প্রাকৃতিক ও নান্দনিক সৌন্দর্যে ভরা একটি ক্যাম্পাস কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়, যেখানে ছয় ঋতু আসে নানান রং, গন্ধ আর সুর নিয়ে। লালমাটি আর ছোট ছোট পাহাড় ঘেরা ক্যাম্পাসটা যেন প্রাকৃতিক লীলাভূমি। এখানে প্রতিটি ঋতুই আসে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য নিয়ে, যেন এই বিদ্যাপীঠের চারপাশে আঁকা নিত্যনতুন সৌন্দর্যের রেখাচিত্র।
গ্রীষ্ম (বৈশাখ জ্যৈষ্ঠ)
গ্রীষ্মের উত্তপ্ত রোদে যখন শিক্ষার্থীরা অস্থির হয়ে ক্যাম্পাস বিমুখ হয়ে যাওয়ার কথা, সেখানে ক্যাম্পাসের বাহারী রঙের ফুলের সৌন্দর্যে মাতোয়ারা হয়ে ক্যাম্পাসমুখী হন শিক্ষার্থীরা। কৃষ্ণচূড়া, জারুল ফুলসহ আরও নানান ফুল যেন ক্যাম্পাসকে প্রাকৃতিকভাবে সাজিয়ে তোলে, এই ক্যাম্পাসে কখনো কৃত্রিম সৌন্দর্যের প্রয়োজন পড়ে না, শুধুই কি ফুল…! বৈশাখ পেরিয়ে জৈষ্ঠ্যমাস এলেই শুরু হয় মধুমাসের নানান ফল। আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, তাল, এবং দেশীয় খেজুরে ভরে যায় সারা ক্যাম্পাস, শিক্ষার্থীরাও মনভরে, তৃষ্ণা মিটিয়ে সংগ্রহ করে ক্যাম্পাসের ফলমূলগুলো। এছাড়াও বৈশাখের শুরুর দিন নতুন বছরকে বরণ করে নিতে বৈশাখি উৎসব, বৈশাখীমেলা, পিঠা উৎসব, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন যেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের মন ভরে তোলে।
বর্ষা (আষাঢ়- শ্রাবণ)
বর্ষা মানেই বৃষ্টিতে ভিজে ভিজে ক্যাম্পাসকে উপভোগ করা, বাদলা দিনে পিচ্ছিল পাকা পথ দিয়ে হেঁটে হেঁটে ক্যাম্পাসের দক্ষিণা বাতাস গায়ে লাগানো। সবুজে ঢাকা ক্যাম্পাসে কদমের ফুলেরা উঁকি দেয়। আর মেঘের আড়ালে ক্লাসরুমের জানালা দিয়ে ঢু-মেরে বৃষ্টির ফোঁটা ফোঁটা পানি গায়ে মাখানো আর বাইরে তাকিয়ে থাকার আনন্দ, এসময়ে প্রকৃতি শিক্ষার্থীদের কবিতা, গান, গল্প লেখার প্রেরণা জোগায়, এছাড়াও রাতে বৃষ্টির শব্দে আরামের ঘুম আর হোস্টেলের গল্পগুজব সহ আরও কতকি স্মৃতি!
