ঢাকা | শনিবার, ২ মে ২০২৬,১৯ বৈশাখ ১৪৩৩

রাবি’র ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ যেন দুর্নীতির আঁতুড়ঘর

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ‘ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট’ বিভাগকে কেন্দ্র করে ব্যাপক আর্থিক অনিয়ম, টেন্ডার কারচুপি এবং কৌশলে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। বিভাগের দুই শিক্ষক—সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এনায়েত হোসেন এবং সাজু সরদারকে এই আর্থিক অসদাচরণ ও প্রাতিষ্ঠানিক কারসাজির মূল পরিকল্পনাকারী ও সুবিধাভোগী হিসেবে অভিযোগ করা হয়েছে।

আর্থিক দুর্নীতির মূল কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে উচ্চ-মূল্যের টেন্ডার কারচুপি এবং ঠিকাদারদের লাইসেন্সের জালিয়াতিমূলক ব্যবহার। অভিযোগ মতে, অভিযুক্ত শিক্ষকদ্বয় একাধিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের (যেমন: জাহান ট্রেডার্স, নাকা ট্রেডার্স)-সহ আরও বেশকিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স ব্যবহার করে সেগুলোকে নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেন। এরপর তারা নিজেরাই এই লাইসেন্স ব্যবহার করে পরীক্ষাগারের সরঞ্জাম, ইলেকট্রনিক্স (টিভি, ফ্রিজ, প্রজেক্টর) এবং ইন্টেরিয়র কাজের জন্য মোট ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা মূল্যের চুক্তি নিশ্চিত করেন।

অভিযুক্তরা পণ্য ক্রয় এবং ডকুমেন্টেশন প্রক্রিয়া কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতেন। অভিযোগ রয়েছে, পাইকারি ও বিলিং মূল্যের মধ্যে বিশাল ব্যবধান তারা ব্যক্তিগতভাবে আত্মসাৎ করতেন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক তথ্যদাতার দাবি, ২০২১ অর্থবছরের বিভাগীয় ফাইলগুলোতে এই আর্থিক অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ রয়েছে, বিশেষ করে যেখানে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের পরিবর্তে বিশ্ববিদ্যালয় বা বিভাগের নামে তৈরি করা ভাউচার রয়েছে, যা জালিয়াতির স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়। আর্থিক লাভ নিশ্চিত করতে তারা এমনকি লাইসেন্স ব্যবহারকারী এবং কাজে জড়িতদের ন্যায্য প্রাপ্য অর্থও বকেয়া রাখেন বা বিতরণ করেননি।

এছাড়াও, বিভাগটির প্রতিষ্ঠা এবং নেতৃত্ব নিয়োগের পেছনেও রাজনৈতি সুপরিকল্পিত কৌশলগত পরিকল্পনা ছিল বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। বিভাগটি মূলত রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য আব্দুস সোবহানের মেয়ে সানজানা সোবহান ও সাজু সরদারের নিয়োগের সুবিধা দেওয়ার জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। অভিযোগ মতে, ড. এনায়েত হোসেন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিতে এই শর্ত দেন যে, সাজু সরদারকে বিভাগে শিক্ষক নিয়োগ দিতে হবে। ড. এনায়েত হোসেনের প্রথম ডেপুটেশন মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই ২০২১ সালের এপ্রিলে তাঁকে স্থায়ী অধ্যাপক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয় এবং পরপর দ্বিতীয় মেয়াদের জন্য চেয়ারম্যান হিসেবে পুনরায় নিয়োগ করা হয। (২০২৪ সালের এপ্রিল পর্যন্ত), যা একটি সুপরিকল্পিত রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তারের পূর্ব-পরিকল্পিত পদক্ষেপ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যুভেনির শপের অননুমোদিত দীর্ঘকালীন পরিচালনা এবং আর্থিক লেনদেনেও বড় ধরনের অনিয়ম পরিলক্ষিত হয়েছে। ২০২০-২০২১ সালে চালু হওয়া এই শপটি প্রথম নিযুক্ত চেয়ারম্যান ড. এনায়েত হোসেন পদত্যাগ করার পরও তাঁর নিয়ন্ত্রণেই থেকে যায় এবং এটি পরবর্তী দুই চেয়ারম্যানের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়নি। শপের বিক্রয় ও ক্রয়মূল্যের কোনো রেকর্ড রাখা হয়নি। চুক্তির শর্ত অনুযায়ী লাভের ৬০% বিভাগ উন্নয়ন তহবিলে পৌঁছানোর কথা থাকলেও, তহবিল সঠিকভাবে বিতরণ হয়েছে কিনা, সে বিষয়ে কোনো তদারকি করা হয়নি। বর্তমানে, অভিযুক্ত কর্মকর্তারা নিজেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে তথ্য গ্রহণকারী শিক্ষক তানজিল ভূঞাকে বিভাগ থেকে কৌশলে বহিষ্কার করান।

