সালমান মুক্তাদিরের আমি ভক্তও নই, ফলোয়ারও নই। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমার অবাধ বিচরণ এবং লেখালেখির কারণে মাঝে মাঝে ছেলেটির অনেক কর্মকাণ্ডই আমার নজরে পড়ে। সালমান মুক্তাদির একজন জনপ্রিয় ইউটিউবার ও কনটেন্ট ক্রিয়েটর। যতটুকু দেখেছি, ২০২৪ সালের গণআন্দোলন ও গণ-অভ্যুত্থানে সালমান মুক্তাদিরের একটি ইতিবাচক ভূমিকা ছিল।
মূলত এমন একটি বিষয় নিয়ে আমার লেখার উদ্দেশ্য ছিল না। কিন্তু আজ যখন সালমান মুক্তাদিরের মুখে শুনলাম, এ দেশের আইনের প্রতি তার কোনো বিশ্বাস নেই—বরং তিনি এ দেশের আইনের প্রতি পুরোপুরি ‘নাস্তিক’—তখন বিষয়টি আমাকে ভাবিয়েছে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের আগে এমন কথা শুনলে হয়তো এর ভিন্ন প্রেক্ষাপট থাকত। কিন্তু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী সময়ে দেশে একটি গণতান্ত্রিক সরকারব্যবস্থা বিদ্যমান থাকা অবস্থায় এমন কথা শোনা নিঃসন্দেহে কষ্টদায়ক ও দুঃখজনক।
সালমান মুক্তাদিরের ভাষ্যমতে, একটি সন্ত্রাসী গ্রুপ তার কাছে চাঁদা দাবি করেছিল। সেই চাঁদা না দেওয়ার কারণে তার নিজের কষ্টার্জিত অর্থে গড়ে তোলা স্টুডিওটি ভেঙেচুরে তছনছ করে দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, আরও একটি দুঃখজনক সংবাদ আমাদের সামনে এসেছে। মিরপুর-১ এলাকায় প্রায় পঞ্চাশ বছর ধরে সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় অবদান রাখা রাড্ডা হাসপাতালটি একদল সন্ত্রাসী গুঁড়িয়ে দিয়েছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নাকের ডগায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চললেও সাধারণ মানুষের চিকিৎসাসেবায় নিয়োজিত হাসপাতালটি রক্ষায় কেউ এগিয়ে আসেনি।
এ তো বললাম সালমান মুক্তাদিরের গড়ে তোলা স্টুডিও এবং রাড্ডা হাসপাতাল ধ্বংস করে দেওয়ার কথা। কিন্তু এমন ধ্বংসলীলা যে শুধু এই দুটি ঘটনাতেই সীমাবদ্ধ, তা নয়। দেশের আনাচে-কানাচে প্রায়ই চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও দখলদারিত্বের মতো ঘটনা ঘটছে। কোথাও ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান আক্রান্ত হচ্ছে, কোথাও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, কোথাও আবার সাধারণ মানুষের সেবায় নিয়োজিত প্রতিষ্ঠানও রেহাই পাচ্ছে না।
একজন সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমার প্রশ্ন—দেশব্যাপী এই চাঁদাবাজি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ক্রমাগত বেড়ে চলা কিসের লক্ষণ?
আমাদের চোখের সামনে টানা ১৭ বছর ক্ষমতার মসনদ আঁকড়ে ধরে রাখা একটি সরকার শেষ পর্যন্ত স্বৈরাচারী কর্মকাণ্ডের অভিযোগ ও ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে ক্ষমতা ছাড়তে এবং দেশ ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। সেই অভিজ্ঞতা কি এত দ্রুত বিস্মৃত হওয়ার কথা?
একটি গণতান্ত্রিক পন্থায় ক্ষমতায় আসা সরকারও যদি অল্প সময়ের মধ্যে এমন পরিস্থিতি তৈরি হতে দেয়, যেখানে সাধারণ মানুষ নিজের জানমাল, ব্যবসা-বাণিজ্য ও প্রতিষ্ঠান নিয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগবে, তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে—এ দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে আর কতকাল পরে?
দেশে যেভাবে মব সন্ত্রাস মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে, তাতে এ দেশের সাধারণ মানুষ খুব ভালো কিছু আশা করতে পারছে না। তবে এখনো সময় আছে। এখনই যদি আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণে আনা না হয়, মব সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজি বন্ধ করা না হয় এবং সাধারণ মানুষের জানমাল ও সম্পদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না হয়, তাহলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হয়তো আবারও কোনো আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করবে।
আর যদি এমন পরিস্থিতির পুনরাবৃত্তি ঘটে, তাহলে সেটি কারও জন্যই মঙ্গল বয়ে আনবে না।
আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা শুধু সরকারের দায়িত্ব নয়; এটি রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের আস্থা ও নিরাপত্তাবোধেরও প্রশ্ন। সেই আস্থা ফিরিয়ে আনতে হলে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
লেখক: মো. কাওছার আলম চৌধুরী, কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক






