া অনুচিত। একই সঙ্গে তিনি তদন্ত প্রতিবেদন জনসম্মুখে প্রকাশের দাবিও জানান।

তিনি বলেন, অ্যাপ্রোচ পাথ ও টেক-অফ পাথের নিচে যেখানে বিপুল মানুষের সমাগম হতে পারে, সেখানে এ ধরনের স্থাপনা নিরুৎসাহিত করা হয়। জাতীয় নিরাপত্তার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অংশ বাদ দিয়ে তদন্ত প্রতিবেদনের জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট অংশ প্রকাশ করা উচিত ছিল।

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ১৮০ থেকে ১৯০টি ফ্লাইট ওঠানামা করে। এসব ফ্লাইটের বড় একটি অংশের উড্ডয়ন ও অবতরণের পথের ঠিক নিচেই অবস্থিত মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজ।