উন্নত জীবনের আশায় রাশিয়ায় গিয়ে নিখোঁজ রয়েছেন জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার পাঁচ যুবক। সম্প্রতি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অডিও রেকর্ডকে কেন্দ্র করে রুশ-ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় তাদের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়েছে। তবে নির্ভরযোগ্য কোনো সূত্রে এই মৃত্যুর খবর এখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি। স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকায় পরিবারগুলোতে চলছে চরম উৎকণ্ঠা ও আহাজারি।
এদিকে, রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে এখন পর্যন্ত কত বাংলাদেশি মারা গেছে, তার প্রকৃত সংখ্যা জানা যায়নি। তবে গত মার্চ মাসে ফর্টিফাই রাইটস ও ট্রুথ হাউন্ডস নামে দুটি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন জানায়, এ পর্যন্ত ১০৪ বাংলাদেশি রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধে জড়িয়েছে। আর এই যুদ্ধে গত ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রাণ হারিয়েছে ৩৪ বাংলাদেশি। সংশ্লিষ্টদের ধারণা, প্রকৃত সংখ্যা আরও বেশি।
এদিকে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবর অনুযায়ী, রাশিয়ার হয়ে যুদ্ধে গিয়ে এ পর্যন্ত ৩৭ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন। সর্বশেষ জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার পাঁচজন নিহতের তথ্য যুক্ত করলে এই সংখ্যা দাঁড়ায় ৪২-এ।
মাদারগঞ্জে দুই পরিবারে আহাজারি
মাদারগঞ্জ উপজেলার নিখোঁজ দুই যুবক হলেন– চরগুজামানিকা গ্রামের বানু মিয়ার ছেলে মাফুল ওরফে মফিজ (২৩) ও রায়েরছড়া গ্রামের তারা মিয়ার ছেলে আরিফ হোসাইন (৩০)। গত ৭ মে তারা রাজমিস্ত্রি ও ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের উদ্দেশ্যে রাশিয়ায় যান।
মাদারগঞ্জের স্থানীয় দালাল আমিনুর ইসলাম সুজার মাধ্যমে ১৬ লাখ টাকা চুক্তি করে আরিফকে এবং চাঁদেরপুরের এক দালালের মাধ্যমে মাফুলকে পাঠানো হয়েছিল।
পরিবারের দাবি, রাশিয়ায় পৌঁছানোর পর দালালচক্র তাদের রাশিয়ার সেনাবাহিনীর কাছে বিক্রি করে দেয়। গত ২৯ মে থেকে তাদের মোবাইল ফোন বন্ধ রয়েছে।
নিখোঁজ আরিফের বাবা তারা মিয়া বলেন, ১৬ লাখ টাকা দিয়ে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজের জন্য ছেলেকে রাশিয়ায় পাঠিয়েছিলাম। গত ২৯ মে শেষ কথা হলে আরিফ বলেছিল– দালালচক্র তাদের বিক্রি করে যুদ্ধক্ষেত্রে পাঠাচ্ছে। এরপর থেকে তার মোবাইল বন্ধ।
মাফুলের মা মাহফুজা বেগম বলেন, ‘আমার ছেলে রাজমিস্ত্রি খাটার জন্য বিদেশে গেছিল, এখন শুনতাছি ড্রোন হামলায় মারা গেছে। আমি আমার ছেলেকে ফেরত চাই, তা না হলে তার লাশ চাই। আর যারা আমার ছেলেকে প্রতারণা করে পাঠাইছে, তাদের বিচার চাই।’
জানতে চাইলে মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, ‘বৈধ পন্থায় না গিয়ে স্থানীয় দালালের মাধ্যমে এভাবে যাওয়া ঠিক হয়নি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হচ্ছে। ভুক্তভোগী পরিবার লিখিত আবেদন করলে প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের আশ্বাস দেন তিনি।
গোপালপুরে তিন পরিবারে উৎকণ্ঠা
টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার তিন যুবককে বেশি বেতনের প্রলোভন দেখিয়ে গত ৭ মে কনস্ট্রাকশন ভিসায় রাশিয়ায় পাঠায়
রাজধানীর নিকুঞ্জ-২ এলাকার ‘জাবাল ই নূর ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড’ নামের একটি এজেন্সি। নিখোঁজ তিন যুবক হলেন– উপজেলার দক্ষিণ পাথালিয়া গ্রামের আমিনুল ইসলাম, মজিদপুর গ্রামের পবিত্র চন্দ্র এবং বীর নলহরা গ্রামের নজরুল ইসলাম।
সম্প্রতি ফেসবুকে একটি কল রেকর্ড ভাইরাল হয়। সেখানে দাবি করা হয়, তাদের গ্রুপে থাকা ব্যক্তিদের মধ্যে চারজন ছাড়া বাকিরা যুদ্ধে মারা গেছেন।
নিখোঁজ নজরুল ইসলামের স্ত্রী আছমা বেগম বলেন, ঈদের রাতে তিনি ফোন করে বলেছিলেন– পাঁচজনের গ্রুপ করে যুদ্ধে পাঠানো হয়েছে। বাঁচব কি মরব জানি না।
পবিত্রের বাবা পরেশ চন্দ্র সূত্রধর বলেন, ‘গত ২৯ মে ছেলে ফোন দিয়ে বলেছিল– আমাদের জোর করে যুদ্ধে পাঠানো হচ্ছে। জীবিত দেখতে চাইলে দ্রুত দূতাবাসে যোগাযোগ করে দেশে ফিরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করো। না হলে আমরা ড্রোন হামলায় মারা যাব।’
গোপালপুর থানার ওসি আনোয়ার হোসেন বলেন, সামাজিক মাধ্যমে এ রকম একটি খবর শুনেছি। তবে ভুক্তভোগী পরিবারের কেউ আমাদের সঙ্গে যোগাযোগ করেনি। মৃত্যুর বিষয়টি এখনও নিশ্চিত হতে পারিনি।