শরৎকাল ( ভাদ্র-আশ্বিন)
শরতের ঋতুর নাম বললেই প্রথমে যেটা মাথায় আসে তার নাম কাশফুল, সবুজ মাঠে সাদা-সাদা কাশফুল যেন প্রকৃতির সৌন্দর্য আরও শত শতগুণ বাড়িয়ে দেয়, কুবির আঙ্গিনায়, শহিদ মিনার, কেন্দ্রীয় খেলার মাঠ, লালন চত্বর, এবং মসজিদের চারিপাশে কাশফুলের দেখা মিলে। ক্লাস শেষে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা শরৎকালের পরিবেশ উপভোগ করে, গল্প আড্ডা আর ছবি তোলার ভিড় জমে সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত। শরৎকালে সবুজের মাঝে যেমন সাদা কাশফুলের সৌন্দর্য ফুটে উঠে, ঠিক তেমনি নীল আকাশের মাঝে সাদা মেঘের আনাগোনার দেখা মিলে। মেঘগুলো সাদা তুলোর মতো উড়তে থাকে সারা আসমানজুড়ে, ক্লাসরুম থেকে প্রায় দেখা যায় ভেসে যাওয়া সাদা মেঘের টুকরোগুলো ওপারের গ্রামের সাথে মিলিত হয়ে যাচ্ছে, এভাবেই সারাদিন মেঘের দেখা মিলে।
হেমন্তকাল (কার্তিক – অগ্রহায়ণ)
হেমন্ত এসে হাজির হয় নিঃশব্দে, গাঢ় সবুজকে সোনালিতে রাঙিয়ে। সূর্যের আলো সোনালি হয়ে এসে গায়ে মাখে। ক্যাম্পাসে তখন পাতাঝরার মৌসুম, রোদ পড়ে ছায়া ফেলে দেয়ালের গায়ে।
শিক্ষার্থীরা ক্লাস শেষে হাঁটে ধীর পায়ে, বুকভরা নিঃশ্বাসে টেনে নেয় ঋতুর গন্ধ। এ সময়টাই যেন শিক্ষার্থীদের সবচেয়ে বেশি আপন হয়ে ওঠে কুবি, এক ধরনের প্রগাঢ় বন্ধন গড়ে ওঠে প্রকৃতি ও মননের মাঝে।
শীত (পৌষ–মাঘ)
শীতকালে কুয়াশা মোড়া সকাল আসে ধীরে ধীরে। সূর্য ওঠে দেরিতে, আর শিক্ষার্থীরা হুডি-চাদর মুড়ি দিয়ে আসে। শীতের সকালের কুয়াশা ভেদ করে যখন সূর্য ধীরে ধীরে উঠতে থাকে, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশাখি চত্বরে তখন এক অন্যরকম দৃশ্যের জন্ম হয়। গাছের ফাঁক গলে যে রোদ মাটিতে এসে পড়ে, তা আর স্রেফ আলো থাকে না,তা হয়ে ওঠে একেকটি জীবন্ত রেখা, যেন আকাশ থেকে নেমে আসা স্বর্গের স্পর্শ।
এই রোধ উত্তপ্ত নয়, বরং স্নিগ্ধ; এই রোধ চোখে লাগে না, বরং হৃদয় ছুঁয়ে যায়। পায়ে হেঁটে গেলে মনে হয়, এই আলোর রেখাগুলো বুঝি জীবনের ক্লান্তি মুছে দিতে এসেছে। প্রকৃতি এখানে নিঃশব্দ, কিন্তু তার ভাষা গভীর। শীতকাল মানেই পিঠা উৎসব, এ সময় কুবিতে বিভিন্ন খেলাধুলার আয়োজনে ক্যাম্পাস যেন হয়ে উঠে এক উৎসবমুখর পরিবেশ।
বসন্ত (ফাল্গুন–চৈত্র)
সব ঋতুর শেষে এসে বসন্ত, যেন নবজন্মের বার্তা নিয়ে আসে। শিক্ষার্থীদের হৃদয়ে ও বসন্ত নেমে আসে, কুবির ক্যাম্পাস তখন রঙে রঙিন, ফুলে ফুলে ভরে ওঠে প্রজাপতির ডানায় মাখানো প্রেমের প্রতিচ্ছবি। স্নিগ্ধ বাতাস আর কোকিলের কণ্ঠ লক্ষ করা যায় দিনের প্রথম প্রহরে, ফাগুনের হাওয়ায় শিক্ষার্থীদের চোখে-মুখে খেলে যায় এক অপার উচ্ছ্বাস, কেউ বা হৃদয় লুকিয়ে রাখে বইয়ের পাতায়। বসন্ত শুধু ফুলের নয়, প্রেম, প্রতীক্ষা আর নতুন শুরুরও নাম।
এভাবেই নানান ঋতুর আগমনে লালমাটির ক্যাম্পাস তার নিজস্ব সৌন্দর্য ফুটিয়ে তোলে, প্রতিটি ঋতু-ই জানান দিয়ে যায় নিজেদের আলাদা সব সৌন্দর্য, বিমুগ্ধ করে তোলে প্রতিটি শিক্ষার্থীর হৃদয়।






