ঢাকা | সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬,২৭ আশ্বিন ১৪৩৩

বিশ্বকাপের পাওয়ার র‌্যাঙ্কিংয়ে দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়নের ওপরে বাংলাদেশ

২০২৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ শুরু হতে বাকি এক বছর। দক্ষিণ আফ্রিকা, জিম্বাবুয়ে ও নামিবিয়ায় যৌথভাবে হবে বিশ্বকাপের ১৪তম সংস্করণ। টুর্নামেন্ট সামনে রেখে দলগুলো নিজেদের গুছিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে। প্রতিটি ওয়ানডেই এখন গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞদের বিদায় আর নতুন তারকাদের উঠে আসার লড়াইও চলছে।

বিশ্বকাপের এক বছর আগে অংশ নিতে যাওয়া দলগুলোর শক্তি বিবেচনায় সেরা ১০ দলের পাওয়ার র‌্যাঙ্কিং করেছে ক্রিকেটবিষয়ক ওয়েবসাইট উইজডেন। এই তালিকায় দুই বিশ্বচ্যাম্পিয়ন পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কার মতো দলকে পেছনে ফেলেছে বাংলাদেশ। আইসিসির ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে নয় নম্বরে থাকা বাংলাদেশকে উইজডেন রেখেছে ছয়ে। বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়ার চারে এবং তালিকায় শীর্ষে দক্ষিণ আফ্রিকা।

বিশ্বকাপে বাকি চারটি জায়গা বাছাইপর্বের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। সে কারণে উইজডেনের তালিকায় রাখা হয়েছে কেবল সেরা ১০ দলকে।

১. দক্ষিণ আফ্রিকা

স্বাগতিক দক্ষিণ আফ্রিকা তালিকার শীর্ষে। নিজেদের মাঠে বর্তমান বিশ্বচ্যাম্পিয়ন অস্ট্রেলিয়াকে ২-১ ব্যবধানে হারিয়ে বিশ্বকাপের প্রস্তুতি শুরু করেছে তারা। বোলিং আক্রমণের ভারসাম্য এবং ছন্দে থাকা ব্যাটারদের কারণে দলটিকে এগিয়ে রেখেছে উইজডেন। আইসিসির ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে অবশ্য দক্ষিণ আফ্রিকার অবস্থান তিনে।

বিশ্বকাপে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যর্থতার পুরোনো ইতিহাসও আলোচনায় এসেছে। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই দুর্ভাগ্য কাটিয়ে ওঠার ইঙ্গিত দিয়েছে দলটি। ২০২৪ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে খেলার পর ২০২৫ সালে টেম্বা বাভুমার নেতৃত্বে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জেতে তারা। দীর্ঘদিনের শিরোপাখরা কাটানোর পর এবার ওয়ানডে বিশ্বকাপেও ভালো করার প্রত্যাশা বাড়ছে। তবে টুর্নামেন্ট যত এগিয়ে আসবে, প্রত্যাশার চাপ সামলানোও তত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।

২. ভারত

আইসিসির ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ের শীর্ষে থাকা ভারতকে উইজডেন রেখেছে পাওয়ার র‌্যাঙ্কিংয়ে দুই নম্বরে। হার্দিক পান্ডিয়ার চোটে বোলিং আক্রমণের সেরা সমন্বয় খুঁজে পাওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কুলদীপ যাদব দুর্দান্ত বোলিং করলেও জাসপ্রিত বুমরার সঙ্গে আর কারা থাকবেন, তা এখনো নিশ্চিত নয়।

ব্যাটিংয়ে অবশ্য ভারতের সামনে বিকল্পের অভাব নেই। বরং বিশ্বকাপের দলে কাকে বাদ দেওয়া হবে, সেটিই বড় প্রশ্ন হতে পারে। বিরাট কোহলির বিশ্বকাপ দিয়ে ক্যারিয়ার শেষ করার ইচ্ছা প্রকাশকে তাৎপর্যপূর্ণ মনে করছে উইজডেন। ছন্দে ফেরা রোহিত শর্মা এবং অধিনায়ক শুভমান গিলের রেকর্ডও ভারতের শক্তির পরিচয় দিচ্ছে।

৩. নিউ জিল্যান্ড

আইসিসি ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে দুইয়ে থাকা নিউ জিল্যান্ডকে রেখেছে তিন নম্বরে। আপাতত আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ব্যস্ততা কম থাকায় এক ধাপ পিছিয়েছে দলটি। বিভিন্ন টুর্নামেন্টে ধারাবাহিকভাবে ভালো খেললেও শিরোপা জয়ের ক্ষেত্রে বারবার হতাশ হতে হয়েছে কিউইদের।

