ঢাকা | শনিবার, ১৫ আগস্ট ২০২৬,৩১ শ্রাবণ ১৪৩৩

দক্ষিণ আফ্রিকায় বাংলাদেশিদের নিরাপত্তা শঙ্কা, ৫ বছরে নিহত দুই শতাধিক

বিশ্বের সর্বোচ্চ সহিংস অপরাধপ্রবণ দেশগুলোর মধ্যে অন্যতম দক্ষিণ আফ্রিকা। খুন-ছিনতাই-আক্রমণ ও সংঘবদ্ধ অপরাধের মতো ঘটনা নিয়মিত ঘটছে দেশটিতে। প্রতি দুই মাসে অন্তত একজন বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন মহাদেশটির সবচেয়ে বড় অর্থনীতির দেশ সাউথ আফ্রিকায়। গেল পাঁচ বছরে এই সংখ্যা দুই শতাধিক ছড়িয়ে গেছে। অভিবাসন সংশ্লিষ্টরা বলছেন, কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি এসব হত্যাকাণ্ডের সুবিচার নিশ্চিত করতে হবে।

বাবার স্মৃতি অনেকটাই আবছা হয়ে গেছে ফেনীর দাগনভূঞার তাহমিনা আক্তারের। ছয় বছরের মেয়েকে রেখে জীবিকার তাগিদে জসিম উদ্দিন পাড়ি দিয়েছিলেন দক্ষিণ আফ্রিকায়। দুই দশক ধরে সেখানে বৈধ কাগজপত্রের জটিলতায় পড়ে দেশে ফেরা হয়নি তার। গেল ১৭ জুলাই দেশটির জোহানেসবার্গে সন্ত্রাসী হামলায় নির্মমভাবে খুন হন এই প্রবাসী।

তাহমিনা আক্তার বলেন, ‘স্মৃতিগুলা মনে পড়ে না। একদম শিশুকালে বাবা চলে গেছে। ছোট বোন যেটা আছে ওটার বয়স বর্তমানে ১৮ কি ১৯ বছর হবে, ওর সঙ্গে বাবার কোনো দেখা হয় নাই।’

নোয়াখালী সদর উপজেলার ইয়াসিনকে দেশটিতে গুলি করে হত্যার দৃশ্য মুঠোফোনের অপরপ্রান্তে থেকে দেখেছেন মা হনুফা খাতুন। চলতি বছরের ডিসেম্বরে পরিবারের কাছে ফেরার কথা থাকলেও সেখানেই হয়েছে তার শেষ সমাধি। তবুও ছেলের অপেক্ষায় পথ চেয়ে থাকেন হনুফা।

দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রায় দুই লাখ বাংলাদেশির বসবাস। জসিম ও ইয়াসিনের মতো গত সাত মাসে অন্তত ১০ জন বাংলাদেশি দেশটিতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। কেউ ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে, কেউ বাসা-বাড়িতে দুর্বৃত্তের হামলায় নিহত হন।

বাংলাদেশ হাইকমিশন বলছে, প্রতি দুই মাসে গড়ে অন্তত ১ জন বাংলাদেশি হত্যাকাণ্ডের শিকার হচ্ছেন সেখানে। গেল পাঁচ বছরে এই সংখ্যা দুই শতাধিক অতিক্রম করেছে।

দক্ষিণ আফ্রিকা প্রিটোরিয়া বাংলাদেশ হাইকমিশনের হাইকমিশনার শাহ আহমেদ শফী বলেন, ‘অনেকদিন থেকেই তো দক্ষিণ আফ্রিকাতে নিরাপত্তাজনিত সমস্যা আছে। সিকিউরিটি কনসার্নটা খুবই তীব্র। অন্তত দুই শতাধিক বাংলাদেশি যে পাঁচ বছরে নিহত হয়েছে, সেটা মোটামুটি নিশ্চিত।’

বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন সেখানকার বাংলাদেশিরা। ব্যবসায়িক দ্বন্দ্বে জড়িয়েও হতাহতের ঘটনা ঘটছে। ঝুঁকি এড়াতে কেউ কেউ দেশে ফিরে আসছেন।

প্রবাসীদের ভাষ্যে, খুন, ছিনতাই ও সন্ত্রাসী হামলা সেখানকার নিত্যদিনের ঘটনা। ব্যবসা প্রতিষ্ঠান কিংবা চলাচলের পথ-কোথাও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নেই।

ফেরত আসা প্রবাসীদের মধ্যে একজন বলেন, ‘চলে আসছি এই কারণে—ওখানে আসলে নিরাপত্তা একটু কম। মানুষের জীবন ঝুঁকিতে থাকে। এই দুইটা ভাষার কমিউনিকেশনের কারণে আমাদের যারা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এরা কিছুই পায় না।’

অভিবাসন ও শ্রম সংশ্লিষ্টরা দাবি, অভিবাসী কর্মীদের নিরাপত্তার বিষয়ে এখনও রাষ্ট্র উদাসীন। কর্মসংস্থানের উদ্দেশে যাত্রা করার আগে গন্তব্য দেশের নিরাপত্তা যাচাই করাসহ বিদেশে হত্যাকাণ্ডের সুবিচার নিশ্চিত করার পরামর্শ তাদের।

বিলস নির্বাহী পরিচালক সৈয়দ সুলতান উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সবচেয়ে বড় ব্যাপার হচ্ছে সুবিচার নিশ্চিত করা। সেজন্য রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে কাজ করতে হবে। প্রয়োজনবোধে এখানে আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে সেখানকার আইন এজেন্সিগুলোকে নিজ-নিযুক্ত করতে হবে।’

প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য আইনি সেবা নিশ্চিতে বিশ্বের ১২টি দেশে ল’ ফার্ম নিয়োগ দিয়েছে সরকার। তবে কর্মীদের বৈধ কাগজপত্র থাকলেই কেবল সরকার ক্ষতিপূরণ আদায়ের সুযোগ পায়, বলছেন প্রবাসী কল্যাণ প্রতিমন্ত্রী।

প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী মো. নুরুল হক বলেন, ‘আমরা ইতিমধ্যেই বিভিন্ন দেশে এই ল’ ফার্ম অ্যাপয়েন্টেড করেছি যে আমাদের প্রবাসীদের সেবা দেয়ার জন্য। সেক্ষেত্রে এরমধ্যেই ১২টা দেশে আছে, পর্যায়ক্রমে অন্যান্য দেশেও সেটা এনশিওর করা হবে।’

চলতি বছর দক্ষিণ আফ্রিকার অপরাধ সূচক প্রায় ৭৪.৬ স্কেলে পৌঁছেছে। উচ্চমাত্রার সহিংস অপরাধের কারণে ভ্রমণ সর্তকতা জারি রেখেছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। এমন অবস্থায় দেশটিতে বাংলাদেশি কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারের জোরালো অবস্থান প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের।

খবর এখন টিভি