ঢাকা | মঙ্গলবার, ৩ নভেম্বর ২০২৬,১৮ কার্তিক ১৪৩৩

লাঠির শাসন নয়, চাই ন্যায়বিচার ও দায়িত্বশীলতার সংস্কৃতি

গত কয়েক দিনের অস্থিতিশীল পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে একটি বিষয় বেশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে—পুলিশ যেন হঠাৎ করেই অতিমাত্রায় আগ্রাসী হয়ে উঠেছে। যাকে হাতের নাগালে পাচ্ছে, তাকেই নির্বিচারে লাঠিপেটা করছে। পরিস্থিতি বিবেচনা, যুক্তিতর্ক কিংবা আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দেওয়ার কোনো আগ্রহ যেন তাদের মধ্যে দেখা যাচ্ছে না। প্রতিবাদকারী ছাত্র হোক কিংবা সাধারণ মানুষ, পুলিশের আচরণে তেমন কোনো পার্থক্য পরিলক্ষিত হয় না। তাদের ভাবসাব দেখে মনে হয়, কাউকে পেটাতে না পারলে বুঝি পুলিশের চাকরিটাই হুমকির মুখে পড়ে যাবে!

কিন্তু আমরা কি এত সহজেই ভুলে যাব ২০২৪ সালের গণআন্দোলনের কথা? একটি আপাতদৃষ্টিতে ছোট বিষয়কে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া সেই আন্দোলন কীভাবে একপর্যায়ে ভয়াবহ পরিণতির দিকে গড়িয়েছিল, তা নিশ্চয়ই কারও অজানা নয়। সেই আন্দোলনের রক্তাক্ত অভিজ্ঞতা থেকে আমাদের শিক্ষা নেওয়ার কথা ছিল। বিশেষ করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দায়িত্বশীল আচরণ, সংযম এবং জনগণের প্রতি শ্রদ্ধাশীল হওয়ার বিষয়টি আরও গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল। অথচ সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখে মনে হচ্ছে, আমরা যেন অতীতের সেই ভয়াবহ অভিজ্ঞতা থেকে যথেষ্ট শিক্ষা নিতে পারিনি।

কোনো ব্যক্তি অপরাধী কি না, তা নির্ধারণ করার দায়িত্ব আদালতের। আইনানুগ প্রক্রিয়ায় অপরাধ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে শাস্তি দেওয়ার অধিকার কারও নেই। অথচ যেভাবে নির্বিচারে লাঠিপেটা করা হচ্ছে, তাতে একজন ছাত্র কিংবা সাধারণ মানুষ স্থায়ীভাবে পঙ্গুত্ব বরণ করতে পারে, এমনকি প্রাণও হারাতে পারে। প্রশ্ন হচ্ছে, আইনে অপরাধ প্রমাণিত হলে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড কিংবা মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকতে পারে, কিন্তু কাউকে নির্বিচারে লাঠিপেটা করে শাস্তি দেওয়ার বিধান কোথায় আছে? আইন প্রয়োগের নামে আইনবহির্ভূত আচরণ কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।

একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠী যখন ক্ষোভে ফেটে পড়ে, দলবদ্ধভাবে রাস্তায় নেমে আসে, তখন তাদের দাবিগুলোকে এককথায় অযৌক্তিক বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অপচেষ্টা বলে উড়িয়ে দেওয়ার সুযোগ নেই। বরং তাদের ক্ষোভের পেছনে কী কারণ রয়েছে, কী ধরনের বঞ্চনা বা অসন্তোষ তাদের রাস্তায় নামতে বাধ্য করেছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি। পুলিশের লাঠিচার্জে হয়তো সাময়িকভাবে মানুষকে ছত্রভঙ্গ করা সম্ভব, কিন্তু মানুষের মনের ক্ষোভ ও অসন্তোষ দূর করা সম্ভব নয়। উপরন্তু, আন্দোলনকারীদের পাশে দাঁড়ানো, সহায়তা করা কিংবা তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়ার মতো রাজনৈতিক ও সামাজিক শক্তিরও অভাব নেই। ফলে সমস্যার মূল কারণ চিহ্নিত না করে কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা শেষ পর্যন্ত আরও জটিলতা তৈরি করতে পারে।

এবার আসা যাক গার্মেন্টস ও চা-শ্রমিকদের আন্দোলনের প্রসঙ্গে। তারা যে দাবিদাওয়া নিয়ে আন্দোলন করছেন, তার সবটুকুই কি অযৌক্তিক? নিশ্চয়ই নয়। বরং আমাদের স্বীকার করতে হবে, গার্মেন্টস শ্রমিক এবং চা-শ্রমিকদের একটি বড় অংশ দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিশ্চয়তা, সীমিত মজুরি, কর্মপরিবেশের নানা সমস্যা এবং সামাজিক বৈষম্যের মধ্যে জীবনযাপন করছেন। তাদের শ্রমের ওপর দাঁড়িয়েই দেশের অর্থনীতি ও রপ্তানি বাণিজ্যের একটি বড় অংশ এগিয়ে যাচ্ছে। অথচ সেই শ্রমের যথাযথ মূল্যায়ন কতটুকু হচ্ছে?