২০২৬ সালের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ফাইনালে ভারতের কাছে হেরেছে নিউ জিল্যান্ড। এক দশকের কিছু বেশি সময়ে সাদা বলের বিশ্বকাপের ফাইনালে এটি ছিল তাদের চতুর্থ হার। গত বছরের চ্যাম্পিয়নস ট্রফির ফাইনালেও হেরেছিল তারা।

ওয়ানডেতে নিউ জিল্যান্ডের সাম্প্রতিক বছরটি ছিল মিশ্র অভিজ্ঞতার। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে অল্প ব্যবধানে সিরিজে হারানোর পর বাংলাদেশের কাছে সিরিজ হেরেছে দলটি। তবে দেশের বাইরে ভারতকে হারানোর কৃতিত্বও রয়েছে তাদের। ২০০৩ সালের পর আর ওয়ানডে বিশ্বকাপের শেষ চারে উঠতে ব্যর্থ হয়নি ব্লাকক্যাপস। আগামী বছরও শেষ চারে তাদের জায়গা পাওয়া বড় চমক হবে না। তবে শিরোপা জেতা হবে আরও বড় চমক।

৪. অস্ট্রেলিয়া

সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সে অস্ট্রেলিয়ার অবস্থান খুব একটা স্বস্তিদায়ক নয়। দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে টানা ষষ্ঠ ওয়ানডে সিরিজ হেরেছে দলটি। এ ছাড়া পাকিস্তান ও বাংলাদেশের কাছেও সিরিজ হেরেছে তারা। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একটি ম্যাচেও প্রায় হারের মুখে পড়েছিল অস্ট্রেলিয়া।

তারপরও ওয়ানডে বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে অস্ট্রেলিয়াকে হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই। উইজডেনের মূল্যায়ন, বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে হারানো অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে কঠিন। তাই দলটিকে চারে রেখেছে তারা।

৫. ইংল্যান্ড

ইংল্যান্ডের সাম্প্রতিক গ্রীষ্মকালীন মৌসুমটি ছিল হতাশার। বেন স্টোকসের অধিনায়কত্বের আকস্মিক অবসান, বাজবলের ভবিষ্যৎ নিয়ে অনিশ্চয়তা এবং মাঠের বাইরের নানা ঘটনা দলটিকে চাপে রেখেছিল। তবে পাকিস্তানের বিশৃঙ্খল সফরের পর ইংল্যান্ডকে তুলনামূলক ভালো অবস্থায় দেখা গেছে। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাদা বলের ক্রিকেটেও শক্তিশালী পারফরম্যান্স দেখিয়েছে তারা।

ব্যাটিংয়ে বেশির ভাগ সময়ই দারুণ খেলেছে ইংল্যান্ড। তবে ঘরের মাঠের পারফরম্যান্স কতটা কার্যকর হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশেষ করে স্পিনসহ বোলিং আক্রমণের মান নিয়ে উদ্বেগ কাটেনি।

৬. বাংলাদেশ

আইসিসির ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ে বাংলাদেশের অবস্থান নয়ে। কিন্তু গত এক বছরে দলের উন্নতি চোখে পড়ার মতো। সে কারণেই উইজডেনের তালিকায় ছয় নম্বরে জায়গা পেয়েছে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশের সবচেয়ে আশাব্যঞ্জক দিক পেস বোলিং আক্রমণ। সাম্প্রতিক সময়ে বারবার নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছে পেসাররা। ২০২৭ বিশ্বকাপে বাউন্সি উইকেট প্রত্যাশিত। এমন কন্ডিশনে বাংলাদেশের পেসাররা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারেন।

গত এক বছরে ঘরের মাঠে পাকিস্তানের বিপক্ষে সিরিজ জয়ও বাংলাদেশের উন্নতির প্রমাণ। একসময় পাকিস্তান ছিল বাংলাদেশের জন্য কঠিন প্রতিপক্ষ। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সিরিজ জয়ও দলের আত্মবিশ্বাস বাড়িয়েছে। উইজডেনের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার মতো বাংলাদেশের সামনেও বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে প্রত্যাশার চাপ সামলানো। দলের বিপুলসংখ্যক সমর্থকের প্রত্যাশা বিশ্বকাপ যত এগিয়ে আসবে, ততই বাড়বে।

৭. শ্রীলঙ্কা

বাংলাদেশের ঠিক পরেই সাত নম্বরে শ্রীলঙ্কা। আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তানের পেছনে থাকলেও উইজডেনের তালিকায় পাকিস্তানকে ছাড়িয়ে গেছে তারা। এর প্রধান কারণ পাকিস্তানের সাম্প্রতিক অস্থিরতা।

