ঢাকা | মঙ্গলবার, ১৬ ডিসেম্বর ২০২৫,১ পৌষ ১৪৩২

১৯৭২ সালের সংবিধান: স্বাধীনতার দলিল না বিভাজনের নীলনকশা?

বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছিল ত্রিশ লক্ষ শহীদের রক্তে, অগণিত নারীর ত্যাগে, আর একটি জাতির অদম্য আকাঙ্ক্ষায়।
কিন্তু স্বাধীনতার পর প্রণীত ১৯৭২ সালের সংবিধান যা হওয়া উচিত ছিল জাতির ঐক্য ও আত্মপরিচয়ের প্রতীক তা পরিণত হয় আদর্শিক বিভাজনের এক রাজনৈতিক দলিলে।

প্রশ্ন উঠছে, এই সংবিধান কি সত্যিই স্বাধীন বাংলাদেশের জনগণের কণ্ঠস্বর, নাকি এটি ছিল একদলীয় ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা ও প্রতিবেশী প্রভাবের প্রতিফলন?

১৯৭০ সালের নির্বাচনে বিজয়ী প্রতিনিধিরা পাকিস্তানের নাগরিক ছিলেন এবং পাকিস্তানি সংবিধানের অধীনে নির্বাচিত হয়েছিলেন। তখনও “বাংলাদেশ” নামে কোনো রাষ্ট্র গঠিত হয়নি। তাহলে সেই প্রতিনিধিদের দ্বারা প্রণীত সংবিধান কতটা বৈধভাবে “বাংলাদেশের জনগণের সংবিধান” বলা যায়?

কেউ কেউ মনে করেন, ১৯৭২ সালের সংবিধান আসলে পাকিস্তানি কাঠামোর উত্তরাধিকার, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতার আদর্শকে ম্লান করে দেয়।

সংবিধানের চারটি মূলনীতি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতা দেখতে উন্নত মনে হলেও বাস্তবে তারা একে অপরের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।

বাঙালি জাতীয়তাবাদ দেশের অ-বাঙালি জাতিগোষ্ঠী, পাহাড়ি ও আদিবাসী জনগোষ্ঠীর নিজস্ব পরিচয়কে অস্বীকার করে;
ফলে জন্ম নেয় জাতিগত অসন্তোষ, যা আজও পার্বত্য অঞ্চলে বিদ্যমান।

সমাজতন্ত্র শোষণমুক্ত সমাজের প্রতিশ্রুতি দিলেও, বাস্তবে তা রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ ও আমলাতান্ত্রিক কর্তৃত্ব বৃদ্ধি করে;
ফলশ্রুতিতে গণতন্ত্রের বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়।

গণতন্ত্র এবং সমাজতন্ত্র তাই পরস্পরবিরোধী দুটি দিক একটি স্বাধীনতা চায়, অন্যটি নিয়ন্ত্রণ।

ধর্মনিরপেক্ষতা, যার উদ্দেশ্য ছিল সহনশীলতা, তা পরিণত হয় ধর্মীয় মূল্যবোধ থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এক জড় ধারণায়।
এটি জনগণের সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় অনুভূতিকে আঘাত করে এবং সমাজে অপ্রয়োজনীয় বিভাজন সৃষ্টি করে।

ফলে চারটি নীতিই একে অপরকে খণ্ডিত করে যেখানে ঐক্য নয়, জন্ম নেয় বিভাজন ও দ্বন্দ্ব।

ধর্মনিরপেক্ষতা নয়, প্রয়োজন ছিল ধর্মীয় সম্প্রীতি। ধর্মনিরপেক্ষতা নামক জড় ধারণা সমাজকে আধ্যাত্মিক শূন্যতায় ঠেলে দেয়। প্রকৃতপক্ষে প্রতিটি ধর্ম মানুষের নৈতিকতা, শৃঙ্খলা ও পারস্পরিক শ্রদ্ধা শেখায়। এই মূল্যবোধকে দূরে সরিয়ে “ধর্মহীন রাষ্ট্রনীতি” গ্রহণ করা মানে সমাজ থেকে নৈতিক ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে “ধর্মীয় সম্প্রীতি” নীতি গ্রহণই ছিল সময়োপযোগী, যেখানে সব ধর্ম সমান সম্মান পায়।

১৯৭২ সালের সংবিধান জনগণের মতামতের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতা কেন্দ্রীকরণের লক্ষ্যে তৈরি হয়।
গণতন্ত্রের নামে প্রতিষ্ঠা করা হয় দলীয় আধিপত্য আর রাষ্ট্রযন্ত্র হয়ে পড়ে রাজনৈতিক স্বার্থরক্ষার হাতিয়ার। এভাবে সংবিধান জনগণের অধিকার নয়, বরং একটি দলের ক্ষমতার বৈধতা রক্ষার দলিল হয়ে ওঠে।

সংবিধানের অনেক ধারা ও মূলনীতিই প্রতিবেশী ভারতের নীতির প্রতিফলন। ধর্মনিরপেক্ষতা, সমাজতন্ত্র ও সাংস্কৃতিক ঐক্যের ধারণা ভারতের রাজনৈতিক দর্শন থেকে নেওয়া হয়।

ফলে স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশ এক প্রকার নীতিগত নির্ভরতায় আবদ্ধ হয়ে পড়ে। রাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্তে প্রতিবেশীর প্রভাব ধীরে ধীরে দৃশ্যমান হয়। এই অবস্থায় প্রকৃত স্বাধীনতা কেবল মানচিত্রে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

যে সংবিধান নিজের ভেতরেই পরস্পরবিরোধী ধারণা বহন করে তা কোনো জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে না। এমন একটি রাষ্ট্র কাঠামো শেষ পর্যন্ত নিজেই নিজের ভারে নুয়ে পড়ে যেখানে জনগণ নয়, কিছু গোষ্ঠী ও বিদেশি স্বার্থই হয়ে ওঠে নিয়ন্ত্রক শক্তি।

পরিশেষে, ১৯৭২ সালের সংবিধান একটি স্বাধীন জাতির আশা নয় বরং একদলীয় শাসন ও আদর্শিক বিভাজনের দলিল। এই সংবিধান মেনে চলা মানে আজও আমরা সেই পুরোনো প্রভাবাধীন ব্যবস্থার নাগরিক। বাংলাদেশের উচিত একটি নতুন সংবিধান প্রণয়ন করা যেখানে থাকবে জাতিগত মর্যাদা, ধর্মীয় সম্প্রীতি, প্রকৃত গণতন্ত্র ও আত্মনির্ভর রাষ্ট্রনীতি।

স্বাধীনতা মানে কেবল মানচিত্র নয়, স্বাধীনতা মানে নিজস্ব চিন্তা, বিশ্বাস ও পরিচয়ে স্বাধীনতা।