তানজিল ভূঞার সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, গত ৫ আগস্টে ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হলে তাদের নিয়ন্ত্রণ আর না থাকায় তারা শিক্ষার্থীদের ভুল বুঝিয়ে বিভিন্ন অজুহাতে একাডেমিক ভবন ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসন ভবন ঘেরাও করার পরামর্শ দিয়েছেন এবং আন্দোলন করাচ্ছেন, যাতে তাদের দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগগুলো ধামা চাপা পড়ে যায়। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, সাজু সরদার ব্যক্তিগত বিদ্বেষবশত তাঁর স্ত্রীর অসুস্থতার ঘটনাকে কেন্দ্র করে মিথ্যা অভিযোগ দায়ের করেন এবং বিভাগের একটি অনুষ্ঠান বন্ধ করার চেষ্টা করেন।

অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে শিক্ষক অধ্যাপক ড. এনায়েত হোসেনের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “আমি বাহিরে আছি এখন কথা বলতে পারবো না। বিভাগের বর্তমান চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জাহিদ হাসান বলেন, “আমি কয়েক মাস হলো যোগদান করেছি। বিভাগের শিক্ষকদের পূর্বের বিষয়ে আমি অবগত নই, তবে কিছু অভিযোগ আমার কাছে মৌখিক ভাবে এসেছে। বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগে অর্থনৈতিক অনিয়মের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাঃ ফরিদ উদ্দিন খান বলেন, ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগ সম্পর্কে আমরা দুটি অভিযোগ পেয়েছি। প্রথমটি হলো দুইজন শিক্ষকের আচরণগত সমস্যা নিয়ে, যার জন্য একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে এবং তারা কাজ করছে। দ্বিতীয় অভিযোগটি হলো দুর্নীতির বিষয়টি। দ্বিতীয় অভিযোগটি ছিল বিভাগটির জন্য বরাদ্দকৃত প্রায় ১ কোটি ৪১ লাখ টাকা নিয়ে দুর্নীতির। অভিযোগ করা হয় যে, তৎকালীন বিভাগীয় চেয়ারম্যান নিজেই ঠিকাদারি কাজে যুক্ত হন এবং কাজটি সম্পন্ন করতে তিনি শিক্ষার্থীদের লাইসেন্স ব্যবহার করেছিলেন। এই দুইটি বিষয় আমলে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ব্যবস্থা গ্রহণ করবে বলে তিনি জানান।

অভিযোগ রয়েছে, অধ্যাপক ড. এনায়েত হোসেন, সাজু সরদার ও সানজানা সোবহান, আওয়ামী লীগের মতাদর্শের। গত-২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন হওয়ার পরে এই বিভাগে তাদের আধিপত্য বিস্তার করতে সমস্যা হচ্ছে, এর জন্য তাঁরা এই বিভাগের শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন অজুহাত দিয়ে পরিবেশ পরিস্থিতি ভিন্ন পথে নিয়ে যাচ্ছেন বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।