ইংল্যান্ড সফরে শ্রীলঙ্কার পারফরম্যান্স খুব একটা ভালো ছিল না। তবে একমাত্র জয়টিতে ব্যাটিংয়ের সামর্থ্য এবং আইসিসির নতুন ৩৪ ওভারের নিয়মের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার দক্ষতা দেখিয়েছে দলটি। বাংলাদেশের মতো মানসম্পন্ন পেস আক্রমণ না থাকায় তালিকায় পিছিয়েছে শ্রীলঙ্কা। আগামী মাসগুলোতে পাকিস্তান ও ইংল্যান্ডের সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং ভারত সফর দলটির শক্তি ও দুর্বলতা বুঝতে সাহায্য করবে।

৮. আফগানিস্তান

আইসিসির ওয়ানডে র‍্যাঙ্কিংয়ের সঙ্গে মিল রেখে আফগানিস্তানকে আট নম্বরে রেখেছে উইজডেন। সাদা বলের ক্রিকেটে ব্যস্ত সময় কাটালেও সাম্প্রতিক ফলাফল থেকে দলটির প্রকৃত শক্তি বোঝা কঠিন। আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে চারটি জয় এবং বছরের শুরুতে ভারতের কাছে তিনটি হার—দুই প্রতিপক্ষের শক্তির পার্থক্য এত বেশি যে ফলাফল দিয়ে আফগানিস্তানের সামর্থ্য পুরোপুরি বিচার করা যাচ্ছে না।

তবে আইসিসির টুর্নামেন্টে আফগানিস্তান যে বিপজ্জনক প্রতিপক্ষ হয়ে উঠেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। আগের ওয়ানডে বিশ্বকাপে গ্লেন ম্যাক্সওয়েলের অবিশ্বাস্য ইনিংস তাদের বড় সাফল্যের পথে বাধা হয়েছিল। কয়েক মাস পরের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়াকে বিদায় করে সেই হারের জবাব দেয় আফগানরা। আগামী মাসে সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশ ও বিশ্বকাপের আরেক স্বাগতিক জিম্বাবুয়ের সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজ তাদের প্রস্তুতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হবে।

৯. পাকিস্তান

পাকিস্তানকে রেখেছে নয়ে। অস্ট্রেলিয়া দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে সিরিজ হারার পর আইসিসি র‍্যাঙ্কিংয়ে পাকিস্তান সাময়িকভাবে চারে উঠেছিল। তবে সেটিকে বাস্তব শক্তির প্রতিফলন মনে করছে না উইজডেন। পাকিস্তান এখন আবার পাঁচ নম্বরে নেমেছে।

গত এক বছরে দলের তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহককে কেন্দ্রীয় তদন্তকারীদের মুখোমুখি হতে হয়েছে। মাঠের বাইরের এমন পরিস্থিতিতে দলটির ভবিষ্যৎ নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। ইংল্যান্ড সফরেও দেখা গেছে, সিরিজ চলার সময় পর্যন্ত অধিনায়ক ও কোচ নিয়ে নিশ্চয়তা পাচ্ছে না পাকিস্তান। বিশ্বকাপের এক বছর পর পাকিস্তানের ড্রেসিংরুমে নতুন মুখ দেখা যাওয়ার সম্ভাবনাও প্রবল। তবে বাছাইপর্ব খেলার প্রয়োজন নেই, সরাসরি বিশ্বকাপে খেলবে দলটি। আপাতত এটিই তাদের বড় স্বস্তি।

১০. জিম্বাবুয়ে

তালিকার ১০ নম্বরে জিম্বাবুয়ে। আইসিসির র‍্যাঙ্কিংয়ে দলটির অবস্থান আরও নিচে। তবে স্বাগতিক এবং পূর্ণ সদস্য হওয়ায় বিশ্বকাপে খেলতে বাছাইপর্ব পেরোতে হবে না তাদের।

সাম্প্রতিক সময়ে ঘরের মাঠে ভালো খেলেছে জিম্বাবুয়ে। বাংলাদেশের বিপক্ষে সিরিজ জিতেছে তারা। এরপর অস্ট্রেলিয়ার কাছে সিরিজে হোয়াইটওয়াশ হলেও শেষ ম্যাচে প্রতিপক্ষকে কঠিন পরীক্ষায় ফেলেছিল। আগামী মাসে বাংলাদেশ ও আফগানিস্তানের সঙ্গে ত্রিদেশীয় সিরিজটিও আকর্ষণীয় হওয়ার প্রত্যাশা রয়েছে।