বাংলাদেশে সন্তানকে সম্পত্তি দিয়ে দেওয়া শুধু একটি আইনি সিদ্ধান্ত নয় এর সঙ্গে জড়িয়ে থাকে বাবা-মায়ের আবেগ, বিশ্বাস এবং জীবনের শেষ আশ্রয়ের প্রশ্ন। সন্তানকে ভালো রাখতে গিয়ে অনেক বাবা-মা জীবিত অবস্থাতেই জমি-বাড়ি হেবা বা দান করে দেন। তাঁদের বিশ্বাস থাকে সন্তান তো শেষ পর্যন্ত সন্তানই, সে বাবা-মাকে কখনো পর করে দেবে না। কিন্তু আইন তৈরি হয় শুধু ভালো মানুষের জন্য নয়, খারাপ পরিস্থিতির সম্ভাবনাও মাথায় রেখেই আইনকে তৈরি হতে হয়।
সম্পত্তি হস্তান্তরের ক্ষেত্রে ২০২৬ সালে যে নতুন ব্যবস্থা এসেছে, তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নির্দিষ্ট পারিবারিক সম্পর্কের মধ্যে সম্পত্তি দান করলেও দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করার সুযোগ। অর্থাৎ মালিকানা হস্তান্তরিত হলেও দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত সম্পত্তি ভোগ ও ব্যবহার করার অধিকার রাখতে পারেন। নিঃসন্দেহে এটি একটি প্রয়োজনীয় আইনি সুরক্ষা। কিন্তু এখানেই থেমে গেলে চলবে না। কারণ কাগজে অধিকার থাকা আর বাস্তবে নিরাপদ থাকা এক কথা নয়।
আমাদের সবচেয়ে বড় ভুল হবে এই ধারণা করা যে, দলিলে “আমৃত্যু ভোগাধিকার” লেখা থাকলেই বাবা-মা নিরাপদ। বাস্তবতা এত সহজ নয়। একজন বৃদ্ধ বাবা বা মা যদি সন্তানের কাছ থেকে সেই অধিকার লঙ্ঘনের মুখোমুখি হন, তাহলে তাঁকে শেষ পর্যন্ত আইন প্রয়োগকারী সংস্থা বা আদালতের আশ্রয় নিতে হতে পারে। অর্থাৎ আইন অধিকার দিতে পারে, কিন্তু সেই অধিকার বাস্তবে প্রয়োগ করার জন্য একজন দুর্বল বৃদ্ধ মানুষকে লড়াই করতে হতে পারে।
আর এখানেই প্রশ্নটি আরও ভয়ংকর হয়ে ওঠে, যদি সন্তান নিজেই সেই আইনি অধিকার মানতে না চায়?
সম্পত্তি যখন কোটি টাকার হয়ে ওঠে, তখন পারিবারিক সম্পর্কও অনেক সময় কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়ে। সম্পত্তির লোভে বাবা-মাকে মানসিক চাপ দেওয়া, অবহেলা করা, অর্থনৈতিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, বাসস্থান নিয়ে চাপ সৃষ্টি করা কিংবা শারীরিক নির্যাতনের মতো ঘটনা যে আমাদের সমাজে নেই, তা বলা যাবে না। সবচেয়ে ভয়াবহ বিষয় হলো, এসব ঘটনার শিকার বাবা-মায়ের বড় একটি অংশ নিজের সন্তানের বিরুদ্ধে যেতে চান না। তাঁরা আইন জানেন না, জানলেও প্রয়োগ করতে ভয় পান, আর সন্তানকে নিয়ে সামাজিক লজ্জা ও পারিবারিক সংকোচ তাঁদের নীরব করে রাখে।
সুতরাং নতুন আইনকে শুধু সম্পত্তি আইনের পরিবর্তন হিসেবে দেখলে ভুল হবে। এটি আসলে প্রবীণ বাবা-মায়ের নিরাপত্তার সঙ্গেও জড়িত। কারণ সম্পত্তির মালিকানা বদলানোর সঙ্গে যদি মানুষের জীবনযাপনের নিরাপত্তা জড়িয়ে যায়, তাহলে সেখানে আইনের দায়িত্বও কেবল মালিকানা নির্ধারণে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না।
আরেকটি বিষয় বিশেষভাবে মনে রাখা দরকার, জীবনকালীন ভোগাধিকার মানে পূর্ণ মালিকানা নয়। মালিকানা এবং ভোগের অধিকার আলাদা। তাই সম্পত্তি হস্তান্তরের সময় শুধু আবেগ দিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া বিপজ্জনক। দলিলে বাবা-মায়ের বসবাস, ব্যবহার, সম্পত্তি থেকে আয়, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যৎ বিরোধের বিষয়গুলো যত স্পষ্ট থাকবে, তাঁদের অবস্থান তত শক্ত হবে। একটি অস্পষ্ট দলিল ভবিষ্যতে একটি দীর্ঘ পারিবারিক ও আইনি সংঘাতের জন্ম দিতে পারে।