কেউ কি বুকে হাত দিয়ে বলতে পারবেন, গার্মেন্টস ও চা-শ্রমিকেরা তাঁদের শ্রমের ন্যায্য হিস্যা পাচ্ছেন? বাস্তবতা হচ্ছে, তাঁদের একটি বড় অংশের জীবনযাপন এখনও ন্যূনতম মৌলিক চাহিদা পূরণের সংগ্রামে আবদ্ধ। অন্যদিকে, এই শ্রমজীবী মানুষের শ্রম ও ঘামের ওপর ভর করেই কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিক বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন এবং দেশে-বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন করছেন। শিল্পের বিকাশ ও মালিকের মুনাফা অবশ্যই প্রয়োজন, কিন্তু সেই বিকাশের সুফল শ্রমিকের জীবনেও প্রতিফলিত হতে হবে। শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, সামাজিক মর্যাদা এবং মানবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা কোনো দয়া বা অনুগ্রহ নয়; এগুলো তাদের ন্যায্য অধিকার।

তবে এখানে একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলা প্রয়োজন—পুলিশকে যেমন আগ্রাসী আচরণ করা থেকে বিরত থাকতে হবে, তেমনি আন্দোলনকারীদেরও দায়িত্বশীল হতে হবে। নিজেদের ন্যায্য দাবি আদায়ের আন্দোলনে সরকারি কিংবা বেসরকারি সম্পদ জ্বালিয়ে-পুড়িয়ে ধ্বংস করে দেওয়ার কোনো যুক্তি থাকতে পারে না। ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কিংবা সাধারণ মানুষের চলাচলে বাধা সৃষ্টি করে জনদুর্ভোগ বাড়ানো কোনোভাবেই আন্দোলনের গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি হতে পারে না। মনে রাখতে হবে, দেশটি আমাদের সবার। রাষ্ট্রীয় সম্পদ যেমন জনগণের করের টাকায় গড়ে ওঠে, তেমনি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ও স্থাপনাও দেশের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এসব সম্পদ ধ্বংস করা মানে শেষ পর্যন্ত নিজেদেরই ক্ষতিগ্রস্ত করা।

এখানে সরকারের দায়িত্ব সবচেয়ে বেশি। কারণ একটি রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ, নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি সংবেদনশীল থাকা—সবকিছুর প্রধান দায়িত্ব সরকারের ওপরই বর্তায়। সরকার যদি জনগণের অসন্তোষকে গুরুত্ব না দেয়, আলোচনার পথ বন্ধ করে রাখে কিংবা সমস্যার সমাধানের পরিবর্তে বলপ্রয়োগকে প্রধান হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয়, তাহলে পরিস্থিতি আরও অবনতির দিকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।

আমাদের মনে রাখতে হবে, কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান কখনোই লাঠির জোরে সম্ভব নয়। সাময়িকভাবে ভয় দেখিয়ে বা শক্তি প্রয়োগ করে মানুষকে নীরব রাখা যেতে পারে, কিন্তু তাদের ন্যায্য দাবি, ক্ষোভ ও বঞ্চনাকে মুছে ফেলা যায় না। বরং আলোচনার টেবিলে বসে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সহনশীলতা ও যুক্তির ভিত্তিতে সমস্যার সমাধান খুঁজে বের করাই সভ্য রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয়। এজন্য সরকার, প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, মালিকপক্ষ এবং আন্দোলনকারীদের প্রত্যেককেই দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

একটি বিষয় ভুলে গেলে চলবে না—রাষ্ট্র পরিচালনার অর্থ কেবল ক্ষমতা প্রয়োগ করা নয়; বরং জনগণের আস্থা অর্জন করা। যে সরকার জনগণের কথা শুনতে জানে, তাদের দুঃখ-দুর্দশা উপলব্ধি করতে পারে এবং ন্যায়সংগত দাবির প্রতি আন্তরিক থাকে, সেই সরকারই প্রকৃত অর্থে জনবান্ধব সরকার। অন্যদিকে, যে প্রশাসন জনগণকে প্রতিপক্ষ মনে করে, তাদের কণ্ঠস্বরকে দমন করার চেষ্টা করে, সেখানে স্থায়ী শান্তি ও শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা করা কঠিন।

আমরা সংঘাত চাই না, চাই সমাধান। আমরা বিশৃঙ্খলা চাই না, চাই সুশৃঙ্খল ও মানবিক রাষ্ট্রব্যবস্থা। আমরা পুলিশের লাঠির আঘাত দেখতে চাই না, আবার আন্দোলনের নামে রাষ্ট্রীয় ও ব্যক্তিমালিকানাধীন সম্পদের ধ্বংসযজ্ঞও দেখতে চাই না। আমরা চাই এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে শ্রমিক তাঁর শ্রমের ন্যায্য মূল্য পাবেন, সাধারণ মানুষ তাঁর অধিকার নিয়ে কথা বলতে পারবেন, পুলিশ জনগণের বন্ধু হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে এবং সরকার জনগণের কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য থাকবে।

কারণ লাঠির আঘাতে মানুষকে সাময়িকভাবে থামানো যায়, কিন্তু ন্যায়বিচার, অধিকার ও মর্যাদার আকাঙ্ক্ষাকে কখনোই থামিয়ে রাখা যায় না।

লেখক, মো. কাওছার আলম চৌধুরী
কবি, লেখক ও স্বাধীন সাংবাদিক