নাসরিন আক্তার। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটের বনপাড়া আদর্শ স্কুল অ্যান্ড কলেজের মনোবিজ্ঞান বিভাগের প্রভাষক। ২০১৫ সাল থেকে কলেজটিতে এইচএসসির শিক্ষার্থীদের পাঠদান করছেন তিনি। কিন্তু তার পড়াশোনার গণ্ডি এইচএসসি পর্যন্ত; তাও আবার নিয়মিত নয়। অথচ জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অনার্স পাস সনদ দেখিয়ে ভুয়া নিয়োগ বোর্ড, এনটিআরসিএর (বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ) সনদ জালিয়াতিসহ নানা প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে চাকরি নেন নাসরিন আক্তার। সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, তার অনার্স পাস করা দূরে থাকুক, অনার্সের ভর্তি হওয়ার সুযোগই নেই। কারণ নাসরিন ২০০৪ সালে এসএসসি ও ২০০৯ সালে প্রাইভেটে এইচএসসি পাস করেছেন। নিয়মিত শিক্ষার্থী না হলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্সে ভর্তির সুযোগ মেলে না।
নাসরিনের মতো একইভাবে নানা প্রতারণা করে চাকরি করছেন খোদ কলেজটির অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকও। ২০০০ সালে এ প্রতিষ্ঠানটি নিম্ন মাধ্যমিক থাককালে তিনি নিম্ন মাধ্যমিকের প্রধান হিসেবে যোগদান করেন। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি প্রকাশের সময় ওই পদের জন্য শিক্ষাগত যোগ্যতা ছিল বিএ, বিএড। অথচ তিনি বিএড পাস করার আগেই ওই পদে যোগদান করেন। এরপর এমপিওভুক্তির সময় স্নাতকোত্তর পাসের জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের যে সনদ দিয়েছেন সেটিও জাল। সম্প্রতি পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর (ডিআইএ) প্রতিষ্ঠানটি নিয়ে তদন্তকালে আমেরিকা বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি থেকে স্নাতকোত্তর পাসের আরেকটি সনদ জমা দেন তিনি। সেই বিশ্ববিদ্যালয়টিও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) কালো তালিকাভুক্ত। দুটি সনদ জালিয়াতি করে চাকরির জন্য তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে ডিআইএ।
একইভাবে প্রভাষক (পালি) হিসেবে চাকরি করছেন শেফালী খাতুন। তিনি বাংলাদেশ সংস্কৃত ও পালি শিক্ষা বোর্ড থেকে স্নাতক পাসের যে সনদ দিয়েছেন সেটি ভুয়া। এ ছাড়া পালি বৌদ্ধ দর্শন, ইতিহাস ও সংস্কৃতিবিষয়ক একটি বিশেষায়িত বিষয়। সেখানে শেফালী খাতুন মুসলিম হয়েও এ বিষয়ে পাঠদান করছেন। আবার বিষয়টি খোলার অনুমতি না থাকলেও অবৈধভাবে নিয়োগ দিয়ে এমপিওভুক্ত করা হয়েছে তাকে। এমপিওভুক্তি আবেদনের সময় প্রেরিত স্বীকৃতিপত্র, বিষয়ে অনুমতি, শিক্ষক নিবন্ধন না থাকা সত্ত্বেও তাকে নিয়োগ ও এমপিওভুক্ত করা সম্পূর্ণ অবৈধ। বিষয় অনুমোদন না থাকা সত্ত্বেও তাকে নিয়োগ প্রধান ও এমপিওভুক্ত করার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারও দায়ী বলে মনে করছেন তারা।
শুধু অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হক কিংবা নাসরিন আক্তার নন, কলেজটির ৭৬ জন শিক্ষক-কর্মকর্তার মধ্যে ৭৩ জনই একাডেমিক কিংবা এনটিআরসিএর সনদ জালিয়াতি, নিয়োগ প্রতারণা করে চাকরি করছেন। বিভাগ খোলার অনুমতি না থাকলেও অবৈধভাবে বিভাগ খুলে দেওয়া হয়েছে শিক্ষক-কর্মকর্তা নিয়োগ। তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি চাকরিকালে নেওয়া বেতন-ভাতার ৫ কোটি ৫৭ লাখ ৬৫ হাজার টাকা ফেরত আনার সুপারিশ করেছে ডিআইএ। এতসব অনিয়ম করে চাকরি করলেও পড়াশোনা করাতে মন নেই শিক্ষক কর্মকর্তাদের। কলেজটিতে পড়াশোনার পাশাপাশি অবকাঠামোগত অবস্থা খুবই নাজুক। গতকাল রোববার এ প্রতিবেদনটি শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া হয়েছে। এদিকে, এক প্রতিষ্ঠানে একসঙ্গে এত শিক্ষকের প্রতারণার কথা শুনে হতবাক শিক্ষা বিশ্লেষকরা। তারা বলছেন, এটি কোনো প্রতিষ্ঠান নয়, যেন দুর্নীতির ফ্যাক্টরি। সনদ জালিয়াতি করা শিক্ষকরা শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় অযোগ্য হিসেবে বিবেচিত। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ সকলের।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, প্রতিষ্ঠানটি ২০০৪ সালে নিম্ন মাধ্যমিক, ২০১৪ সালে মাধ্যমিক এবং ২০১৫ সালে উচ্চ মাধ্যমিক হিসেবে স্বীকৃতিপ্রাপ্ত হয়। বর্তমানে কলেজটিতে ৪১৫ শিক্ষার্থী অধ্যয়নরত। এর মধ্যে ৮৫ জন কলেজে, আর বাকি ৩৩০ জন মাধ্যমিক বিভাগে পড়াশোনা করছেন। এত শিক্ষার্থী থাকলেও নেই পর্যাপ্ত শ্রেণিকক্ষ। আবার বার্ষিক বা নির্বাচনি পরীক্ষায় বাংলা, ইংরেজি ও গণিতে ৮০ শতাংশ বা তার বেশি নম্বর পাওয়া শিক্ষার্থীর সংখ্যা হাতেগোনা। শিক্ষার্থীদের জন্য নেই কোনো পাঠাগার। বিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও নেই ল্যাবরেটরি। নেই পর্যাপ্ত বৈজ্ঞানিক যন্ত্রপাতিও। আয়-ব্যয়ের হিসাব ঠিকমতো না করায় আরও লাখ লাখ টাকার অনিয়ম হয়।
প্রতিষ্ঠানটির কলেজ শাখায় ৬২ জন শিক্ষক-কর্মচারী কর্মরত রয়েছেন। তার মধ্যে একজন ছাড়া বাকি ৬১ জনই এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে দুজন শিক্ষকের তথ্য না পাওয়ায় অধ্যক্ষসহ বাকি ৫৯ জনের নিয়োগে আপত্তি জানিয়ে নিয়োগ বাতিলের পাশাপাশি বেতন ফেরত আনার সুপারিশ করা হয়েছে। তাদের মধ্যে ৩৪ জন প্রভাষক, একজন সহকারী শিক্ষক, পাঁচজন প্রদর্শক, দুজন সহকারী গ্রন্থাগারিক, দুজন হিসাব সহকারী, চারজন ল্যাব সহকারী, একজন কম্পিউটার অপারেটর, বাকিরা অফিস সহকারী ও নিরাপত্তাকর্মী। আর মাধ্যমিক শাখায় ১৬ শিক্ষক-কর্মচারীর মধ্যে ১৫ জনই এমপিওভুক্ত। এর মধ্যে আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছে ডিআইএ। তাদের মধ্যে একজন সহকারী প্রধান শিক্ষক, চারজন সহকারী শিক্ষক, বাকিরা অন্যান্য পদে কর্মরত। আপত্তি আসা বাকি তিনজনও বিভিন্ন পদে কর্মরত।
ডিআইএ সূত্র জানায়, অধিদপ্তরের শিক্ষা পরিদর্শক সনজয় চন্দ্র মণ্ডল, সহকারী শিক্ষা পরিদর্শক মো. নুরুল আফছার ও অডিটর মো. সিরাজুল ইসলাম গত বছরের ১৫ ও ১৬ অক্টোবর বিদ্যালয়টি সরেজমিন পরিদর্শনকালে তাদের সনদ ও নিয়োগ জালিয়াতি নিয়ে সন্দেহ হয়। এরপর সনদগুলো অধিকতর যাচাইয়ের জন্য সনদ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানের কাছে পাঠায় ডিআইএ। এরপর সনদ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান সেগুলো ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করে। এ ছাড়া নিয়োগের সময় নানা প্রতারণার বিষয়ও উঠে আসে।
সার্বিক বিষয়ে জানতে কলেজটির অধ্যক্ষ মো. ইমদাদুল হকের সঙ্গে মোবাইলফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
ডিআইএর পরিচালক অধ্যাপক এম এম সহিদুল ইসলাম বলেন, এক প্রতিষ্ঠানে এত শিক্ষকের অনিয়ম ও সনদ জালিয়াতির বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। আমরা মন্ত্রণালয়কে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য প্রতিবেদন জমা দিয়েছি। এখন মন্ত্রণালয় তাদের বরখাস্তের পাশাপাশি টাকা ফেরত আনার বিষয়ে ব্যবস্থা নেবে।
এ বিষয়ে শিক্ষাবিদ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. মনজুর আহমদ কালবেলাকে বলেন, চাকরিতে যোগদানের সময় অবহেলা করে কিংবা বাইরে দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে সনদগুলো যাচাই না করার কারণে এসব হয়েছে। এটা কাঙ্ক্ষিত নয়। চাকরিতে যোগদানের সময় কেন সনদ যাচাই হয়নি—সে বিষয় খুঁজে বের করে জড়িতদেরসহ সনদ জালিয়াতি করা শিক্ষকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তথ্যসূত্র: কালবেলা