এখানে আমাদের সমাজের একটি পুরোনো ধারণাকেও প্রশ্ন করা দরকার “ছেলেকে দিয়ে দিলাম, ছেলে তো দেখবেই।” কেন একজন বাবা-মাকে নিজের শেষ বয়সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য সন্তানের আচরণের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে? সন্তান ভালো হলে আইন প্রয়োজন নেই এই যুক্তি যেমন ভুল, তেমনি আইন থাকলেই সন্তান খারাপ হবে এটিও ভুল। আইন মূলত সেই দিনের জন্য, যেদিন সম্পর্কের জায়গায় স্বার্থ এসে দাঁড়াতে পারে।
বাংলাদেশে পিতা-মাতার ভরণ-পোষণ আইন, ২০১৩ ইতোমধ্যে সন্তানদের ওপর বাবা-মায়ের ভরণ-পোষণের আইনগত দায়িত্ব দিয়েছে। তারপরও বাস্তবে বাবা-মায়ের অবহেলার ঘটনা ঘটে। এর অর্থ একটাই আইন থাকা যথেষ্ট নয়। আইনের প্রয়োগ সহজ, দ্রুত এবং প্রবীণবান্ধব হওয়া জরুরি।
একজন ৭০ বা ৮০ বছরের মানুষকে যদি নিজের ঘরে থাকার অধিকার প্রমাণ করতে দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যেতে হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই আইন কি সত্যিই তাঁকে রক্ষা করেছে, নাকি শুধু একটি কাগজ দিয়েছে?
নতুন ব্যবস্থার সাফল্য তাই নির্ভর করবে শুধু দলিলে নয়, প্রয়োগে। বাবা-মায়ের জীবনকালীন ভোগাধিকার কেউ অমান্য করলে তাঁরা কত দ্রুত প্রতিকার পাবেন, তাঁদের নিরাপত্তা কে নিশ্চিত করবে এবং তাঁদের বয়স ও দুর্বলতাকে বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্র কতটা সহজে ও দ্রুত ব্যবস্থা নেবে এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সম্পত্তি সন্তানের নামে করে দেওয়া বাবা-মায়ের ভালোবাসার সিদ্ধান্ত হতে পারে, কিন্তু সেই ভালোবাসাকে যেন তাঁদের বিরুদ্ধে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা না যায়, সেটিই হওয়া উচিত আইনের মূল দর্শন।
কারণ একজন বাবা তাঁর সন্তানকে জমি দিতে পারেন, বাড়ি দিতে পারেন, জীবনের সঞ্চয় দিয়ে দিতে পারেন। কিন্তু তিনি তাঁর বেঁচে থাকার অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সন্তানের হাতে তুলে দিতে বাধ্য নন।
হেবা বা দানের মূল উদ্দেশ্য যদি হয় সন্তানকে ভবিষ্যৎ দেওয়া, তাহলে সেই ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে গিয়ে বাবা-মায়ের বর্তমান যেন অনিরাপদ না হয়ে যায়। নতুন আইন সেই নিরাপত্তার একটি দরজা খুলেছে। এখন প্রয়োজন দরজাটি যেন শুধু কাগজে খোলা না থাকে প্রয়োজনে রাষ্ট্র যেন সেই দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ বাবা-মায়ের পাশেও দাঁড়ায়।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্নটি সম্পত্তির নয়। প্রশ্নটি হলো, যে বাবা-মা সন্তানের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে নিজের সম্পত্তি দিয়ে দিলেন, তাঁদের নিজের ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করবে কে? এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আইনের বইয়ে নয়, আমাদের সমাজ ও রাষ্ট্র উভয়কেই দিতে হবে।
মো: আবির মাহমুদ জাকারিয়া, গবেষক ও আইনবিদ








